■ মোঃ ছরোয়ারী আলম ::
শিক্ষার মন্দির যখন সহিংসতার ও রাজনৈতিক টানাপড়েনের দোলাচলেপরিণত হয়, তখন কেবল একটি প্রতিবাদ বা হাতুড়ির আঘাতই রক্তপাত ঘটায় না; সমগ্র সমাজের নৈতিক অঙ্গনেও এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পাবনার ফরিদপুর উপজেলায় সংঘটিত সাম্প্রতিক এক ঘটনা কেবল একজন সহকারী শিক্ষকের মাথায় ইটের আঘাতের চিহ্নই বহন করছে না, বরং তা আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতা এবং জনসাধারণের বিচার-প্রক্রিয়া সম্পর্কে এক তীব্র ও কঠিন প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করেছে। এই ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যেখানে মিডিয়া ট্রায়ালের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে, সেখানে প্রকৃত ট্রায়ালটি ঘটে যাচ্ছে সত্যের নীরবতা ও দায়বদ্ধতার শূন্যতার আদালতে। গত বৃহস্পতিবার(৪ ডিসেম্বর) সকাল ১১টার দিকে ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি দাবি-দাওয়া নিয়ে কর্মবিরতির প্রেক্ষাপটে বিদ্যালয়ে পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয়। অভিভাবকদের মতে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে এসেও ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলে আশপাশের অন্যান্য শিক্ষকরা প্রতিবাদে জড়ো হন। এই উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তে ভিড়ের মধ্য থেকে উড়ে আসে একটি ইট, যা বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাজীব সরকারের (কিছু প্রতিবেদনে রাজীব বিশ্বাশ নামে উল্লেখ) মাথায় আঘাত করে। গুরুতর আহত রাজীব সরকারকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় এবং তার মাথায় চার থেকে ছয়টি সেলাই দিতে হয়। এখানেই শেষ নয়, বরং শুরু হয় আরেকটি জটিল বিতর্কের। রাজীব সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, হামলাকারী ছিলেন “অজ্ঞাত” কিছু লোক। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ঘটনাস্থলে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ছিল না এবং তাঁর ঘটনার সঙ্গে বিএনপি বা জামায়াতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্থানীয় যুবদলের নেতা নয়ন কাজী (কিংবা নয়ন হোসেন) ও তার সহযোগীদের সরাসরি দায়ী করা হলেও, তারা তা জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। নয়ন কাজীর বক্তব্য, তিনি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখার খবর পেয়ে সত্যতা যাচাই করতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে গিয়ে আহত শিক্ষককে নিতে দেখেছেন। ফরিদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আজমের বক্তব্য, এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো প্রার্থিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। বেশ কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে যুবদলের সম্পৃক্ততার দিকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা নিয়েই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। এই ঘটনার সবচেয়েউল্লেখযোগ্য দিক হলো, আহত শিক্ষক নিজেই তাঁর বক্তব্যের মধ্যে “মিডিয়া ট্রায়াল”-এর প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। যদিও তিনি সরাসরি কোনো গণমাধ্যমকে অভিযুক্ত করেননি, তবে তাঁর মন্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, তাঁর প্রদত্ত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে কিছু সংবাদকর্মী যদি “রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে,” তবে তার দায় তারা নিজেরাই নেবেন। অন্যদিকে, যুবদলের নেতা নয়ন কাজী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে ও যুবদলকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়িয়ে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে, যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এখানেই প্রশ্ন জাগে: যখন একটি অপরাধের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুই হয়নি, তখন গণমাধ্যমের ‘ট্রায়াল’ কীভাবে সম্পাদিত হচ্ছে? এই ‘ট্রায়াল’-এর ভিত্তি কি অভিযোগপত্র নাকি পূর্বধারণা? পাবনার ফরিদপুরে এই ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় সংঘাত নয়; এটি আমাদের সামনে একটি জাতীয় পর্যায়ের সংকটকে উন্মোচিত করে-যেখানে সত্য প্রতিষ্ঠার আইনি পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে বা ধীরগতি সম্পন্ন হলে, তথ্যের শূন্যতা পূরণ করে জনমতের আদালত। আর এই আদালতের রায় অনেক সময়ই হয় অপূরণীয় ও অনিশ্চিত। মজার ব্যাপার হলো,এই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও সংঘাতের অভিযোগ ফরিদপুরের জন্য একেবারে নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক সহিংসতার বেশ কয়েকটি ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে: অক্টোবরে, ফরিদপুর সদরে সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ. কে. আজাদের গণসংযোগে হামলার অভিযোগ উঠেছিল, যেখানে যুবদলের কিছু নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
অক্টোবরের শেষদিকে, ফরিদপুর শহরে যুবদলের এক নেতাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিছু কর্মীর নাম আসে। গত জানুয়ারিতে ফরিদপুর সদরেই সাবেক এক যুবদল নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যার নামে হত্যা ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা ছিল। এই পটভূমি বিবেচনায় নিলে, ফরিদপুরে রাজনৈতিক টানাপড়েন ও সহিংসতার একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা লক্ষ্য করা যায়, যেখানে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা সময়ে সময়ে অভিযুক্ত কিংবা শিকার হয়েছেন। ফলে, বনওয়ারীনগর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের ঘটনাটিও একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই বৃহত্তর ও জটিল প্রেক্ষাপটেরই একটি প্রকাশ। ফরিদপুরের এই ঘটনাআমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে আসছে। প্রথমত, শিক্ষাক্ষেত্রকে রাজনৈতিক সংঘাতের আখড়া বানানো থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের দায়িত্ব হল সত্যানুসন্ধান ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রণয়ন, কোনও পক্ষকে হয়রানি বা ‘ট্রায়াল’ করা নয়। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এই ধরনের সংকট নিরসনের একমাত্র ভরসা। যতদিন পর্যন্ত বিচার ব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের পূর্ণ আস্থা প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বা জনরোষের আদালতের মতো বিকল্প পথের অনুসন্ধান চলতেই থাকবে। ফরিদপুরের সেই আহত শিক্ষকের মাথায় শুধু ইটের চিহ্ন নেই, আছে আমাদের সমগ্র ব্যবস্থার ব্যর্থতার এক অদৃশ্য কিন্তু গভীর আঘাতের ছাপ। এই আঘাত শুধু ব্যক্তির নয়, জাতির বিবেকের।
Post Views: 276
Related