উন্নয়নের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে আমাদের নগরজীবনের গতিপথ। চাকরি, শিক্ষা কিংবা জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন হাজারো মানুষ গ্রাম ও মফস্বল ছেড়ে অভিমুখী হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশকে জীবনযাপনের জন্য নির্ভর করতে হয় ভাড়া বাসার ওপর। কিন্তু বর্তমান নগরজীবনে এক বাসা থেকে অন্য বাসায় পরিবর্তন কিংবা নতুন করে সংসার গোছানোর সবচেয়ে ক্লান্তিকর ও যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা হলো ভারী আসবাবপত্র পরিবহন করা। সরু গলি, বহুতল ভবনের সিড়ি বেয়ে খাট, আলমারি, সোফা বা ফ্রিজ ওঠানো-নামানো যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি এতে নষ্ট হয় বিপুল মূল্যবান সময় ও শ্রম। এই সনাতন সংকট কাটাতে শহরের বাড়িওয়ালা বা মালিকগণ এক যুগান্তকারী ধারণা বাস্তবায়ন করতে পারেন—তা হলো ‘ফার্নিশড’ বা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি উপকরণসহ বাসা ভাড়া দেওয়ার সংস্কৃতি।
একটি আধুনিক ভাড়া বাসায় যদি খাট, ডাইনিং টেবিল, ওয়ারড্রোব, ফ্রিজ, কিংবা এসি-র মতো নূন্যতম প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে, তবে ভাড়াটিয়াকে বিশাল আসবাবের বোঝা বহন করতে হয় না। সুটকেস হাতে নিয়ে নতুন বাসায় উঠে যাওয়ার এই সুবিধা বিশেষ করে তরুণ পেশাজীবী, ছোট পরিবার, শিক্ষার্থী এবং বদলিযোগ্য চাকরিজীবীদের জীবনকে বহুগুণ সহজ ও চাপমুক্ত করে তুলবে। বাসা পরিবর্তনের মানসিক উৎকণ্ঠা ও যাতায়াত খরচ এক ধাক্কায় কমে আসবে শূন্যের কোঠায়।
তবে এই ধারণাটি কেবল ভাড়াটিয়ার সুবিধার্থেই সীমিত নয়; বরং এটি বাড়িওয়ালাদের জন্য এক লাভজনক ও টেকসই আয়ের উৎস হতে পারে। প্রচলিত অনকূল বা খালি বাসার তুলনায় আসবাবসহ বাসার ভাড়া বাজারমূল্য স্বাভাবিকভাবেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি হয়ে থাকে। মালিকরা কেবল চার দেয়ালের স্থানই ভাড়া দিচ্ছেন না, বরং জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার একটি ‘সার্ভিস’ বিক্রি করছেন। ফলে প্রাথমিক কিছু বিনিয়োগের মাধ্যমে একজন বাড়িওয়ালা তার সম্পদ থেকে দ্বিগুণ বা তারও বেশি রিটার্ন নিশ্চিত করতে পারেন।
তাছাড়া, শহরজুড়ে এখন ছোট ফ্ল্যাট ও ‘স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট’-এর চাহিদা হু হু করে বাড়ছে। এসব ছোট স্থানে ভাড়াটিয়াদের নিজস্ব বড় আসবাব বসানো প্রায় অসম্ভব। মালিকরা যদি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে স্থান সংকুলান রেখে সুবিন্যস্ত আধুনিক আসবাব ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম যুক্ত করেন, তবে সেই বাসার আকর্ষণ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এতে করে দীর্ঘদিন বাসা খালি পড়ে থাকার অনিশ্চয়তা দূর হবে এবং মানসম্মত ভাড়াটিয়া পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থাটি সফল করতে মালিক ও ভাড়াটিয়া উভয়পক্ষেরই সদিচ্ছা ও আধুনিক মানসিকতা প্রয়োজন। আসবাবপত্র বা উপকরণের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে সুনির্দিষ্ট লিখিত চুক্তি, নিরাপত্তা জামানত এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের নীতিমালা থাকা জরুরি।
পরিশেষে, আধুনিক নগরজীবন চায় দ্রুততা, স্বাচ্ছন্দ্য ও কার্যকারিতা। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে বহুকাল ধরে চলে আসা কেবল ‘জায়গা দেওয়া আর টাকা নেওয়া’-র সম্পর্কের বাইরে এসে এখন সেবাভিত্তিক আবাসন মডেল তৈরির সময় এসেছে। আসবাব ও প্রয়োজনীয় উপকরণসহ বাসা ভাড়ার ধারণাটি সফলভাবে চালু করা গেলে তা একদিকে যেমন লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করবে, অন্যদিকে শহরের আবাসন খাতকে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও প্রবৃদ্ধিজনক ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করবে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার,
শিক্ষা এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









