আওয়ামি লিগকে রাজনৈতিক দল হিশেবে নিষিদ্ধ করার দাবিতে ১০ মে শাহবাগে সমাবেশ করেছিল জামায়াতে ইসলামি এবং তাদের সমমনা দলগুলো। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো— আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে আহূত সমাবেশে শতভাগ স্বচ্ছতা ছিল। যারা এই সমাবেশ করেছেন, তাদের পরিচয় স্পষ্ট; তারা জামায়াতে ইসলামির এবং নামে-বেনামে জামায়াতের আরো যেসব শাখাপ্রশাখা বা খ-শাখা গ-শাখা আছে, সেসব সংগঠনের। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করা। একটা গণতান্ত্রিক দেশে যে-কেউ যেকোনো দলকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলতে পারে। আদালত ও রাষ্ট্র এ-ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। উল্লিখিত আন্দোলনে জামায়াত ও তাদের শাখাপ্রশাখারা যে-স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে, একই স্বচ্ছতা জুলাই আন্দোলনে দিলে জামায়াতকে সততার সনদ দেওয়া যেত। আওয়ামি লিগ সরকারের পলায়নের পরপরই জামায়াতে ইসলামি এবং ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে বলেছেন যে, জুলাই আন্দোলন তাদেরই পূর্বপরিকল্পনাপ্রসূত এবং জুলাইয়ে তারাই প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে এই আন্দোলনে জ্বালানি যুগিয়েছেন। কিন্তু জুলাইয়ে তারা তা স্বীকার করেননি। জুলাইয়ে শিবির সেজেছিল ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’, জামায়াত সেজেছিল ‘সাধারণ জনতা’। ২০২৫-এর মে মাসের মতো ২০২৪-এর জুলাই মাসেও তারা স্বনামে সরকারপতন-আন্দোলন করলে ইতিহাসে তারা ইতিবাচক চারিত্রিক সনদ পেতে পারত। যা হোক, আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে জামায়াত ‘আবেগ’ দমিয়ে রাখতে পারেনি। উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে পরানের গহিন ভেতর থেকে ফুড়ুৎ করে আবেগী হয়ে সুড়ুৎ করে স্লোগান দিয়ে বসেছে— ‘গোলাম আজমের বাংলায় আওয়ামি লিগের ঠাঁই নাই।’ একই স্লোগান দিয়েছে নিজামী ও সাঈদীর নাম বসিয়েও। বিপত্তি ঘটেছে এখানেই। জামায়াত ভেবেছিল— জাতি অন্যসবকিছুর মতো গোলাম আজম বা নিজামী-সাঈদীকেও নেবে। কিন্তু নেয়নি। উগড়ে ফেলে দিয়েছে। এই লেখায় আবিষ্কার করার প্রয়াস নেব বাংলা গোলাম আজমের কি না, গোলাম আজম বাংলার কি না।
জামায়াতে ইসলামি তাদের সাবেক আমির গোলাম আজমকে প্রায়ই ‘ভাষাসৈনিক’ বলে প্রচার করে থাকে। যখনই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ আসে, জামায়াত গোলাম আজমকে ভাষাসৈনিক বলে প্রচার করে তখনই। কিন্তু গোলাম আজমের ভাষাসংগ্রামের ইতিহাস ভীষণ সংক্ষিপ্ত। অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে স্বাগত জানিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়। তাতে মানপত্র পড়ার কথা ডাকসুর তৎকালীন ভিপি অরবিন্দ বসুর। কিন্তু মাত্রই ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীন-হওয়া একটা মুসলমান-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে মানপত্র পাঠ করবেন একজন অমুসলমান ছাত্র— ব্যাপারটা তখন অস্বস্তির জন্ম দিয়েছিল। সে-সময়ে ডাকসুর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন গোলাম আজম। ১৯৪৮-৪৯ সেশনে ডাকসু নির্বাচন হয়নি। তাই, আগের সেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজমকেই সাধারণ সম্পাদক রেখে দেওয়া হয়েছিল। যা হোক, অরবিন্দ বসুর পরিবর্তে গোলাম আজমকে ঐ মানপত্র পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়। মানপত্রের লেখক ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি আবদুর রহমান চৌধুরী। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল ঐ মানপত্রে। মানপত্রপাঠ বাবদ জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে গোলাম আজমকে ‘ভাষাসৈনিক’ বলে প্রচার করে থাকে, বিশেষত নব্বইয়ের দশকে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এই অনুচ্ছেদের সব তথ্য নিয়েছি গোলাম আজমেরই আত্মজৈবনিক বই ‘জীবনে যা দেখলাম’-এর প্রথম খণ্ড থেকে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো— ১৯৭০ সালের জুন মাসে পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশের শক্কুর শহরে ‘আনজুমান-এ-ইয়ারানে শক্কুর’ কর্তৃক আয়োজিত এক সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানে গোলাম আজম বলেছিলেন— ‘মুসলমানদের অধিকাংশ তমদ্দুন ও ধর্মীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার উর্দু ভাষায় সংরক্ষিত রয়েছে। জাতীয় ভাষার প্রশ্ন ওঠার পর পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনকারীদের মধ্যে আমিও ছিলাম। কিন্তু পাকিস্তানপ্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে তা মোটেও সঠিক কাজ হয়নি। কেননা, উর্দুভাষা ব্যাপকভাবে প্রচলিত এবং পাক-ভারতের সকল প্রদেশের মুসলমানরাই তা বুঝতে পারে।’ দেখা গেল— যৌবনে তিনি সীমিত পরিসরে হলেও ভাষা-আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন; প্রৌঢ়বয়সে এসে যখন দেখলেন তার অখণ্ড পাকিস্তান লাগবে, তখনই তিনি তার যৌবনের ভাষা-আন্দোলনকে ত্যাজ্য করে দিলেন; আবার স্বাধীন বাংলাদেশে যখন ভাষাসৈনিকদের জয়জয়কার দেখা গেল এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠল, তখন তিনি আবার ভাষাসৈনিক হয়ে গেলেন। রূপবদলে জামায়াত ও গোলাম আজম অবিশ্বাস্য রকমের অপ্রতিদ্বন্দ্বী। স্বার্থসিদ্ধির জন্য গণদাবির বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে বারবার ভুল করলে দশা এমনই হয়। ‘গোলাম আজমের বাংলায় আওয়ামি লিগের ঠাঁই নাই’ স্লোগান দেওয়ার সময়ে যদি গোলাম আজমের ভাষাসৈনিক-সত্তার কথা মাথায় রাখা হয়, তা হলে বলতে হয়— গোলাম আজম নিজেই ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ভাষা-আন্দোলনকে ১৯৭০ সালের জুনে অস্বীকার করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন ‘পাকিস্তানপ্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে’ ভাষা-আন্দোলন ভুল ছিল।
এখানে আরেকটি ব্যাপার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ট্যাংকের গোলার আঘাতে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় শহিদমিনার ধ্বংস করে। ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকায় ১৬ জুলাই সম্পাদকীয়তে লেখা হয়— ‘আইয়ুব খানের গভর্নর আজম খান ছাত্রদেরকে খুশি করানোর জন্য যে-শহিদমিনার তৈরি করলেন; তাকে পূজামণ্ডপ বলা যেতে পারে, কিন্তু মিনার কিছুতেই না। যা হোক, সেনাবাহিনী এই কুখ্যাত মিনারটি ধ্বংস করে সেখানে মসজিদ গড়ে শহিদদের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন জেনে দেশবাসী খুশি হয়েছে।’ দৈনিক সংগ্রাম জামায়াতে ইসলামির মুখপত্র আর গোলাম আজম পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামির তৎকালীন আমির। জামায়াতের আমির ভাষাসৈনিক হলে জামায়াতের মুখপত্র শহিদমিনারকে নিশ্চয়ই ‘কুখ্যাত’ বলত না, শহিদমিনার ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনায় আকণ্ঠ আনন্দিত হতো না। তা ছাড়া, আত্মজৈবনিক বই ‘জীবনে যা দেখলাম’-এ আজম লিখেছেন— ‘উপমহাদেশে যারা ইসলামের কর্মসূচি নিয়ে চর্চা করেন, তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমই হলো উর্দু। শ্রী লঙ্কা, নেপাল, আফগানিস্তান ও মায়ানমারসহ গোটা উপমহাদেশের মুসলমানদের কমন ভাষা একমাত্র উর্দুই। উচ্চশিক্ষিতদের জন্য ইংরেজি কমন ভাষা হলেও সকলের জন্য উর্দুর কোনো বিকল্প নেই। মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন কারণে এ-ভাষায়ই সবচেয়ে সহজে ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মুসলমানদের বিরাট জনশক্তি ঐসব দেশে রয়েছে। তাদের মধ্যে যারা ইসলামি কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। উপমহাদেশের কোনো দেশ থেকে কোনো ইসলামি ব্যক্তিত্ব এলে তারা যৌথ সমাবেশের আয়োজন করে থাকেন। তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের মাধ্যম প্রধানত উর্দু ভাষা।তাই বাংলাদেশীরাও উর্দু মোটামুটি বোঝে এবং কিছু কিছু বলতেও পারে।’ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা চাওয়া কোনো ভাষাসৈনিকের বক্তব্য নিশ্চয়ই এমন হওয়ার কথা না।
মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামি সর্বাত্মকভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ অবলম্বন করেছিল। অখণ্ড পাকিস্তান নিশ্চিত করার জন্য জামায়াত কেবল রাজনৈতিক ভূমিকাই পালন করেনি, পালন করেছে সশস্ত্র ভূমিকাও। তখন গোলাম আজম ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামির আমির। গোলাম আজম ভূমিকা রেখেছেন শান্তি কমিটি, আল-বদর ও রাজাকারবাহিনী প্রতিষ্ঠায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দফায়-দফায় পাকিস্তানে গিয়েছেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সেনাকর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করতে। গোলাম আজম ছিলেন শান্তি কমিটির প্রতিষ্ঠাকালীন একুশসদস্যবিশিষ্ট ওয়ার্কিং কমিটির তিন নম্বর সদস্য। শান্তি কমিটির উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল জোহরের নামাজের পর বায়তুল মোকাররম থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত যে-মিছিল হয়, সেই মিছিলের অগ্রভাগে ছিলেন গোলাম আজম। মিছিলে স্লোগান দেওয়া হয়— ১) ভারতের দালালি; চলবে না, চলবে না; ২) ওয়াতানকে গাদ্দারোসে হুঁশিয়ার; ৩) আমরিকি গাদ্দারোসে হুঁশিয়ার; ৪) সংগ্রাম? না শান্তি? শান্তি, শান্তি; ৫) পাকিস্তানি ফৌজ— জিন্দাবাদ; ৬) কায়েদে আজম— জিন্দাবাদ; ৭) ইন্দিরা গান্ধী— মুর্দাবাদ; ৮) ইয়াহিয়া খান— জিন্দাবাদ; ৯) টিক্কা খান— জিন্দাবাদ; ১০) আল্লাহতা’লা মেহেরবান, ধ্বংস করো হিন্দুস্তান। মিছিলশেষে মোনাজাত পরিচালনা করেছিলেন গোলাম আজম। ‘পাকিস্তানের সংহতি ও অশেষ ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত পাকিস্তানের বুনিয়াদ যেন অটুট থাকে’ এবং ‘ভারতের ঘৃণ্য হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তান যেন উপযুক্ত জবাব দিতে পারে’— মোনাজাতে গোলাম আজম এই দোয়া করেন। সমাবেশ শেষ করে মিছিলকারীরা আজিমপুর কলোনি, শান্তিনগর ও শাঁখারিবাজারে বাঙালিদের বাড়িঘরে আগুন দেয় এবং বেশকিছু বাঙালিকে ধাওয়া করে হত্যা করে রাস্তার পাশে লাশ ফেলে রাখে। মিছিলের স্লোগান, মোনাজাতের ভাষা ও এই হত্যাকাণ্ডের তথ্যসূত্র ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশকেন্দ্র’ কর্তৃক ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত বই ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’।
একই বইয়ে উদ্ধৃত আছে— ‘পাক সামরিক জান্তার চেয়ে এই তথাকথিত শান্তি কমিটি গণহত্যায় আরো বেশি অবদান রেখেছে। পাক সেনারা যে-জনপদে গেছে, সেখানেই বেপরোয়াভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। কিন্তু শান্তি কমিটি খুন করেছে সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুতের মাধ্যমে অত্যন্ত নৈপুণ্যের সঙ্গে। শান্তি কমিটির সদস্যরা নিজের হাতে খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও ধ্বংসাত্মক কাজ করা ছাড়াও এসব কাজের জন্য গড়ে তুলেছে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস প্রভৃতি বাহিনী। শান্তি কমিটি পরিচালিত গণহত্যা আরো বেশি ক্ষতিকর ছিল এই কারণে যে, পাকসেনারা তাদের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাতে পেরেছে তাদের অবস্থানস্থলের কাছাকাছি পর্যন্ত, কিন্তু শান্তি কমিটি সুবিস্তৃত ছিল জালের মতো— অবরুদ্ধ বাংলাদেশের সর্বত্র। এ ছাড়া, পাক সেনারা হত্যা করত কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী— ত্রাস সৃষ্টি করা এবং জিঘাংসা ও লাম্পট্য চরিতার্থ করার জন্য। কিন্তু শান্তি কমিটির ক্ষেত্রে এর সাথে যুক্ত হয়েছিল নিহতদের সম্পত্তি দখল, প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, সামরিক জান্তার বাহবা অর্জন, বিকৃত ধর্মীয় উন্মাদনা ইত্যাদি কারণ।’ ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের ‘আজাদি দিবস’ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি-আয়োজিত সভায় গোলাম আজম আহ্বান জানান ‘পাকিস্তানের দুশমনদেরকে’ মহল্লায়-মহল্লায় ‘তন্নতন্ন করে খুঁজে’ তাদের অস্তিত্ব ‘বিলোপ’ করার জন্য।
১৯৭১-এর হত্যাযজ্ঞের ২৬৬ দিনে গোলাম আজম বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে অক্লান্ত ছোটাছুটি করে যত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, এর পূর্ণ বিবরণ দিতে গেলে বড় বই প্রকাশ করতে হবে— তা-ও কয়েক খণ্ডে। মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম আজমের উচ্চারিত কিছু উল্লেখযোগ্য উক্তি ও কর্মকাণ্ড এই লেখায় অন্তর্ভুক্ত করব। বাংলাদেশে ইয়াহিয়া খানের তরফ থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। টিক্কা খান ছিলেন অপারেশন সার্চলাইটের শীর্ষপরিকল্পনাকারী। বাংলাদেশে সামরিক অভিযান শুরুর দশ দিনের মাথায়ই— ৬ এপ্রিল— গোলাম আজম টিক্কার সাথে দেখা করেন এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম এ-ব্যাপারে ৭ এপ্রিল লিখেছিল— ‘সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামির আমির গোলাম আজম, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামির পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি পির মহসিনউদ্দিন আহমেদ এবং অ্যাডভোকেট একে সাদিক পৃথকভাবে জেনারেল টিক্কা খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং পাকিস্তানে সশস্ত্র ভারতীয় অনুপ্রবেশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন যে, প্রদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ ভারতের দুরভিসন্ধিকে বানচাল করার জন্য সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করবেন।’ এর দশ দিন পর ১৬ এপ্রিল গোলাম আজম টিক্কা খানের সাথে আবারও দেখা করেন। ২৪ এপ্রিল শান্তি কমিটির মোহাম্মদপুর উপ-কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যে-চারজনকে, গোলাম আজম তাদের একজন।
গোলাম আজম করাচি গিয়েছিলেন ১৭ জুন। ১৯ জুন গিয়েছিলেন রাওয়ালপিন্ডিতে। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের সাথে ১৯ জুন দেখা করে গোলাম আজম বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত করতে। পাকিস্তানে অবস্থানকালে তিনি সেখানকার বিভিন্ন শহরে সাংবাদিকসম্মেলন, জনসভা, কর্মিসভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন। সত্তরের নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের ওপর যখন আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হয়, তখন— ১৮ জুন, লাহোর বিমানবন্দরে গোলাম আজম বলেন— ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এখনও আসেনি; যে-সংগঠনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল, তারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।’ ওখানেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে বলেছিলেন— ‘দুষ্কৃতকারীরা এখনও তাদের ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত রয়েছে। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো এবং বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতিকে দীর্ঘতর করা। রাষ্ট্রানুগত নাগরিকদের ওপরই দুষ্কৃতকারীরা হামলা করছে।’ ১৯ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে ইয়াহিয়া খানের সাথে দেখা করে সাংবাদিকসম্মেলনে গোলাম আজম পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ‘দুষ্কৃতকারীদের’ মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে ‘দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের’ হাতে অস্ত্র সরবরাহের। বলাই বাহুল্য— এখানে ‘দুষ্কৃতকারী’ মানে মুক্তিযোদ্ধারা। আর ‘দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী’ লোকজন হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী অন্যান্য দল ও জামায়াতে ইসলামি।
এর পরেরদিন, ২০ জুন, লাহোরে আয়োজিত আরেকটি সাংবাদিকসম্মেলনে গোলাম আজম বলেন— ‘দেশের সংহতি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সব দুষ্কৃতকারীকে উৎখাত করেছে এবং বর্তমানে এমন কোনো শক্তি নেই, যা সেনাবাহিনীর প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।’ সেখানে তিনি বলেছিলেন পাকিস্তান ও ইসলাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং কেবল ইসলামি আদর্শই পাকিস্তানের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে পারে। আরো বলেছিলেন— তার দল জামায়াতে ইসলামি পূর্ব পাকিস্তানে ‘দুষ্কৃতকারী’ দমনে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে এবং এজন্য ‘দুষ্কৃতকারীদের হাতে’ বহু জামায়াতকর্মী ‘শহিদ’ হয়েছেন। তিনি সেখানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও জামায়াত পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। তিনি সেখানে এমন প্রশ্নও তুলেছিলেন— বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলেও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি, মোজাফ্ফর আহমদ এবং আতাউর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন। করাচির একটা পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২১ জুন গোলাম আজমের বক্তব্য ছিল— ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল এ-দেশে সবসময়ই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে। বিগত নির্বাচনে জাতি অনেক কিছুই আশা করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে যারা জিতেছিল, তারা নিজেদেরকে গণতন্ত্রপ্রিয় বলে দাবি করলেও তারা ছিল ফ্যাসিস্ট।’ ২১ জুন লাহোরে জামায়াতের কর্মিসভায়— তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-আন্দোলনকে ‘ধ্বংস’ করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং বলেন নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামি লিগ কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে সৃষ্ট সাম্প্রতিক গোলযোগ ১৮৫৭ সালের সিপাহিবিদ্রোহের চেয়ে দশগুণ বেশি শক্তিশালী।
২২ জুন গোলাম আজম সাংবাদিকসম্মেলন করেছিলেন করাচির একটি হোটেলে। সেখানে তিনি বলেছিলেন নিষিদ্ধ আওয়ামি লিগের ১৯৬৬ সালের ছয় দফার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং একমাত্র ইসলামই পারে পাকিস্তানের দুই অংশকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য দুষ্কৃতকারীদেরকে, অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে, কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে তিনি সেখানেও আহ্বান জানান এবং ‘পাকিস্তানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য’ সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ জানান।
মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাম আজম কেবল যে বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে ছোটাছুটি করেই ক্ষান্ত ছিলেন, তা নয়। বিশ্বব্যাংক পাকিস্তান ঋণদান বন্ধ করে দিলে তিনি মুসলমানসংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে বিবৃতি দেন পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করার জন্য। জুনের ২৬ তারিখে দেওয়া বিবৃতিতে গোলাম আজমের ভাষ্য ছিল এ রকম— ‘পাকিস্তান তার ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বব্যাংক কনসোর্টিয়াম পাকিস্তান সরকারকে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় না-আসা পর্যন্ত সব ধরনের ঋণদান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কনসোর্টিয়ামের এই সিদ্ধান্ত আমাদের জাতীয় মর্যাদার প্রতি অত্যন্ত অবমাননাকর এবং আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ। মনে হয়, ভারতের মিথ্যা ও দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণা এবং আমেরিকা ও তার এজেন্টদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ মুসলমানসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর শিল্পপতি ও ধনকুবেরদের প্রতিও তিনি আহ্বান জানান পাকিস্তানকে সহযোগিতা করার জন্য। ’৭০-এর নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামি লিগ যে-আসনগুলো পেয়েছিল, জামায়াতে ইসলামি আর মুসলিম লিগ ইয়াহিয়া খানকে নানামুখী চাপ দিয়ে তা বাতিল করায়। ইয়াহিয়ার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েও গোলাম আজম বিবৃতি দিয়েছিলেন— ২৮ জুন।
১৬ জুলাই রাজশাহী শান্তি কমিটি-আয়োজিত সুধীসমাবেশে গোলাম আজমের বক্তব্য ছিল— ‘যাদের নিজেদের শক্তি নেই, তারা হিন্দুস্তানের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে স্বাধীন হতে চায়। হিন্দুরা মুসলমানের বন্ধু— এরূপ প্রমাণ করার মতো কোনো দলিল নেই। তারা চিরদিনই মুসলমানের সাথে দুশমনি করে এসেছে।’ বাঙালি-অবাঙালি মনোভাব ত্যাগের জন্য তিনি সব মুসলমানকে আহ্বান জানান স্বাধীনতাবিরোধীদের ঐ সমাবেশে। তিনি আগস্টের ৩ তারিখে মাদ্রাসাছাত্রদের সমাবেশে বলেছেন— ‘এই যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের সম্মুখযুদ্ধই নয়, আদর্শিক যুদ্ধ। আল্লাহ্র দ্বীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই দেশকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে।’ আজম ৮ আগস্ট ভাষণ দিয়েছিলেন কুষ্টিয়া জেলা শান্তি কমিটির সভায়। সেখানে তিনি বলেছিলেন— ‘শেখ মুজিব ও আওয়ামি লিগ ভারতের সাথে আঁতাত করে এ-অঞ্চলের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এ-বিশ্বাসঘাতকতার ফলে জনগণের ওপর অবর্ণনীয় দুঃখদুর্দশা নেমে এসেছে। দেশের ভেতরের ও বাইরের হিন্দু বাঙালিরা বাঙালি মুসলমানদের জাগরণকে বরদাশত করতে পারেনি। সুতরাং ভারতের আশীর্বাদে তারা একটি ষড়যন্ত্র ফেঁদে বসে।’ কুষ্টিয়ায়ও গোলাম আজম জনগণকে আহ্বান জানান ‘দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে সজাগ দৃষ্টি রাখতে’ এবং শান্তি কমিটিকে সহযোগিতা করতে। পাকিস্তান থেকে আসা দুইজন জামায়াতনেতাও ঐ সভায় বক্তৃতা করেন এবং তারা বলেন ইসলামের বন্ধনই পাকিস্তান সৃষ্টির ভিত্তিমূল হিশেবে কাজ করেছে, এই বন্ধনই পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল নেজামে ইসলামের সহ-সভাপতি, শান্তি কমিটির প্রভাবশালী নেতা মোস্তফা আল-মাদানি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে সরবরাহ করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে আশ্রয়দানকারী অনেক গ্রাম তার উসকানিতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। দেশজুড়ে ওয়াজ মাহফিলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেন। ১৯৭১-এর ১০ আগস্ট বিক্রমপুরে মুক্তিযোদ্ধারা তাকে গুলি করে হত্যা করেন। মাদানির মৃত্যু স্বাধীনতাবিরোধীদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। পরেরদিন দেওয়া বিবৃতিতে গোলাম আজম বলেছিলেন— ‘মওলানা মাদানির এই শাহাদাতের সত্যিকারের মর্যাদা তখনই সম্ভব, যখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যেক মুসলমান নিজ এলাকার দুষ্কৃতকারীদেরকে তন্নতন্ন করে তালাশ করে তাদের থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য রাতদিন চেষ্টা করবে।’ পাকিস্তানের স্বাধীনতাদিবস উপলক্ষে ১৪ আগস্ট দেওয়া বিবৃতিতে গোলাম আজম বলেন— ‘দেশের ঐক্য ও সংহতি বর্তমানে সংকটাপন্ন। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রুদের দ্বারা হুমকির সম্মুখীন। ভারতীয় অপপ্রচারে বিভ্রান্ত বিদেশী সংবাদপত্র ও বৃহৎ শক্তিবর্গ পাকিস্তানের প্রতি অবন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব পোষণ করছে।’ পাকিস্তানের স্বাধীনতাদিবস উপলক্ষে এর পরেরদিন, ১৫ আগস্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত সিম্পোজিয়ামে আজম বলেন— ‘পাকিস্তান টিকে থাকলে আজ হোক, কাল হোক; বাঙালি মুসলমানরা তাদের অধিকার আদায় করতে পারবেই। কিন্তু আল্লাহ্ না-করুন, যদি পাকিস্তান না-থাকে; তা হলে বাঙালি মুসলমানদের মৃত্যুবরণ করতে হবে।’ প্রত্যেক মহল্লা থেকে ‘পাকিস্তানের দুশমনদেরকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করে’ তাদের (মানে মুক্তিযোদ্ধাদের) অস্তিত্ব বিলোপ করার আহ্বান গোলাম আজম এই সিম্পোজিয়ামেও জানিয়েছিলেন। একই দিনে ছাত্রসংঘ-আয়োজিত সভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে আজম বলেছিলেন— ‘বাংলাদেশ বাঙালিদের দ্বারা শাসিত হবে— এ-মতবাদ শেখ মুজিব বা শ্রী তাজউদ্দিনের। এজন্যই তথাকথিত বাঙালি বীরেরা পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ কায়েম করেছে।’
পাকিস্তানের স্বাধীনতাদিবস উপলক্ষে ঢাকা টেলিভিশনে দেওয়া বক্তৃতায় গোলাম আজম বলেন— ‘দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রের নামই স্থান, ভাষা, জাতি বা ঐতিহাসিক কোনো নাম থেকে নেওয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানের নাম এ-ব্যাপারে একমাত্র ব্যতিক্রম। এ-নাম— যা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যের প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দান করে— এ-নামের অর্থ হলো পবিত্র স্থান।’ কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তান নামের সাথে পবিত্রতার কোনো সম্পর্ক নেই। পাকিস্তান নামটি এসেছে পাঞ্জাব, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, ইন্দুস-এর প্রথম ইংরেজি চার অক্ষর আর বেলুচিস্তানের স্তান-এর সমন্বয়ে। উল্লেখ্য, ‘ইন্দুস’ হলো সিন্ধুর ইংরেজি নাম। আর উত্তর-পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ পাকিস্তান সৃষ্টির আগে আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ গোলাম আজম ‘পাকিস্তান’ নামটির ওপর মিথ্যা পবিত্রতা আরোপ করেছিলেন। আরো উল্লেখ্য, পাকিস্তান শব্দটির ভেতর অন্য সব রাজ্যের নাম থাকলেও ছিল না পূর্ববাংলার নাম। চৌধুরী রহমত আলীরা ১৯৩৩ সালে যখন এই নাম তৈরি করেন, তখন কেউ ধারণা করতে পারেনি— পূর্ব বাংলা কখনও পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেবল ধর্মের ভিত্তিতে হাজার মাইল দূরবর্তী দুটো অঞ্চল যে অভিন্ন দেশ হতে পারে না, পাকিস্তানই এর প্রমাণ। পাকিস্তানের স্বাধীনতাদিবস উপলক্ষে আজম ঢাকার শান্তিবাগেও জনসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। বলেছিলেন— ‘দুষ্কৃতকারী ও ভারতের অনুপ্রবেশকারীদেরকে সমূলে উৎখাত করার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব না।’
নিজেদের সক্ষমতা বিবেচনা না-করে দায়িত্বজ্ঞানহীন উসকানি দেওয়ার কাজও গোলাম আজম করেছেন। তিনি ১৭ আগস্ট লাহোরে পৌঁছেই বিমানবন্দরে সাংবাদিকদেরকে বলেছিলেন— ‘ভারত পাকিস্তানের ওপর কার্যত যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানকে ভাঙার জন্য ভারত সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠাচ্ছে। এখন শক্তি দিয়ে হামলা মোকাবেলার জন্য একমাত্র পথই পাকিস্তানের খোলা আছে। কালবিলম্ব না-করে এখন পাকিস্তানের উচিত ভারত আক্রমণ এবং আসাম দখল করে নেওয়া।’ ২৩ আগস্ট লাহোরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গোলাম আজমকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন— ‘জামায়াতে ইসলামিকে যারা অ-দেশপ্রেমিক দল হিশেবে আখ্যায়িত করেন, তারা হয়তো এ-সত্য জানেন না অথবা স্বীকার করার সৎসাহস নেই যে, শুধু ইসলামি আদর্শকে সমুন্নত রাখা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিষদাঁত ও নখ ভেঙে দেওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের বহুসংখ্যক কর্মী দুষ্কৃতকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে।’ ২৬ আগস্ট আজম সাংবাদিকসম্মেলনে কথা বলেছিলেন পেশোয়ারে। সেখানে বলেছেন— ‘বিদ্রোহীদের মিরজাফরি ও ভারতের দুরভিসন্ধির হাত থেকে সশস্ত্রবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করেছে। দুষ্কৃতকারী ও অনুপ্রবেশকারীদেরকে ধ্বংস করার কাজে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সশস্ত্রবাহিনীকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। কারণ, জনগণ বিদ্রোহ করেনি, করেছে অধুনালুপ্ত আওয়ামি লিগের ফ্যাসিবাদী নেতাকর্মীরা।’ ২৯ আগস্ট করাচির সাংবাদিকসম্মেলনে আজম বলেন— ‘দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা সৃষ্ট কয়েকটি ছোটখাটো ঘটনা ছাড়া পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসছে’। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ’৭০-এর নির্বাচনে হিন্দুদের সমর্থন নিয়ে আওয়ামি লিগ বিজয়ী হয়েছিল। এ-কারণে তিনি হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনপদ্ধতি চালুর দাবি করেছিলেন।
১৯৭১-এ গোলাম আজম কোন দিন কী বলেছিলেন, এই লেখাটিতে মূলত তা-ই বর্ণনা করে চলছি। অন্যদের বক্তব্য বর্ণনা করছি না। কিন্তু দৈনিক সংগ্রামের একটি সম্পাদকীয় এখানে উল্লেখ না-করে পারছি না। উল্লেখ না-করলে অস্বস্তি লাগবে। আমরা জানি যে, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান পাকিস্তান থেকে একটি যুদ্ধবিমান ছিনতাই করে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে গিয়ে নিহত হয়েছিলেন ২০ আগস্ট। আর তাতে বাধা দিয়েছিলেন পাকিস্তানি পাইলট রশিদ মিনহাজ। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ায় মারা গিয়েছিলেন দুজনই। ৩০ আগস্ট দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয় ছিল এ-রকম— ‘পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাইলট অফিসার রশিদ মিনহাজ জাতির জন্য নিজের জীবন কোরবানি দিয়ে দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধের এক অত্যুজ্জ্বল নিদর্শন আমাদের সামনে রেখে গেলেন। পাকিস্তান সরকার সাহসিকতার জন্য পাকিস্তানের সর্বোচ্চ খেতা নিশান-ই-হায়দার দিয়ে মরহুম মিনহাজকে সম্মানিত করছে। মরহুম মিনহাজের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের কাহিনী যখন আমরা শুনেছি, তখন আমাদের বুক গর্বে-আনন্দে ভরে উঠেছে।’ আর ১ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে মতিউর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেয় দৈনিক সংগ্রাম। মিনহাজের বাবাকে পাঠানো তারবার্তায় মতিউর রহমান নিজামী উল্লেখ করেছিলেন মিনহাজের আত্মত্যাগে পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ গর্বিত। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে মতিউর রহমান নিজামী সেই বার্তায় ‘ভারতের এজেন্ট’ বলে উল্লেখ করেন।
সেপ্টেম্বরের ৫ আর ৮ তারিখে দৈনিক সংগ্রামে দুই কিস্তিতে গোলাম আজমের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বলেছিলেন— ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জামায়াতকে মনে করে পয়লা নম্বর শত্রু। তারা তালিকা তৈরি করেছে এবং জামায়াতের লোকদের বেছে-বেছে হত্যা করছে। তাদের বাড়িঘর লুট করছে, জ্বালিয়ে দিয়েছে। এতদ্সত্ত্বেও জামায়াতকর্মীরা রেজাকারে ভর্তি হয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় বাধ্য। কারণ, তারা জানে বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কোনো স্থান হতে পারে না। জামায়াতকর্মীরা শহিদ হতে পারে, কিন্তু পরিবর্তিত হতে পারে না।’ ৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়— ‘দেশের প্রতিরক্ষা ও দুশমনদেরকে সমুচিত শাস্তি দেওয়ার জন্য আমাদের সশস্ত্রবাহিনী সবসময় প্রস্তুত রয়েছে। শান্তি কমিটির কর্মতৎপরতা এবং দুশমনদের ওপর রেজাকার ও বদরবাহিনীর মারণাঘাত সে-সচেতনতাবোধেরই বাস্তব স্বাক্ষর বহন করছে। আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক প্রতিরোধ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠুক, এ-কামনাই আমরা করি।’ ঐদিন দৈনিক সংগ্রাম আরো লিখেছিল— ‘ভারতীয় চরদের আখড়া স্থানীয় রেজাকারদের জানা থাকায় সেনাবাহিনীর চাইতেও কোথাও-কোথাও সাফল্যজনকভাবে তাদের শায়েস্তা করে চলছে, ফলে সুদূর পল্লির শান্তিকামী নাগরিকরাও আজ স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়তে পারছে।’ অর্থাৎ জামায়াতের পত্রিকাই লিখেছে যে, রাজাকারবাহিনী একাত্তরে বাঙালিনিধনে ক্ষেত্রবিশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চেয়েও অগ্রগামী ছিল। বলা হয়ে থাকে— অপরাধীরা ঘটনাস্থলে কোনো-না-কোনো পদচিহ্ন রেখে যায়। দৈনিক সংগ্রামও জামায়াতে ইসলামি ও গোলাম আজমদের মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের পদচিহ্ন।
সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে দৈনিক সংগ্রাম গোলাম আজমের আরো একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল আংশিক বাতিল করে (অর্থাৎ আওয়ামি লিগের প্রাপ্ত আসনগুলো বাদ দিয়ে) পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এ একটা উপনির্বাচন দিতে চেয়েছিল। সেই নির্বাচন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে আজম বলেছিলেন— ‘অক্টোবরের শেষে বন্যার পানি চলে যাওয়ার পরই গ্রামাঞ্চলে দুষ্কৃতকারীদের দমন করার কাজ শুরু হবে। তাদেরকে দমন করার পর নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। দুষ্কৃতকারী দমন না-হলে নির্বাচন অনুষ্ঠান অসুবিধাজনক বৈকি।’ ‘পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণের জন্য আপনার মতে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত’— এই প্রশ্নের জবাবে আজম বলেন— ‘পূর্ব পাকিস্তানের সোশালিস্ট ও কমিউনিস্টদের সমস্ত উপদল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারী সেজে তাদের চিন্তানায়কদের গেরিলাপদ্ধতির অনুসরণ করে চলেছে। এর মোকাবেলা করতে হলে সরকারি ও বেসরকারি মহল থেকে এসব মহলের পরিচালকদেরকে তল্লাশি করে বের করে আনতে হবে।’ ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দৈনিক সংগ্রাম লিখেছিল— ‘আলবদর একটি নাম! একটি বিস্ময়! আলবদর একটি প্রতিজ্ঞা! যেখানে তথাকথিত মুক্তিবাহিনী, আলবদর সেখানেই। যেখানে দুষ্কৃতকারী, আলবদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা অনুপ্রবেশকারীদের কাছে আলবদর সাক্ষাৎ আজরাইল।’
১৪ সেপ্টেম্বরেই যশোরের রাজাকার সদরদপ্তরে নিজামীর দেওয়া ভাষণ সম্পর্কে দৈনিক সংগ্রাম পরেরদিন লেখে— ‘পবিত্র কোরআনের সুরায়ে তওবার ১১১ ও ১১২ আয়াতের আলোকে জাতির এই সংকটজনক মুহূর্তে প্রত্যেক রেজাকারকে ইমানদারির সাথে তাদের ওপর অর্পিত এ-জাতীয় কর্তব্যপালনে সচেতন হওয়ার জন্য মতিউর রহমান নিজামী তাদের প্রতি আহ্বান জানান।’ সুরা তওবার আয়াত ১১১-এর বঙ্গানুবাদ হলো— ‘প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ্ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহ্র পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে । তাদের প্রতি তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে (জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহ্র জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদাবিশেষ। আর আল্লাহ্র চাইতে বেশি ওয়াদাপূরণকারী আর কে আছে! কাজেই তোমরা আল্লাহ্র সাথে যে-কেনাবেচা করছ, সেজন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য।’
সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে রুটিনকাজের অংশ হিশেবে গোলাম আজম মোহাম্মদপুর শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের রাজাকার ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন— ‘ইসলাম ও পাকিস্তানের দুশমনরা আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদেরকে ব্যাপক হারে হত্যা করে এ-কথাই প্রমাণ করছে যে, এসব লোককে খতম করতে পারলেই পাকিস্তানকে ধ্বংস করা যাবে। আলেম ও দ্বীনদারদের ওপর হামলা এক হিশেবে আল্লাহ্র রহমত। আলেম ও ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের ওপর ব্যাপক হারে হামলা না-হলে তারা আত্মরক্ষা ও পাকিস্তানের হেফাজতের জন্য রেজাকার, মুজাহিদ ও পুলিশবাহিনীতে ভর্তি হয়ে সশস্ত্র হওয়ার প্রয়োজন বোধ করতেন না।’ রাজাকারবাহিনীর নেতৃত্ব ছিল জামায়াতে ইসলামির হাতে কুক্ষিগত। এই বাহিনীতে জামায়াতকর্মীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে পাকিস্তানপন্থি অন্যান্য দলের সাথে এ নিয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। মোহাম্মদপুর রাজাকার ক্যাম্পে এ-ব্যাপারে আজম বলেন— ‘রেজাকারবাহিনী কোনো দলের নয়। তারা পাকিস্তানে বিশ্বাসী সকল দলের সম্পদ। কোনো দলের লোক কম বা কোনো দলের বেশি লোক রেজাকারবাহিনীতে থাকতে পারে। কিন্তু রেজাকাররা দলমতের ঊর্ধ্বে পাকিস্তানে বিশ্বাসী সকল দলকে আপন মনে করবে।’ ভালোভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামে-গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে গোলাম আজম রাজাকারদেরকে বলেছিলেন— ‘আপনারা অভ্যন্তরীণ দুশমনদেরকে দমন করার জন্য যত তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসবেন, তত তাড়াতাড়ি সেনাবাহিনী দেশকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্বে ফিরে যেতে পারবে।’ তিনি সেখানে আরো বলেন— ‘ভালো লোকের হাতে অস্ত্র না-থাকলে তা উপকারের পরিবর্তে অপকার করে। যদি সত্যিকারের মুসলমানদেরকে সেনাবাহিনীতে গ্রহণ করা হতো, তা হলে সেনাবাহিনীর মধ্যে এই বিদ্রোহ হতো না।’
পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর যে ‘মালেক মন্ত্রিসভা’ গঠন করেছিল, তাতে জামায়াত থেকে স্থান পেয়েছিলেন দুইজন— আব্বাস আলী খান আর একেএম ইউসুফ। ২৪ সেপ্টেম্বর জামায়াত তাদেরকে সংবর্ধনা দেয়। সংবর্ধনাসভায় গোলাম আজম বলেন— ‘পাকিস্তান সারা বিশ্বমুসলিমের জন্য ইসলামের ঘর। কাজেই পাকিস্তান যদি না-থাকে, তা হলে জামায়াতকর্মীরা দুনিয়ায় বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতা পাবে না। তাই, জামায়াতের কর্মীরা জীবন বিপন্ন করে পাকিস্তানের অস্তিত্ব- ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।’ এই দুই মন্ত্রীকে দিলকুশা ইউনিয়ন শান্তি কমিটি সংবর্ধনা দিয়েছিল কার্জন হলে, ২৯ সেপ্টেম্বর। আজম সেখানে বলেছেন— ‘দুটি কারণে বাংলাদেশ কায়েম সম্ভব নয়
প্রথমত, যারা পূর্ব পাকিস্তানে এত আস্ফালন দেখাল, সেনাবাহিনীর প্রথম অ্যাকশনে তারা সামান্যমাত্র প্রতিরোধ গড়তে পারেনি; তাদের দ্বারা বাংলাদেশ কায়েম হবে, এমন কথা পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।’ দ্বিতীয় কারণ হিশেবে তিনি উল্লেখ করেন— ‘এটা কখনও সম্ভব না যে, ভারত তার সৈন্য দ্বারা যুদ্ধ করে একটি এলাকা দখল করার পর আবার শ্রী তাজউদ্দিনের হাতে ছেড়ে দিয়ে যাবে।’ ৩ অক্টোবর পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামির মজলিশে শুরার সম্মেলনে আজম বলেন— পাকিস্তান রক্ষার্থে আমাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। এটা আমাদের দ্বীনের দাবি। খোদা নাখাস্তা, আমাদের দেশকে রক্ষা করার কর্তব্য পালনে আমরা যদি ব্যর্থ হই, তা হলে আমরা আমাদের নিজেদের ও আমাদের আদর্শকেও রক্ষা করতে সক্ষম হব না।’
বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে জামায়াতে ইসলামির ১৬ অক্টোবরের জনসভায় গোলাম আজমের উক্তি ছিল— ‘বাঙালি মুসলমানদের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে পাকিস্তানের সংহতি অবশ্যই টিকিয়ে রাখতে হবে।’ ২০ অক্টোবরের সম্পাদকীয়তে দৈনিক সংগ্রাম উল্লেখ করে যে, গোলাম আজমের মতো নেতারাই জাতি গঠন করেন, জাতি তাদেরকে গড়ে না। ৩০ অক্টোবর বদরদিবস উপলক্ষে দেওয়া বিবৃতিতে আজম বলেন— ‘ইসলামের দুর্গ আজ ইসলামের দেশী-বিদেশী শত্রুদের হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে যথাযোগ্য মর্যাদাসহকারে এই গৌরবজনক দিনটি পালনের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে সবরকম কূটচক্রান্তের বিরুদ্ধে ইসলামি চেতনা জাগ্রত হবে।’ শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারবাহিনীকে উন্নতমানের ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র সজ্জিত করার আহ্বান জানিয়ে গোলাম আজম সাংবাদিকসম্মেলনে যে-বক্তব্য দেন, দৈনিক সংগ্রামে তা ছাপা হয় ২৪ নভেম্বর। ২৬ নভেম্বর লাহোরে জামায়াতের এক সংবর্ধনাসভায় আজম ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ থেকে ভারতের ওপর আক্রমণ করার জন্য। ২৭ নভেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে আইনজীবী সমিতির সমাবেশে গোলাম বলেন— ‘শত্রুর হামলার মোকাবেলায় আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা নয়, বরং শত্রুর দেশে পালটা-আক্রমণ চালানোই হচ্ছে সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা।’ একাত্তরে গোলাম আজম এও বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ নামক কিছু হলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে কখনও খবর পাওয়া যায়নি।
যা হোক, একাত্তরে গোলাম আজমের এই যে এত-এত তৎপরতা, তা যে কেবল ইসলাম বা পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য; ব্যাপারটি তা নয়। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ভারতে বা ১৯৪৭-এর পর অবিভক্ত পাকিস্তানে ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত কখনোই সুবিধা করতে পারেনি। অবিভক্ত পাকিস্তানে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়েছিল দুইবার, কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদির ফাঁসিও হয়েছিল। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াত একটা আসনও পায়নি, সেই নির্বাচনে ঢাকার সব আসনে জামায়াতের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ঐ নির্বাচনে আওয়ামি লিগ পেয়েছিল ৭৫.১১ শতাংশ ভোট, জামায়াত ৬.০৭ শতাংশ; জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল জামায়াতের ৭৮ শতাংশ প্রার্থীর। তাই, অতি-পাকিস্তানপ্রেমী সেজে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে গোলাম আজমের উদ্দেশ্য ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের স্থান দখল করা, অর্থাৎ অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। ১৯৭১-এর অক্টোবরে পাকিস্তান সরকার ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এ যে-উপনির্বাচন করেছিল, সুকৌশলে গোলাম আজম তাতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির তথ্যসম্পাদক মওলানা কাওসার নিয়াজি ৮ নভেম্বর সরাসরি অভিযোগ তুলেছিলেন যে, গোলাম আজমকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করার ষড়যন্ত্র চলছে। পিপলস পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মিয়া মামুদ কাসুরিও একই অভিযোগ করেছিলেন। আজম এই অভিযোগ প্রথমে অস্বীকার করলেও ১৩ নভেম্বরের দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা থেকে জানা যায় তিনি বিবৃতি দিয়েছেন— ‘দেশের সংহতি ও অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে কোনো একজন পূর্ব পাকিস্তানিকে অবশ্যই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদ প্রদান করতে হবে।’ বলাই বাহুল্য— এই ‘কোনো একজন পূর্ব পাকিস্তানি’ গোলাম আজম নিজেই।
বিবৃতিতে গোলাম আজম উল্লেখ করেন— ‘পূর্ব পাকিস্তানিদেরকে যে তাদের ন্যায়সংগত রাজনৈতিক অধিকার থেকে, বিশেষ করে আইয়ুব খানের সুদীর্ঘ দশ বছরের স্বেচ্ছাচারী শাসনামলে, বঞ্চিত করা হয়েছে; যার ফলে জাতি আজ বর্তমান মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন, আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানি ভাইদের তা জানা রয়েছে। তাই, ইনসাফের দাবি হচ্ছে প্রধান রাজনৈতিক পদ অবশ্যই একজন পূর্ব পাকিস্তানিকে প্রদান করতে হবে, যাতে করে অতীতের বঞ্চনার অনুভূতি এ-দেশের জনগণের মন থেকে ধীরে-ধীরে দূর হয়ে যেতে পারে।’ ক্ষমতার প্রশ্নে তিনি জুলফিকার আলী ভুট্টার সাথেও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। একই বিবৃতিতে ভুট্টো সম্পর্কে তিনি বলেন— ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিশ্চয়ই জনাব ভুট্টোকে পরবর্তী কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্ব করার আহ্বান জানাবেন না। কেননা, তিনি যদি তা-ই করেন; তা হলে শেখ মুজিবের স্থলে জনাব ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ মহল যে-ষড়যন্ত্র করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানি জনগণের মনে এই সন্দেহের সৃষ্টি হতে পারে।’ উল্লিখিত উক্তিগুলো পড়ে বুঝতে নিশ্চয়ই আর বাকি থাকে না যে, গোলাম আজম পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। ‘পূর্ব পাকিস্তান’ (বাংলাদেশ) যখন লক্ষ-লক্ষ মানুষের রক্তে রঞ্জিত, কোটি-কোটি শরণার্থীর হাহাকারে বিপর্যস্ত, লক্ষ-লক্ষ ধর্ষিত নারীর আর্তচিৎকারে বিধ্বস্ত; তখন সেই গণহত্যারই একজন রূপকার— গোলাম আজম— পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দরকষাকষিতে লিপ্ত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার চেয়ে গোলাম আজমের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সংকটকালীন সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়া। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার সক্ষমতা জামায়াতে ইসলামির কোনোকালেই ছিল না এবং নেই— বাংলাদেশেও না, ভারতেও না, এমনকি পাকিস্তানেও না। মজার ব্যাপার হচ্ছে— পাকিস্তানের ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি একটি আসনও পায়নি এবং এই কলঙ্ক মাথায় নিয়ে পাকিস্তান জামায়াতের আমির সিরাজুল হক পদত্যাগও করেছেন। বাক্যটা আবার পড়া যাক— পাকিস্তানের ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামি একটি আসনও পায়নি। ভারতের লোকসভায়ও জামায়াতের কোনো আসন নেই।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণে গোলাম আযম দুঃখ প্রকাশ করেছেন এভাবে— ‘উপমহাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম হিন্দু ও শিখ বাহিনীর নিকট প্রায় এক লাখ সশস্ত্রবাহিনী আত্মসমর্পণ করল। হাজার বছরের ইতিহাসে এত বড় ঘটনা কখনও ঘটেনি।’ মাসিক উর্দু ডাইজেস্ট-এর সম্পাদক আলতাফ হোসাইন কুরাইশিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ-কথা বলেন। গোলাম আজম বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা যে কেবল একাত্তরেই করেছেন; তা নয়, করেছেন একাত্তরের পরেও। ১৯৭২ সালেও পাকিস্তানে বসে তিনি ‘পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার সপ্তাহ’ পালন করেন। বাংলাদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজয়ে পাকিস্তানে তখন তীব্র গণঅসন্তোষ দেখা দেয় এবং গোলাম আজমের কার্যক্রমে সেখানে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। তখন জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির আবুল আলা মওদুদি ১৯৭২-এর নভেম্বরে হজপ্রতিনিধিদলের সাথে আজমকে সৌদি আরবে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু পিপলস পার্টির নেতা কাওসার নিয়াজি, মুসলিম লিগনেতা মিয়া মমতাজ দৌলতানা-সহ কয়েকজন পাকিস্তানি নেতা গোলাম আজমকে বিমান থেকে নামিয়ে এনে আটক করে রাখেন। মওদুদির হস্তক্ষেপে পরে গোলাম আজম (এবং মওলানা আবদুর রহিম) সৌদি আরব যেতে সক্ষম হন এবং সেখানে বসে তিনি গুজব প্রচার করেন বাংলাদেশে মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গোলাম আজমকে বিমান থেকে নামিয়ে এনে আটক করার তথ্যসূত্র ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ বই। আর তারিখ ধরে-ধরে গোলাম আজমের বিভিন্ন উক্তি নেওয়া হয়েছে ১৯৭১ সালের ‘দৈনিক সংগ্রাম’ পত্রিকা থেকে। ‘দৈনিক সংগ্রাম— মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা’ এই নামে ১৯৯২ সালে একটি সংকলন সম্পাদনা করেছেন সাংবাদিক আলী আকবর টাবী। এই সংকলনটি এই প্রবন্ধ লেখার কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছি। ‘জামায়াতে ইসলামি— উত্থান বিপর্যয় পুনরুত্থান’— সত্তরের নির্বাচনে ৭৮ শতাংশ জামায়াতপ্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার খবর নিয়েছি মহিউদ্দিন আহমদের এই বই থেকে।
১৯৭৩ সালের মার্চ পর্যন্ত তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলমানসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোয় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশকেন্দ্র’ থেকে প্রকাশিত ‘একাত্তরের ঘাতক জামায়াতে ইসলামির অতীত ও বর্তমান’ বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের সব রাজনৈতিক দলের কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে মতামত চান। এ-উপলক্ষে সে-দেশের জামায়াতের মজলিশে শুরার বৈঠক হয়। মাওলানা আবদুর রহিম ও চৌধুরী রহমতে এলাহি— এই দুজন নেতা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে মত দেন। কিন্তু বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্ম নেওয়া গোলাম আজম স্বীকৃতিদানের বিরোধিতা করেন। ১৯৭৩ সালের মার্চে লিবিয়ার বেনগাজিতে এক ইসলামি পররাষ্ট্রসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আমন্ত্রিত না-হয়েও গোলাম আজম সম্মেলনে উপস্থিত হন এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না-দেওয়ার জন্য মুসলমানসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে আহ্বান জানান।১৯৭৩ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিল করে। ঐ বছরের মাঝামাঝি তিনি পাকিস্তান থেকে লন্ডনে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটির কার্যালয় স্থাপন করেন। সেখানে ‘সোনার বাংলা’ নামে একটি পত্রিকাও চালু করেন, যাতে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালানো হতো।
১৯৭৩ সালের জুনে লন্ডনে বসে ‘বাঙালি মুসলমান কোন পথে’ শিরোনামে ষোলো পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা লেখেন গোলাম আজম। এর শেষভাগে তিনি লেখেন— ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভারতীয় বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণের ফলে বাংলাদেশ আপাতত জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে এসেছে বটে, কিন্তু এ কলঙ্ক কি বাঙালি মুসলমানের সামগ্রিক জীবনে কালিমা লাগায়নি? ইতিহাস তো এ কথা বলবে না যে, পাঞ্জাবি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। ইতিহাস জোর গলায় বলবে যে, এক লাখ মুসলিম সশস্ত্রবাহিনী হিন্দুদের সেনাপতির নিকট আত্মসমর্পণ করেছে।’।১৯৭৫ সালের মার্চে তিনি সৌদি আরব গিয়ে বাদশাহ্ ফয়সালের সঙ্গে দেখা করেন এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালান। সাক্ষাতে তিনি বলেন বাংলাদেশে ভারতীয় হিন্দুরা মসজিদ দখল করে মন্দির তৈরি করেছে, কোরআন পুড়িয়েছে এবং মুসলিমদের হত্যা করেছে। গোলাম আজম এ-ধরনের প্রচার চালিয়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না-দেওয়ার জন্য বাদশাহ্ ফয়সালকে মোট সাতবার অনুরোধ করেন, অনুরোধ করেন বাংলাদেশীদেরকে হজের অনুমতি না-দিতেও। এ ছাড়া পাকিস্তান একত্রিত করার কথা বলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তিনি তহবিলও গঠন করেছিলেন। ‘একাত্তরের ঘাতক জামায়াতে ইসলামির অতীত ও বর্তমান’ বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে পূর্ব লন্ডনের একটি বাড়িতে এক বৈঠকে গোলাম আজম বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতার নীলনকশা পেশ করেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশে ইসলামি বিপ্লবের ডাক দিয়ে প্রচারপত্র বিলি করতে হবে। এ ছাড়া ‘ডকুমেন্টেশন সেন্টার’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তিনি বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালান। এই অনুচ্ছেদ এবং আগের অনুচ্ছেদের কিছু তথ্য নিয়েছি ২০১৩ সালে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দেওয়া রায় থেকে।
গোলাম আজম বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৭৮ সালে। কীভাবে এসেছিলেন, এসে কীভাবে ষোলো বছর অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করেছেন; সেই গল্পে না-যাই। অতীতের বিভিন্ন প্রবন্ধে তা বর্ণনা করেছি। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামি বা গোলাম আজমের ন্যূনতম অনুশোচনা কোনোকালেই ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশেও আজম ও অন্য জামায়াত-নেতারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে অবিশ্বাস্য রকমের ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করেছেন। ১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান দলের পক্ষে প্রথম সাংবাদিকসম্মেলনে বলেন— ‘একাত্তরে দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য যা করেছি, ঠিকই করেছি— ভারতীয় আগ্রাসনের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য।’ ১৯৮১ সালের ২৯ মার্চও আব্বাস আরেক সাংবাদিকসম্মেলনে একই উক্তি করেন, এর সাথে যোগ করেন— ‘একাত্তরে বাংলাদেশের কনসেপ্ট ঠিক ছিল না।’ একই বছরের ১৭ এপ্রিল সাপ্তাহিক বিচিত্রাকে গোলাম আজম বলেছেন— ‘একাত্তরে যা ঠিক মনে করেছি, তা-ই করেছি। এখনও তা-ই করব।’ ১৯৭৭ সালের শেষদিকে জামায়াত দেশব্যাপী একটি জরিপ চালায়। জরিপের উদ্দেশ্য ছিল একাত্তরে তাদের কতজন কর্মী মারা গেছে, তা জানা। প্রতিবেদনের এক জায়গায় লেখা হয়— ‘আমাদের বীর সাথীরা জীবন দিয়েছে, তবুও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি।’ এখানে ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ শব্দটির পরে ব্রাকেটে লেখা হয় ‘জারজ সন্তান’। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরসংখ্যায় ছাত্রশিবিরের মুখপত্র ছাত্রসংবাদে লেখা হয়— ‘সে-সময়ের অনেক মুসলিম না-বুঝে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল, এটা তাদের ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা ছিল। আল্লাহ্তায়ালা তাদের ক্ষমা করুন।’
২০২৫-এর ১২ মে গোলাম আজমের ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আজমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন— ‘যারা ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলাদেশী অধ্যাপক গোলাম আজমকে রাজাকার বলে; তারা ভারতের দোসর, দালাল, গোলাম, পা-চাটা কীট। এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি ছিলেন উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। আমরা অভাগা, হতভাগা জাতি— উনার খেদমত নিতে পারিনি। অধ্যাপক গোলাম আজমের জানাজাই প্রমাণ করেছে যে, এ-দেশের মানুষ তাকে বাংলাদেশের মুকুটহীন রাজা বলে মনে করে। জনগণ কুচক্রী, কুলাঙ্গারদের যুগ-যুগের মিথ্যা প্রচারণা কানে নেয়নি। কুলাঙ্গারদের জনকের মৃত্যুতে দেশের মানুষ আওয়াজ করে ইন্নালিল্লাহ্ও পড়েনি, চোখের পানি ফেলেনি; জানাজায় ছিল সতেরো-আঠারোজন। অধ্যাপক গোলাম আজমের জানাজা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা, সারা দুনিয়ায় হয়েছে প্রায় চার হাজার জানাজা, কেবল কাবায়ই হয়েছে প্রায় শ-খানেক; লক্ষ লোক পিতা হারানোর মতো কান্না করেছে। এত বড় জানাজার দ্বারা জনগণ কুচক্রীদের গালে জুতা মেরেছে; বেহায়াদের লজ্জা শরম নাই। তাই ঘেউঘেউ করছেই।’
গোলাম আজম রাজাকার ছিলেন কি না, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আর কোনো প্রয়োজন নিশ্চয়ই নেই। এই লেখায় এতক্ষণ ধরে এই প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়া হয়ে গেছে। উত্তর দিয়েছেন গোলাম আজম নিজেই, উত্তর দিয়েছে ১৯৭১-এর দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা। গোলাম আজমকে রাজাকার-বলা ব্যক্তিদেরকে আজমি যে-ভাষার আক্রমণ করেছেন, একাত্তরে আজমির বাবাও মুক্তিযোদ্ধাদেরকে একই ভাষায় আক্রমণ করেছেন— কখনও ভারতের দোসর বা দালাল, কখনও ভারতীয় গুপ্তচর বা অনুপ্রবেশকারী, কখনও দুষ্কৃতকারী বা সন্ত্রাসী বলেছেন। বংশপরম্পরা বদলায়নি। পিতা যেমন ছিলেন, পুত্র তেমনই হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামি যেমন ছিল, তেমনই আছে। একই রকম আছে দৈনিক সংগ্রামও। কেউ পালটায়নি একচুল। আজম নিজেই বলেছিলেন— ‘জামায়াতকর্মীরা শহিদ হতে পারে, কিন্তু পরিবর্তিত হতে পারে না।’ এখানে আরেকটি ব্যাপার উল্লেখযোগ্য, তা হলো গোলাম আজমের নামের আগে ‘অধ্যাপক’ শব্দের ব্যবহার। জামায়াতে ইসলামির ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়— ‘১৯৫০ সালের ৩ ডিসেম্বর গোলাম আজম রংপুর কারমাইকেল কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৫৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে রংপুর কারমাইকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন।’ শিক্ষক হিশেবে তার কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য ছিল চার বছরের সামান্য বেশি। চার বছরে কোনো প্রভাষক অধ্যাপক হয়ে যায় না, প্রভাষকই থাকে। অর্থাৎ গোলাম আজম অধ্যাপক নন, প্রভাষক। ‘অধ্যাপক গোলাম আজম’ লেখা যাবে না, লিখতে হবে ‘প্রভাষক গোলাম আজম’।
গোলাম আজমের ভাষাসৈনিক-সত্তা প্রশ্নবিদ্ধ, অধ্যাপক-সত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। ’৫২-এর ভাষা-আন্দোলনে যতটুকু ভূমিকা তার ছিল, ’৭০-এ তা তিনি নিজেই অস্বীকার বা ত্যাজ্য করেছেন। কোনো কৃতিত্ব একবার ত্যাজ্য করে পরে আবার ফিরিয়ে আনা যায় না। তবে, প্রশ্নাতীত তার স্বাধীনতাবিরোধিতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা তিনি কেবল রাজনৈতিকভাবেই করেননি, ধর্মীয়ভাবেও করেছেন, সশস্ত্রভাবেও করেছেন। তার দলের গঠিত সশস্ত্রবাহিনীগুলো মুক্তিযোদ্ধানিধনে ক্ষেত্রবিশেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চেয়েও বেশি নৃশংস ভূমিকা পালন করেছে, সেই তথ্য তার দলের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামেই সোনার হরফে লিপিবদ্ধ আছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে তিনি নিজেই বুদ্ধি দিয়েছেন কীভাবে অল্প পরিশ্রমে বেশি বাঙালি নিধন করা যাবে, রাজাকারবাহিনীকে আরো বেশি অস্ত্রশস্ত্র দেওয়ার জন্য তিনি তদবির করেছেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এ-মাথা থেকে ও-মাথা তিনি চষে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি-আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে, যুদ্ধের ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে তিনি নিজেই চেয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। একাত্তরে গোলাম আজমের কোনো অভিলাষই যখন পূরণ হয়নি, তখন তিনি একাত্তরের পরেও বিশ্বব্যাপী দৌড়ঝাঁপ করেছেন বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিশেবে স্বীকৃতি না-দেওয়ার তদবির করার জন্য এবং যেকোনো মূল্যে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর জন্য।
অর্থাৎ ২০২৫-এর ১০ মে জামায়াতে ইসলামি শাহবাগে যে স্লোগান দিয়েছে— ‘গোলাম আজমের বাংলায় আওয়ামি লিগের ঠাঁই নাই’, কোনো মাপকাঠিতেই তা ইতিহাসের ধোপে টেকে না। ‘বাংলা’ যদি ভাষার নাম হয়; তা হলেও বাংলা গোলাম আজমের না, গোলাম আজম বাংলার না। গোলাম আজম উর্দুর, উর্দু গোলাম আজমের। ‘বাংলা’ যদি দেশের নাম হয়; বাংলা তা হলেও গোলাম আজমের না, গোলাম আজম বাংলার না। গোলাম আজম লাহোরের, গোলাম আজম করাচির, গোলাম আজম রাওয়ালপিন্ডির। অবশ্য একাত্তরের পর এসব শহরেও তার ঠাঁই হয়নি, বাধ্য হয়ে মওদুদি তাকে উঠিয়ে দিয়েছিলেন সৌদি আরবগামী বিমানে। সেখান থেকে বহু দেশ ঘুরে শেখ মুজিবুর রহমানের অপমৃত্যুর পর বাংলাদেশে এসে ষোলো বছর বসবাস করেছেন অবৈধভাবে, মৃত্যুবরণ করেছেন নব্বই বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে-করতেই। গোলাম আজম জেদ্দা থেকে লন্ডন গিয়েছিলেন ১৯৭৩-এর ২১ এপ্রিল। ভিজিট ভিসা নিয়ে সেখানে তিনি পাঁচ বছর কাটিয়ে এর পর বাংলাদেশে এসেছিলেন। যে-পাকিস্তানের জন্য গোলাম আজম এতকিছু করেছিলেন, তার জায়গা হয়নি সেখানেও; পাকিস্তানে তিনি থাকতে পেরেছিলেন মোটে এক বছর— নভেম্বর ১৯৭১ থেকে নভেম্বর ১৯৭২। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়ে যাওয়ার পর আজমকে কখনও থাকতে হয়েছে সৌদি আরবে, কখনও ব্রিটেনে— উদ্বাস্তুর মতো। কবি আবুল হাসান লিখেছিলেন— ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না।’ মৃত্যু গোলাম আজমকে নিয়েছে; বাংলাদেশ নেয়নি, নেয়নি পাকিস্তানও। পাকিস্তান গোলাম আজমকে হজ করতে পাঠিয়ে দিয়ে আর ফিরিয়ে আনেনি।
১৯৭৯ থেকে ১৯৯১ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন আব্বাস আলী খান। প্রকৃত আমির ছিলেন গোলাম আজম, তবে গোপনে। স্বাধীন বাংলাদেশ গোলাম আজমকে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান হিশেবে নেবে না; তা তিনি নিজেও জানতেন, জামায়াতও জানত। তাই, তিনি গোপনে আমির থেকে আব্বাস আলী খানকে বানিয়ে রেখেছিলেন ভারপ্রাপ্ত আমির। পরিস্থিতি অনুকূল দেখে জামায়াত ১৯৯১ সালের ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আজমকে প্রকাশ্যে আমির ঘোষণা করে এবং সেটিই জামায়াতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর পরপরই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-আন্দোলন আবার দুর্বার গতিতে দানা বেঁধে ওঠে, গঠিত হয় ‘একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’, শহিদজননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ সোহ্রাওয়ার্দি উদ্যানে ঐতিহাসিক গণআদালত গোলাম আজমকে দেয় প্রতীকী ফাঁসি। জামায়াত গোলাম আজমকে আমির ঘোষণার মতো অত্যুৎসাহ না-দেখালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-আন্দোলন নতুন করে দানা বেঁধে উঠত না, হয়তো বেঁচে যেতেন গোলাম আজম ও তার বন্ধুরা। জামায়াতনেতা আবদুল কাদের মোল্লা ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধমামলায় চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড পেয়ে আঙুল ক্রস করে বিজয়চিহ্ন দেখিয়েছিলেন। একাত্তরে তিনি যে-অপরাধ করেছেন, তাতে ফাঁসির আদেশ না-হওয়াটাই তার জন্য এক ধরনের বিজয়। কাদের মোল্লা সেই বিজয় উদ্যাপন করতে গিয়ে আঙুল ক্রস করার ফলে শাহবাগে গণজাগরণ হয়েছিল, তাতে জামায়াতনেতাদের কপাল নতুন করে আবার পুড়েছিল। তিনি আঙুল ক্রস না-করলে শাহবাগ সৃষ্টি হতো না।
২০২৫ সালের ১০ মে জামায়াত যদি আওয়ামি লিগকে নিষিদ্ধ করেই মিষ্টি খেয়ে শাহবাগ থেকে বাড়ি ফিরে যেত, জামায়াতের জন্য সেটিই মঙ্গলজনক ও লাভজনক হতো। কিন্তু জামায়াত ১৯৯১ ও ২০১৩-এর মতো আবারও অত্যুৎসাহী হয়ে পড়েছে, অন্তরে পুষে রাখা শান্তি কমিটিকে আটকাতে না-পেরে বলে ফেলেছে— ‘গোলাম আজমের বাংলায় আওয়ামি লিগের ঠাঁই নাই’, ‘আজকের এই দিনে, নিজামী, তোমায় পড়ে মনে’, ‘আজকের এই দিনে, সাঈদী, তোমায় পড়ে মনে’। ২০২৪-এর আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত নতুন করে যতটুকু প্রাসঙ্গিক হয়েছিল, এই স্লোগান জামায়াতকে আবার চুয়ান্ন বছর পিছিয়ে দিয়ে সেই একাত্তরে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল। আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত যখনই কিছু করতে বা বলতে যাবে, এই স্লোগানগুলো তাদেরকে আটকে দেবে। এইসব স্লোগানের পর জামায়াতনেতাদের যুদ্ধাপরাধ নিয়ে যত আলোচনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে হয়েছে, তা অতীতে হয়নি। যে-প্রজন্ম জামায়াতের প্রতি প্রেম অনুভব করা শুরু করেছিল, এইসব স্লোগানের কারণেই তারা জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে নতুন করে জানতে পারল এবং এমনকি এই সুদীর্ঘ লেখাটির জন্ম হলো। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— জামায়াতের কবর বারবার জামায়াতই রচনা করে। আবার যদি কখনও গণআদালত বা গণজাগরণ হয়, তা জামায়াতের এইসব স্লোগানের কারণেই হবে।
Post Views: 177
Related