বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতাল মঙ্গলবার ৩০ ডিসেম্বর পরিণত হয় এক গভীর জাতীয় শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আর নেই। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো দেশ। গত ২৩ নভেম্বর রাত থেকে তিনি ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
হাসপাতালের ফটকের সামনে সমর্থক, দলীয় নেতা ও সাধারণ মানুষের নীরব উপস্থিতি ছিল শোকের সবচেয়ে দৃশ্যমান চিত্র। কারও চোখে পানি, কেউ প্রার্থনায় মগ্ন। বিএনপি কর্মী রিয়াদুল ইসলাম বলেন, খবর শোনার পর ঘরে বসে থাকা সম্ভব হয়নি। তাকে দেখার সুযোগ নেই জেনেও সবাই বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। চারপাশে শুধু কান্না আর নিস্তব্ধতা।
এরপর বুধবার ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত হয় খালেদা জিয়ার জানাজা। সেখানে সারা দেশ থেকে বিএনপির লাখো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জড়ো হন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, খালেদা জিয়ার প্রভাব কেবল দলীয় বা জাতীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না।
তবে শোকের আবহের বাইরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই মৃত্যু বিএনপির জন্য এক সংকটময় সময়ের ইঙ্গিত বহন করছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত। দীর্ঘদিন অসুস্থতা ও রাজনীতির সম্মুখসারিতে অনুপস্থিত থাকলেও খালেদা জিয়া ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক ও শেষ আশ্রয়স্থল। সেই নেত্রীকে ছাড়াই এখন নির্বাচনি লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে দলটিকে।
তার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বিএনপি পুরোপুরি প্রবেশ করল খালেদা জিয়া-উত্তর অধ্যায়ে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান, এরপর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়া এবং দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলের সব দায়িত্ব ও প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন তারেক রহমান। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে এখন তিনিই নেতৃত্বের মুখ।
কয়েক দশক ধরে খালেদা জিয়ার গুরুত্ব আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনীতির সামনের সারিতে না থেকেও তিনি ছিলেন দলের নৈতিক ভারকেন্দ্র। তার উপস্থিতি দলের ভেতরের বিভাজনকে দমিয়ে রেখেছিল, নেতৃত্বের প্রশ্নে রেখেছিল এক ধরনের স্থিতি।
তারেক রহমানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন আল জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারিয়েছে। তার ভাষায়, খালেদা জিয়া ছিলেন সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের এক ঐক্যবদ্ধ প্রতীক। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তার নীতি ও সুশাসনের অগ্রাধিকারই বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে দল।
মাহদী আমিন বলেন, শক্তিশালী সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাই ছিল খালেদা জিয়ার রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি দাবি করেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে যেসব প্রতিষ্ঠান ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিএনপি সেগুলো পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে। তারেক রহমান ইতোমধ্যে একজন ঐক্যবদ্ধ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন বলেও তিনি মনে করেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভেতরের সেই প্রতীকী স্থিতি আর নেই। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কারিশমা দলকে দীর্ঘদিন ঐক্যবদ্ধ রেখেছিল। তার মতে, সেই ছন্দে এখন ব্যাঘাত ঘটবে এবং তারেক রহমানকে নেতৃত্ব প্রমাণ করতে হবে একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এই নেতৃত্ব এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, খালেদা জিয়াও একসময় অপরীক্ষিত ছিলেন। আশির দশকে সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন। তার স্বামী জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। মহিউদ্দিন আহমদের মতে, আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তারেক রহমানের জন্যও তেমনি ভাগ্যনির্ধারক হতে পারে। সাফল্য তাকে বৈধতা দেবে, ব্যর্থতা প্রশ্ন তুলবে তার নেতৃত্ব নিয়ে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিএনপির জন্য আগের মতো সহজ নয়। দীর্ঘ তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতর সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করায় সেই পুরোনো কাঠামো ভেঙে গেছে। বিএনপিকে এখন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামি জোট এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো নতুন শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে।
মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে। পুরোনো আধিপত্য আর নেই। নির্বাচন সময়মতো হবে কি না, শান্তিপূর্ণ হবে কি না এবং বড় দলগুলো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না-এসব প্রশ্নও রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া শুধু দলের নন, দেশেরও একজন অভিভাবক ছিলেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন জ্যেষ্ঠ ও স্থিতিশীল ব্যক্তিত্বের শূন্যতা তৈরি করল। তবে তিনি মনে করেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলের ভেতরের বিভক্তির আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়েছে।
বিএনপি নেতারাও স্বীকার করছেন, কেবল উত্তরাধিকার দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। তৃণমূল পর্যায়ে শৃঙ্খলা, সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে ভূমিকা রাখাই হবে তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এই শোক, স্মৃতি আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই বিএনপি এগোচ্ছে এক নতুন অধ্যায়ের দিকে। খালেদা জিয়ার ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে দলটি আদৌ নতুন বাস্তবতায় নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে কি না, তার উত্তর দেবে আসন্ন সময়ই।







