প্রেস বিজ্ঞপ্তি
ঢাকা, মার্চ ০৭, ২০২৬ (শনিবার)ঃ
কিডনি রোগ বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে। বাংলােেশও এই রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে উর্ধ্বমুখী। কিডনি রোগের কারণে শুধু ব্যক্তিগত জীবনই বিপর্যস্ত হয় না বরং এই রোগ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপরও বিশাল অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে। কিডনি রোগের মারাত্মক পরিণতি, অতিরিক্ত চিকিৎসা খরচ এবং চিকিৎসা ব্যয় সাধ্যাতীত হওয়ায় সিংহভাগ রোগী প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর করুন চিত্র তুলে ধরেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্যাম্পস আয়োজিত “জলবায়ু পরিবর্তন ও কিডনি রোগঃ ঝুঁকি ও করণীয়” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আলোচকবৃন্দ।
বক্তারা এ পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারি/ বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিংবা প্রতিষ্ঠান গুলোর সমন্বিত ও পরিকল্পিত প্রয়াসের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।
‘‘বিশ্ব কিডনি দিবস-২০২৬’’ উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে দেশের শীর্ষস্থানীয় কিডনি বিষয়ক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং এন্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস), ০৭ মার্চ (শনিবার) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাম্পস এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ এম এ সামাদ। তিনি তার মূল প্রবন্ধে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) এর তথ্য অনুযায়ী, কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণ গুলোর মধ্যে একটি। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে কিডনি রোগের প্রকোপ বাড়ছে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্থ’ূলতার মতো অসংক্রামক রোগের কারণে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ শুধু দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এই সংখ্যা ডায়াবেটিস রোগীদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীদের চেয়ে প্রায় বিশ গুণ। মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগ ১৯৯০ সালে ছিল ১৯তম স্থানে, বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৭ম স্থানে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৪০ সালে দখল করে নেবে ৫ম স্থান। আবার উন্নয়নশীল বা স্বল্পোন্নত দেশে কিডনি রোগের হার সবচেয়ে বেশি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগ দ্রুত মহামারির দিকে এগুচ্ছে, যার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন একটি নতুন ভয়াবহ হুমকি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, সংক্রমণ, ভেজাল খাদ্য, কীটনাশকের সঙ্গে তাপপ্রবাহ, লবণাক্ততা, বিশুদ্ধ পানির সংকট কিডনি রোগকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
অধ্যাপক ডাঃ এম এ সামাদ বলেন, বাংলাশেও কিডনি রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক। তথ্য মতে, প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কিডনি রোগী ডায়ালাইসিসের উপর নির্ভরশীল হয়। শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানভাবে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আরো ২৪ থেকে ৩০ হাজার রোগী হঠাৎ কিডনি বিকল হয়ে সাময়িক ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়। এই রোগ আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা। পক্ষান্তরে, সবাই যদি কিডনি রোগের ব্যাপকতা, ভয়াবহতা, পরিণতি ও কারণ সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং স্বাস্থ্য সম্মত জীবনযাপন করে তা হলে ৬০-৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এই মরণঘাতী কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব।
কিডনি রোগের সাধারণ কারণ গুলো হল- অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থ’ূলতা, নেফ্রাইটিস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যাথানাশক ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত ও বংশগত কিডনি রোগ, মূত্রতন্ত্রের প্রদাহ ও পাথুরে রোগী। আমরা একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবো যে, প্রায় সবগুলো কারণই আমাদের অস্বাস্থ্যকর জীবন ধারার সাথে জড়িত, একটু সচেতন হলে প্রতিরোধ যোগ্য। তাছাড়া যারা ঝুঁকিতে আছেন যেমন যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ওজন বেশী, বংশে কিডনি রোগ আছে, যারা ধূমপায়ী, যারা তীব্র মাত্রার ব্যাথার ঔষধ খেয়েছেন, যাদের পর্বে কোন কিডনি রোগের ঝুঁকি আছে তাদের বছরে অন্তত ২ বার প্রস্রাব ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে নেয়া উচিৎ। কেননা প্রাথমিক অবস্থায় কিডনি রোগ সনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৪-২২% কোনো না কোনো পর্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে (ঈকউ) আক্রান্ত। এখানে উল্লেখ্য যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে, যেখানে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.২ক্ক সেলসিয়াস বেড়েছে, সেখানে বাংলাদেশে গ্রীষ্ম দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং তাপপ্রবাহ বাড়ছে।
২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১.৫-২ক্ক এবং ২১০০ সালে ৩-৪ক্ক বাড়তে পারে। এর ফলেঃ তাপজনিত পানিশূন্যতা ও আকস্মিক কিডনি বিকল (অকও) কৃষক-শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে। উপকূলীয় লবণাক্ততা ও ভারী ধাতু দূষণ কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বন্যায় সংক্রমণ ও অ্যান্টিবায়োটিকের অত্যধিক ব্যবহার অকও ঘটাচ্ছে। দুর্যোগে ডায়ালাইসিস ব্যাহত হচ্ছে। এটি দ্বিমুখীঃ কিডনি চিকিৎসা (ডায়ালাইসিসে বিপুল পানি-বিদ্যুৎ) জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে।
এক রোগীর ডায়ালাইসিসে ২৪০ কিঃ মিঃ গাড়ি চালানোর সমান কার্বন নির্গমন হয়। এমতাবস্থায়, আমারে করনীয় হল- ব্যক্তিগত পর্যায়েঃ পর্যাপ্ত নিরাপদ পানি, গরমে ভারী কাজ এড়ানো, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা। সামাজিক পর্যায়েঃ নিরাপদ পানি সরবরাহ, কৃষকদের ছায়া-বিশ্রাম, বৃক্ষরোপণ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েঃ জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রাথমিক স্ক্রিনিং, পরিবেশবান্ধব ঈঅচউ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রচলন। অর্থাৎ অতিরিক্ত গরমে রেস্ট-সেড-হাইড্রেড এই তিনটি শব্দের উপর গুরুত্ব দেয়া উচিত ।
ডাঃ এম এ সামাদ বলেন, কিডনি বিকলের চিকিৎসা সর্বাধিক ব্যয়বহুল। ফলে চিকিৎসা করতে গিয়ে পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। তাই ক্যাম্পস এর স্লোগান ‘‘কিডনি রোগ জীবননাশা-প্রতিরোধই বাঁচার আশা’’ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চাই। অর্থাৎ কিডনি রোগ প্রাথমিক অবস্থায় সনাক্ত করে চিকিৎসার মাধ্যমে মরণব্যাধি কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা।
বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন এর সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ হারুন-উর-রশিদ বলেন, ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপের হার কমাতে না পারলে কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হবে। অসছেতনতাই মূল কারন, আমরা জানি কিন্তু মানি না, ঝুঁকি জেনেও কেউ টেস্ট করাতে যাই না অথচ প্রথম এবং দিত্বিয় ধাপে ধরা পরলে কিডনি রোগ নিরাময় করা সম্ভব যা ৩য় বা পরের ধাপে গেলে একেবারেই সুস্থ করা যায়ে না। তিনি আরো বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক গুলেতে কিডনি টেস্ট এবং রেফারাল সিস্টেম চালু করতে পারলে ভাল ফল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ রেনাল এসোসিয়েশন এর সভাপতি অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, কিডনি রোগীর সংখ্যা এখন প্রায় ৪ কোটি, প্রধানত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এর কারনে তা দ্রুত বাড়ছে এবং ডায়ালাইসিস এর সুযোগ ৬৫ শতাংশ ই ঢাকাতে কেন্দ্রিভূত। তিনি বলেন, সরকার দ্রুত ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায় ডায়ালাইসিস এর সুযোগ সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস খুব ব্যায়বহুল কারন তার ফ্লুয়িড আমদানি করতে হয় তবে ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমাতে পারলে সুবিধা হয়, এতে ডায়ালাইসিস এর সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
বাংলাশে ক্রিকেট বোর্ড এর প্রধান নির্বাচক ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেন ক্যাম্পস এর গৃহীত কর্মসূচী গুলো থেকে সাধারন মানুষ খুব উপকৃত হয়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিসেবে ক্যাম্পস এর পক্ষে দুই দশকের বেশী সময় ধরে নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে সব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন, তাই সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা সমূহ ক্যাম্পস এর উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে এবং চলমান রাখতে সহযোগীতার হাত বাডিয়ে দেয়া উচিত।
তিনি বলেন একটি পরিবারের একজন সদস্য কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে পুরো পরিবার আর্থিক ভাবে বিপর্যস্থ হয়ে যায়। সব কিছুর উর্ধ্বে সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধ কে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, মানুষকে এমন ভাবে বোঝাতে হবে যে, যে কোন মূল্যে এ রোগ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে অন্যথায় বিপদের আর ভোগানতির শেষ থাকবে না।
এ ছাড়াও জোবায়দা বেগম, সচিব, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাশে সরকার। জনাব হাসান হাফিজ, কবি ও সম্পাদক, দৈনিক কালের কন্ঠ। অধ্যাপক ডাঃ সৈয়দ জাকির হোসেন, লাইন ডাইরেক্টর, নন কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অধ্যাপক ডাঃ আফরোজা বেগম, সভাপতি, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ। খোন্দকার মোস্তান হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। মিজানুর রহমান পিন্টু, ডাইরেক্টর, বিজিএমইএ। আলমগীর কবির, জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও উদ্ভিদ বিষয়ক লেখক গবেষক, বাংলা একাডেমি। ড.মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম, পরিবেশবিদ এ গোলটেবিল বৈঠকে আলোচনায় অংশ নেন।
ক্যাম্পস এর নির্বাহী পরিচালক রেজওয়ান সালেহীন বলেন, ক্যাম্পস কিডনি রোগ প্রতিরোধের জন্য নিয়মিত সচেতনতার বাণী প্রচার করে যাচ্ছে। আমরা যদি কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলি তা হলে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে যদি সকলে এগিয়ে আসেন তা হলে এই রোগ নিরাময় করা অনেকটাই সহজ হবে।
বক্তারা অভিমত ব্যাক্ত করেন যে, চিকিৎসা করে নয় বরং প্রতিরোধ করেই এ রোগের প্রাদূর্ভাব প্রশমন করতে হবে আর এ জন্য সচেতনতাই একমাত্র উপায়। কিডনি রোগ প্রতিরোধে গণসচেতনতা বৃদ্ধি করতে ক্যাম্পস এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং বিত্তবানদের এমন মহৎ কাজে সহযোগীতার আহবান জানান।
এ ছাড়াও গোলটেবিল বৈঠকে দেশের সরকারি পর্যায়ের নীতি নির্ধারক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, ক্রীড়াবিদসহ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।







