নিবন্ধ
ভূমিকা
বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগে নিবন্ধন পরীক্ষা (NTRCA) একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ন্যায়নির্ভর পদ্ধতির প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষ করে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রায় আঠারো লাখের বেশি প্রার্থী অংশ নেন; প্রিলিমিনারি ও লিখিত ধাপ অতিক্রম করার পর অনেকে ভাইভা পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দেন। অথচ, সর্বশেষ এই ধাপে এসে বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী “Not Qualified” হয়ে পড়েন—যা নতুন করে স্বচ্ছতা, মানদণ্ড ও বিচারিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ভাইভা ও ফেল—যেখানে প্রশ্ন শুরু হয়
ভাইভা পরীক্ষার মোট নম্বর ২০—এর মধ্যে ১২ নম্বর আসে একাডেমিক রেজাল্ট থেকে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হয়। বাকি ৮ নম্বর নির্ধারিত হয় বোর্ডের মুখোমুখি মূল্যায়ন দ্বারা। কিন্তু এখানেই সমস্যা:
কোনো প্রকার স্কোরশিট প্রকাশ হয় না।
ই-সনদে ভাইভার নম্বর অনুপস্থিত।
বোর্ডের মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ জানানো হয় না।
প্রার্থী প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলেও ফেল করানো হয়—কারণ অজানা।
ফলে পরীক্ষার্থীর মনে প্রশ্ন জাগে: “যদি উত্তর সঠিক হয়, কাগজপত্র ঠিক থাকে, তবুও ফেল করানো হয়—তবে কি এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?”
পরিসংখ্যান বলছে যে কিছু অস্বাভাবিক
১৮তম নিবন্ধনে:
লিখিত পরীক্ষায় পাস করেছিলেন প্রায় ৮৩,৮৬৫ জন।
ভাইভায় অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৮১,০০০ জন।
চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬০,৫২১ জন।
অর্থাৎ প্রায় ২১ হাজার পরীক্ষার্থী ভাইভা বোর্ডে গিয়ে ফেল করেছেন।
আগের ব্যাচগুলোতে যেখানে পাস হার ছিল ৯৫%-এরও বেশি, সেখানে হঠাৎ এমন বিশাল ফেইল হার বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠে না। তদ্ব্যতীত, বিষয়ভেদে পাসের হার মারাত্মক রকমের বৈষম্যমূলক—কোথাও ৯৫%, কোথাও ৪৫%—যা স্পষ্টতই প্রশ্নবিদ্ধ।
স্বচ্ছতার অভাব ও প্রশাসনিক দায়
এনটিআরসিএ পক্ষ থেকে বলা হয়েছে—“নিয়ম অনুযায়ী ফেল করানো হয়েছে।” কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, স্কোরিং রুব্রিক বা ফিডব্যাকের অনুপস্থিতিতে এটি দায় এড়ানোর চেষ্টা বলেই মনে হয়। যারা মৌখিক পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলেন, তারা জানান যে তারা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেছেন, কোনো দাপ্তরিক ত্রুটি ছিল না—তবু ফেল!
এর অর্থ দাঁড়ায়—
স্কোরিং পদ্ধতি হয় পক্ষপাতদুষ্ট, নয়তো অত্যন্ত অব্যবস্থাপনায় ভরা।
বোর্ডভিত্তিক নম্বর ব্যবধান ‘রেন্ডম’ এবং পক্ষপাতের সুযোগ সৃষ্টি করে।
যেকোনো পরীক্ষার্থী, যিনি সর্বোচ্চ প্রস্তুত ছিলেন, তাকেও ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব এই প্রক্রিয়ায়।
প্রতিকার কী হতে পারে?
১. RTI (তথ্য অধিকার) আইন অনুযায়ী স্কোর ও মন্তব্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
২. ভাইভা বোর্ডের ভিডিও রেকর্ড রাখা—ভবিষ্যতে স্বচ্ছতা যাচাইয়ের জন্য।
৩. বোর্ডভিত্তিক পাস-ফেইল বিশ্লেষণ ও পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশ।
৪. যৌথ স্মারকলিপি ও আইনি রিট—যেখানে অনিয়মের প্রমাণসহ উচ্চ আদালতে বিচার দাবি করা যায়।
৫. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও এনটিআরসিএর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
উপসংহার
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি যদি হয় যোগ্যতা, তাহলে এই ধরনের অনিয়ম, অস্পষ্টতা ও অজুহাত-ভিত্তিক ফেল প্রক্রিয়া সেই ভিত্তিকে চরমভাবে আঘাত করে। শিক্ষকরা শুধু পাঠদানকারী নন—তাঁরা ন্যায় ও নৈতিকতার ধারক। তাঁদের নিয়োগ প্রক্রিয়াও তাই হওয়া উচিত স্বচ্ছ, ব্যাখ্যাযোগ্য ও সম্মানজনক।
ভাইভা নামের এই “অদৃশ্য রুলার”-এর ছায়া থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে এখন প্রয়োজন সচেতন নাগরিকের প্রতিবাদ, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং আদালতের হস্তক্ষেপ।
একজন পরীক্ষার্থী যখন প্রশ্ন তোলে, তখন তা কেবল তাঁর নিজের জন্য নয়—তা ভবিষ্যৎ শিক্ষকের অধিকার, সমাজের ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের বিবেকের জন্য।
দুপচাঁচিয়া,বগুড়া।
https://www.facebook.com/








