গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার হেলিকপ্টার ভারতে নামার পর থেকেই শুরু হয়েছে এক রহস্যময় অন্তর্ধানের গল্প। এরপর সাড়ে সাত মাস কেটে গেলেও গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আর কেউ দেখেনি—না কোনো প্রতিবেশী, না সংবাদমাধ্যম। ভারত সরকার দাবি করছে, তারা ঘনিষ্ঠ মিত্র হাসিনাকে ‘আশ্রয়’ দিয়েছে। কিন্তু আশ্রয়প্রাপ্ত একজন নেত্রীর এত দীর্ঘ নীরবতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন। ফলে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে।
ক্ষমতা হারানোর আগে শেখ হাসিনা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তিনি সাংবাদিকদের সামনে অনর্গল কথা বলতেন, সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতেন, বিবৃতি দিতেন, এমনকি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে অনুগত সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডাও দিতেন। কিন্তু ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই, নতুন ছবি নেই, ভিডিও নেই, তাঁর স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতিও প্রকাশিত হয়নি। নিজের দলের নেতাদের সঙ্গেও তিনি ভিডিও কলে কথা বলছেন না। বর্তমানে তাঁর অস্তিত্ব কেবল কিছু অডিও ফোনকলে সীমাবদ্ধ।
দিল্লির গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিশিনাথম কাবাডিয়া জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় পালিয়ে আসা হাসিনাকে দিল্লির একটি বিশেষ গেস্টহাউসে ‘গুরুত্বপূর্ণ অতিথি’র মর্যাদায় রাখা হয়েছে।’ তবে গেস্টহাউস ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা অজিত নাইডু বলছেন, এই ‘গুরুত্বপূর্ণ অতিথির’ জীবন আসলে বন্দিদশার মতোই। বরাদ্ধ করা গেস্ট হাউজে ইন্টারনেট সংযোগ নেই, স্মার্টফোন নেই বা টেলিভিশন দেখার সুযোগও সীমিত।
অজিত আরও জানান, এই গেস্টহাউসে থাকা অতিথিকে তাঁর স্বজন ও অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মাসে মাত্র দু’বার একটি পুরোনো নকিয়া ১১০০ ফোন দেওয়া হয়। এসব সেটে পুরোনো ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়, যেন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বেশি কথা বলা না যায়।
এতদিন ধরে শেখ হাসিনার নামে যে অডিও কল শোনানো হচ্ছে, তা নিয়েও বিতর্ক দানা বাঁধছে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও অডিও বিশেষজ্ঞ লক্ষ্মীকান্ত খুরানার দাবি, এসব অডিও কলে কৃত্রিমতার ছাপ স্পষ্ট। এটি হয়তো এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি, নয়তো কোনো মিমিক্রি শিল্পীর কাজ। আওয়ামী লীগের ‘লাইভ’ সম্প্রচারে পুরনো ছবির সঙ্গে অডিও বাজানো দেখে সন্দেহ আরও বাড়ছে। সাংবাদিক মহলে প্রশ্ন উঠছে—একটা সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার কেন সম্ভব হচ্ছে না?
ভারত সরকার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি। তবে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে, হাসিনাকে ‘নিয়ন্ত্রিত অতিথি’ হিসেবে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। প্রবীণ কূটনীতিক ও রাজনীতিক দেবেন্দ্র মেহতা মনে করেন, “হাসিনা যদি প্রকাশ্যে কথা বলেন, তবে ভারতের ‘গণতান্ত্রিক মুখোশ’ খুলে পড়তে পারে। তাই তাঁকে বাটন ফোনে বন্দি রাখা হয়েছে।”
মোদি সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, হাসিনা একাধিকবার তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করেছেন। জানুয়ারি মাসে তিনি চার দিন অনশনও পালন করেছেন। তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হলেও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি।
পরবর্তীতে হাসিনা এ বিষয়ে মোদির দৃষ্টি আকর্ষণ করলে, মোদি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “আপনি এখানেই নিরাপদ, ওখানে গেলে জনতা আপনাকে হেলিকপ্টার ছাড়াই উড়িয়ে আবার ভারতে ফেরত পাঠাবে।” হাসিনাকে সতর্ক করে অমিত শাহ বলেছেন, “আপনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। এরপরও ফেরার অনুরোধ করলে আন্তর্জাতিক আদালতে পাঠানো হবে।”
শেখ হাসিনা কি ভারতের অতিথি, না কি রাজনৈতিক বন্দি? তাঁর নীরবতা কি স্বেচ্ছায়, নাকি চাপিয়ে দেওয়া? যে অডিও কলগুলো প্রচারিত হচ্ছে, তা কি সত্যিই তাঁর কণ্ঠ, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজি? উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত হয়তো শুধু একটা পুরোনো নকিয়া ফোনের রিংটোনেই শেখ হাসিনার ‘অস্তিত্ব’ খুঁজে ফিরতে হবে।






