দীর্ঘ আশি বছরের বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য অবরুদ্ধ এক অশান্তির আগুনে পুড়ছে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সাধারণ মানুষের আর্তনাদ আর বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের দীর্ঘশ্বাস এই অঞ্চলের নিত্যদিনের চিত্র। বিশ্ব সম্প্রদায় বারবার মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির তাগিদ দিলেও তা অধরাই থেকে যাচ্ছে। আর এই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে আজ সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরায়েলের চরম আগ্রাসী, উগ্র ও সম্প্রসারণবাদী নীতি। মূলত ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার অবাস্তব ও বিপজ্জনক রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তারা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হলো অন্য রাষ্ট্রের সীমানা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। কিন্তু ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে এমন এক অবাস্তব অধিকার দাবি করে বসছে, যেখানে তারা যখন-তখন মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সার্বভৌম দেশে হামলা চালাতে পারে। আত্মরক্ষার তথাকথিত ও খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করিয়ে তারা লেবানন, সিরিয়া এবং ফিলিস্তিনের ওপর একের পর এক নৃশংস সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। শক্তির দাপটে যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে আঘাত হানার এই হীন মানসিকতা কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করতে পারে না; বরং তা যুদ্ধকে আরও উস্কে দেয়।
ইসরায়েলের এই আগ্রাসনের মূল চালিকাশক্তি হলো আরব দেশগুলোর ভূমি দখল করে নিজেদের সীমানা বাড়ানো। তারা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে নিজেদের সুবিধামতো পুনর্নির্ধারণ করতে মরিয়া।
সম্প্রতি নানা অজুহাতে—কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনা অজুহাতে—ইসরায়েল ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় যেভাবে দখলদারিত্ব জোরালো করেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমস্ত নিন্দা ও যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তারা যেকোনো মূল্যে এই দখলদারিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল আসলে দ্বিজাতি তত্ত্ব বা কোনো প্রকার স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের একমাত্র লক্ষ্য—ভূমি গ্রাস এবং আধিপত্য বিস্তার।
ইসরায়েলের যেসকল নীতি বিশ্বশান্তির জন্য হুমকিঃ
সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন: যেকোনো স্বাধীন দেশের সীমানায় বিনা উসকানিতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম অবমাননা।
মানবিক বিপর্যয়: নির্বিচার হামলায় প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশু ও সাধারণ নাগরিক।
আঞ্চলিক অস্থিরতা: ইসরায়েলের এই আগ্রাসী মনোভাবের কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জাতিসংঘসহ বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি ও নিষ্ক্রিয়তা ইসরায়েলকে এই ঔদ্ধত্য দেখানোর সাহস জোগাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি না ফিরলে পৃথিবীর কোথাও টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। আর সেই শান্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো—ইসরায়েলকে তার ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠনের অবাস্তব স্বপ্ন ও অবৈধ ভূমি দখলের আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। ফিলিস্তিনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি না দিয়ে এবং যেকোনো মূল্যে দখলদারিত্ব বজায় রাখার একগুঁয়েমি পরিহার না করলে, মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির পথ চিরতরে রুদ্ধই থেকে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান শান্তিচুক্তিতে বাধাঃ
ইসরায়েল যেকোনো মূল্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে শান্তিচুক্তি করতে বাধা দিতে চায়। কারণ ইসরায়েল মধ্যপ্রচ্যের সংঘাত টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। এ সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশে নিয়ে আরব দেশ ও ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করতে চায় ইসরায়েল। একই সাথে প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতা টিকিয়ে রেখে সুবিধা নিতে চায় ইসরায়েল।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস:
ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ২০২০ সালে আরব দেশগুলোর জন্য আব্রাহাম অ্যাকর্ড নামক ইসরায়েলের অনুকূলে একপক্ষপাতদুষ্ট চুক্তির অবতারণা করে। এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোকে চাপ দেয় ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অথচ নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের অধিকারের স্বীকৃতি নেই এ চুক্তিতে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদানসহ কতিপয় আরব দেশ বাধ্য হয়ে এ চুক্তি সই করে। এ চুক্তির কারণে ফিলিস্তিন সংকট আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পথে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে।
ফিলিস্তিন সংকই মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার মূল:
মধ্যপ্রাচ্যের সকল রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম কারণ ফিলিস্তিন সংকট। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সংকট সমাধান করে শান্তি চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে মধ্যপ্রাচ্য সমস্যার বহুলাংশ সমাধান হবে বলে বিশ্বাস অনেক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকের।
যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টা ভন্ডুল করে দিতে পারে ইসরায়েল : ইসরায়েল এখনো মধ্যপ্রচ্যে শান্তির পক্ষে নয়। কারণ তাদের নকশাকৃত বৃহত্তর ইসরায়েল গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড দখল করার আগ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়ার বাধা হয়ে থাকবে ইসরায়েল। প্রকৃতপক্ষে, তাদের বৃহত্তর ইসরায়েল গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
মোঃ মহিউদ্দিন,
শিক্ষক ( বিসিএস সাধারণ শিক্ষা)
আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা।








