কবি,কে,এম,তোফাজ্জেল হোসেন জুয়েল খান
জ্ঞানতৃষ্ণায় দীর্ণ, অগ্নিকুণ্ড সম সাহসী সে,
ধ্যানের গর্ভে জন্ম নেয়া, মহাজ্ঞানের এক সন্ন্যাসী সে।
লোহিত চোখে দীপ্তি জ্বলে, তপস্যার অনন্ত ছায়া,
অন্ধকারে সত্য খোঁজে, গহন রাত্রির প্রহর মায়ায়।
সময়ের হিমালয়ে বসে, কালের উপাখ্যান লেখে,
আলোকহীন ছায়া থেকে, সুর্যের রশ্মি খুঁজে দেখে।
ধ্বংসস্তূপে চরণ রাখে, সৃষ্টির গভীর শৃঙ্খলে,
তত্ত্বের তরঙ্গে ভেসে যায়, নৈঃশব্দ্যের নিগূঢ় কললে।
পাণ্ডিত্যে তার বটবৃক্ষ ছায়া, গ্রন্থপোথির চূড়ায় বসে,
নক্ষত্রগণ কথা কয় তার সাথে, ধ্রুবতারা হঠাৎ হেসে।
অস্তিত্বের মর্মরধ্বনি শুনে, উপনিষদের ঝর্ণাধ্বনি,
নির্বাণ-পথের যাত্রী সে এক, যোগসূত্রের মহাবাণী।
জিজ্ঞাসার পিঞ্জরে আবদ্ধ ছিল যে মানবগণ,
তাদের মুক্তি দিয়ে যায় সে, জ্ঞানের ব্রহ্মপদে জন।
অজ্ঞতার আঁধার ভেদে, করুণ দীপ্তি আনে জেগে,
আত্মানুসন্ধানে বাজে তার বাণী—”নিজেকে খোঁজো আগে।”
তিনি বলে—”জগৎ মায়া, মায়াই সত্যের আরশিনগর,
দৃশ্য জগৎ কেবল ছায়া, অধরা জ্ঞানই একমাত্র অর্ঘ্য।
জন্ম, মৃত্যু, প্রেম, বেদনা, সবই রূপান্তরের খেলা,
যা স্থির, তা বোধ—নয়ন নয়, শুধু চিত্তের আলো ভেলা।”
নৈর্ব্যক্তিক সে দৃষ্টি তার, প্রেমহীন অথচ মমতাভরা,
যুগপৎ সে দূরদর্শী, হৃদয়ের অন্তর্জ্যোতিস্বর।
জীবনের শিরা-উপশিরায়, ছুটে চলে যে রহস্যধারা,
সেখানে সে এক মানস চিতার, পুড়ে ওঠে নিঃশব্দ তারা।
তত্ত্বকথার অমৃত ভাণ্ডার খুলে দেয় সে নিঃসংশয়ে,
“বেদ, বুদ্ধ, আলকোরআন, বাইবেল—সবই তো এক সুরেই গাঁথা ।
ভাষা শুধু পথ, সত্য নয়; ঈশ্বর এক সকলে তা জানি,
তুমি আমি সবই তার ছায়া, বস্তুর পেছনে গড়া সৃজনপুঁথি।”
রাত্রি তার প্রেমিকা, ধ্যান তার বন্ধনহীন সংসার,
জীবন তার এক ধোঁয়াশা, তবুও সে উন্মোচনে নির্ভার।
উপমার খাঁজে খাঁজে তার ভাবনার নিগূঢ় অলংকার,
মৌনতার মর্মরিত হাসিতে, ঝরে পড়ে প্রজ্ঞার ধ্রুপদসার।
তিনিই সেই প্রজ্ঞার অগ্নি, যার আলোয় লুপ্ত ঘোর,
শব্দের অতীত এক ভাষা বলেন, নীরবতায় দেন নিকোর।
সমস্ত দর্শনের ঊর্ধ্বে গিয়ে, তিনি স্থাপন করেন নীতি
“ভুলে যাও দেহ, মনে রেখো আত্মা, সেই তো সত্যের প্রীতি।”
নদীর মত বয়ে চলে তার বুদ্ধির অতল ধারা,
সৃষ্টির আদি বিন্দু থেকে, ভবিষ্যতের সূর্য তারা।
মহাবিশ্বের গাণিতিক ছন্দে, তার ধ্যানের রেখা আঁকা,
দর্শন, পদার্থ, মনস্তত্ত্ব—সবই তার একচোখে দেখা।
উচ্চারণে তার বজ্রনিনাদ, অথচ ছন্দে তুলসী সুবাস,
তিনি বলেন, “জ্ঞানই ধর্ম, বাকিটা শুধু শূন্য পরবাস।
আলোকচক্রের মাঝে আমি, কোনো এক তৃতীয় চেতনা,
পৃথিবী ঘোরে, আমি স্থির; জ্ঞানে বাঁধা অনন্ত সেতু-না।”
শব্দ থেকে শব্দের দূরত্বে, ভাব থেকে ভাবনার পথে,
তিনি হাঁটেন, চেতন হৃদয়ে, অস্তিত্বের মৌন নিঃশব্দেতে।
তার চোখে নেই ভয়, নেই মোহ, নেই কোন ঈর্ষার দহন,
একান্ত একা, তবুও পূর্ণ, তপস্যার শেষ অর্জন।
দৃষ্টি তার যেন মহাকাশ, চেতনার অতল বিস্তার,
বৃক্ষের পাতায়, শিশিরের ফোঁটায় খোঁজেন অদৃশ্য আদার।
নগর সভ্যতার ব্যস্ততায়, ক্লান্ত কোলাহলে,
তিনি বলেন, “শান্ত থাকো, শুনে যাও আত্মার দোলাচলে।”
তিনি বলেন, “যে জানে না, সেই জানে বেশি;
জ্ঞানীর লজ্জা তাকে রাখে বিনয়ী, বিনয় রাখে হেসে।
শূন্যতার মধ্যে জন্ম হয় শব্দের,
অতীতের মাঝে থাকে ভবিষ্যৎ, জানো যদি নিরবধি সত্যের।”
জীবনকে দেখে তিনি এক রাশ আলোয় মোড়া ছায়া,
যেখানে মৃত্যু নয় সমাপ্তি, বরং এক অন্য জাগা।
তিনি বলেন, “মৃত্যুই মুক্তি, জন্ম শুধুই প্রবেশপথ,
চেতনায় স্নান করো, যেখানে নেই কোনও প্রাপ্তির নোট।”
কবিতার অন্তিম কাব্যকথা, তাঁর জীবনের ছায়ালিপি,
মহাজ্ঞানী চলে যায় চুপচাপ, রেখে যায় নিঃশব্দ দীপ্তি।
তার প্রতিটি চিন্তা যেন, এক একটি মহাপৃথিবী—
যেখানে বুদ্ধির সূর্য উঠে, হৃদয় রাখে অনুপ্রাণিত নতশিরী।
Post Views: 289
Related