কাউকে কত বড় করে দেখাবেন সেটা আপনার ইচ্ছা। তবে বড় কাউকে ছোট করতে গিয়ে নিজে হাসির খোরাকে পরিণত হবেন না। যারা আপনার অতীত জানে, আপনাকে কাছ থেকে চেনে তাদের সামনে নৈতিকতার বয়ান ও মিথ্যা ইতিহাস হাজির করলে আপনিই হালকা হবেন।
আমরা অনেকক্ষেত্রে নিজেকে সঠিক এবং মহৎ প্রমাণ করতে গিয়ে অনেকের অবদানকে অস্বীকার করি। এমনকি কাজ না করেও নিজের কৃতিত্ব দেখাতে গিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতারসীমালঙ্ঘন করি। যাদের অবদান অস্বীকার করে নিজেদেরকেহিরো প্রমাণ করতে চাই, তখন আমরা আমাদের অতীতের ভিলেন গিরি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করি। অথচ সময় নিখুঁতভাবে সত্যকে মনে রাখে এবং সুযোগ পেলেই সামনে আনে।
যেটা সত্য সেটা প্রকাশিত হতে স্পন্সর লাগে না, কিন্তু মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিবেক বিক্রি করে দিতে হয়। বিবেকে অনুপস্থিতির দিনগুলোতে মানুষ যে আর মানুষ থাকে না—এই সহজ সত্যকে কে কাজে বোঝাবে!
আপনার সাথে সারাদিন চলাচল করার পরে, কথা বলার পরে লোকে আপনাকে যেভাবে পেয়েছে ও চিনেছে সেটা অস্বীকার করে সেই মানুষগুলোর সামনে অন্য কথা বললে হবে? আমার মতের ও পক্ষের যে সে-ই কেবল সঠিক ও জ্ঞানী এবং বিপক্ষ শিবির বেঠিক ও মূর্খ—এমনটা যারা বলে ও বিশ্বাস করে, তাদের নাম মানুষের তালিকায় আবারও রি-নিউ করার সময় সমাগত।
সত্য ইতিহাস বিকৃত করে যারা জাতিকে বিভক্ত করতে চায় এবং জাতিকে মুখোমুখি দাঁড় করায়, তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়। সস্তা জনপ্রিয়তা, ভাইরালের নেশায় যারা সত্যকে ভিক্টিম করে দ্বন্দ্ব-সংঘাত উসকে দিচ্ছে তাদের রাম-রাবণের লড়াই পড়া উচিত। মিথ্যা চাকচিক্য নিয়ে থাকতে পারে, নিজেকে অপ্রতিরোধ্য ভাবতে পারে, কিন্তু শেষ জয় সবসময় রামের! বামেরা বাঁধা সাধলেও সত্যের প্রবাহ আটকে রাখা যাবে না।
ক’দিনের জীবন নিয়ে এখানে এসেছি? যা করছি, তা ছাড়াও আরও অনেক ভালো ভালো কাজে জড়ানোর সুযোগ ছিল, অথচ জড়াচ্ছি না। যারা আমাকে উড়তে শিখিয়েছে তাদের সামনে বেয়াদবি করার যে রেওয়াজ, তাই জারি রেখে নিজের হীনম্মন্যতার প্রমাণ দিয়েছি।
মূল অস্বীকার করার যে ভুল, সেই ভুলে ভুলেফুলবাগান ভরে উঠেছে। কলুষিত আত্মার চিন্তা অপরিশোধিত রয়ে গেছে। আমাদের চিন্তায় নিজেদের কল্যাণের জায়গা যতটুকু, তার চেয়ে অন্যের অকল্যাণ কামনায় বেশি জায়গা ব্যাপৃত রেখেছি। দৃশ্যমান সত্যগুলোকেও যাতে সন্দেহ হয়, সেই লড়াইয়ের রসদ জুগিয়ে চলছি। কাজ ও কথায় বারবার প্রমাণ করেছি—আমরা ভালো মানুষ নই।
আমরা বারবার স্পষ্টভাবে জানিয়েদিয়েছি, বড় হতে গেলে যে গুণগুলো ধারণ করা লাগে সেগুলো আমাদের মাঝে অনেকাংশে অনুপস্থিত। আসল কাজ ফেলে এসব কুকাজ কেন করি এবং কু-কথা কেন বলি?
সমাজটা এমন পর্যায়ে গেছে যেখানে ভালোর চেয়ে মন্দ দ্রুত দৌড়ায়। নিজের যখন বলার মতো কথা থাকে না, দেখানোর মতো কাজ থাকে না তখন আমরা মহানজনদের কথা ও কাজে কাঠি করি। তাদের প্রশ্ন করার বদলে রায় দিয়ে ফেলি।
যে আমার পক্ষের, দলের এবং মতের সে ভগবান, আর যে বিপক্ষের তার মধ্যে সহস্র গুণ থাকা সত্ত্বেও সে সাক্ষাৎ শয়তান। গুণ ও গুণীজনদের কদর করতে না জানার কারণে আমরা চিন্তা ও কর্মে শত বছর পিছিয়ে থাকি।
বিশ্ব যখন আধুনিকতা গ্রহণ করে এগিয়ে চলে, আমরা তখন অপসংস্কৃতি লালন করে সঠিক লাইন থেকে অপসারিত হই। ভালোর সাথে মন্দ, সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত করার যে প্রবণতা, তা আমাদেরকে সাংস্কৃতিক ফকিরে এবং ধর্মীয়ভাবেদেনাদারে পরিণত করছে।
বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? যার যতটুকু অবদান ও নিষ্ঠা, তা স্বীকার করতে হবে। অর্জন ও বর্জনের সঠিক মানদণ্ড যাচাই করতে হবে। কাউকে অস্বীকার করে শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করা যায় না। সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস একটি ধারাবাহিক লাইন।
এখানে কিছু কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলা, বিতর্ক উসকে দেওয়ার চেষ্টা মানেই অসৎ উদ্দেশ্য। আমরা বিবেকের দেউলিয়াত্বে যাতে বিলুপ্ত না হই তাই চাই। বেঁচে থাকার দিনগুলোতে মানুষ থাকা অক্সিজেনের মতোই জরুরি।
ভুল হতে পারে তবে সেগুলো বুঝতে পারার সাথে সাথেই যাতে ক্ষমা চেয়ে, কানে ধরে এবং ক্ষতিপূরণ দিয়ে হলেও ফুলে পরিণত করতে হয়। জীবন একবারই পাওয়া যাবে, কাজেই কীর্তি বা কুকীর্তি গঠনের প্রশ্নে মানুষ যাতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়।
কথাই ব্যথা জাগানোর অস্ত্র, আবার কথাই অসুখ তাড়ানোর হাতিয়ার—এবার ফয়সালা আপনার।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








