মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বাড়িঘরে পানি থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ও তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ঘরে পানি ওঠায় অনেক পরিবার রান্নাবান্না করতে পারছে না। অন্যদিকে পানির নিচে তলিয়ে গেছে আউশের রোপা, ভেসে গেছে আমনের বীজতলা ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির ক্ষেত। এতে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খৈয়াছড়া, ইছাখালী, কাটাছড়া, দুর্গাপুর, হাইতকান্দি ও ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা, মিরসরাই পৌরসভা এবং বারইয়ারহাট পৌরসভার নিম্নাঞ্চল এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। অনেক সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক পরিবার চুলা জ্বালাতে পারছে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কাজ করতে না পারায় দিনমজুর ও স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
উপজেলার মাইজগাঁও গ্রামের কৃষক মোশারফ হোসেন বলেন, “আউশের রোপা এখনো পানির নিচে। ১০ শতক জমিতে আমনের বীজতলা করেছিলাম, পাহাড়ি ঢলের পানিতে সব ভেসে গেছে। বৃষ্টি কমলে আবার নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে।”
ফেনাপুনি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক বলেন, টানা বর্ষণে তাদের এলাকার অধিকাংশ পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। অনেকের রান্নাঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
নিজামপুর এলাকার আমজাদ হোসেন বলেন, পাহাড়ি ঢলে তাদের এলাকার কয়েকটি রাস্তা ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ছড়া দখল ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পাহাড়ি ঢলের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রাস্তা ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
দক্ষিণ ওয়াহেদপুর এলাকার বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন ও ইমাম হোসেন অভিযোগ করেন, একটি ফিডমিল কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশনের কালভার্ট সংকুচিত করে দেওয়ায় তাদের এলাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে কোমরসমান পানি জমে বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ইছাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, টানা বৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলের পানি বের হওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা বেড়েছে। অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর, দোকানপাট ও শিল্পকারখানা নির্মাণও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
এদিকে, চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর মিরসরাই জোনাল অফিসের ডিজিএম আদনান আহমেদ চৌধুরী জানান, আবুতোরাব খেয়ারহাট ও ঘড়িমার্কেট এলাকায় বড় গাছ পড়ে বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে এবং তার ছিঁড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নতুন খুঁটি স্থাপনের কাজ চলছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন, টানা বৃষ্টিতে অনেক জমির আউশের রোপা পানির নিচে রয়েছে। আমনের বীজতলার পাশাপাশি শাকসবজিরও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। অনেক কৃষক বীজ প্রস্তুত করলেও জমিতে রোপণ করতে পারছেন না।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন জানান, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় তিন হাজার পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু পরিবারকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের সীমাবদ্ধতার কারণে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে।








