মিরসরাই প্রতিনিধি
মিরসরাইয়ে অতিবৃষ্টি পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় টানা ৭ দিন নিমজ্জিত ছিল রোপা আমন ও আমন ধানের বীজতলা। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এ অঞ্চলে প্রধান ফসল রোপা আমন। এতে নষ্ট হয়ে গেছে অধিকাংশ বীজতলা। ফলে চরম বিপাকে পড়েছে এখান কার খেটে খাওয়া কৃষকেরা। ভারা মৌসুমে চারা সংকটে জমিতে ধানের চারা লাগানো নিয়ে তৈরী হয়েছে ধোঁয়াশে। সময় মত চারা লাগাতে না পারলে কমতে পরে উপজেলায় ধানের উৎপাদন।
জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মহুরী নদীর তীরবর্তী করেরহাট, হিঙ্গুলী, ধুমসহ মিরসরাইরে ১১টি ইউনিয় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। এতে করে টানা ৭ দিন নিমজ্জিত ছিল মিরসরাই উপজেলা এক তৃতীয়াংশ এলাকা। ডুবে ছিল মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের। পানিবন্দী হয়ে পড়ে লক্ষাধিক মানুষ। বন্যার পানি কমতেই দেখা দিতে থাকে ফসলি জমির ক্ষতির চিহ্ন। যতদিন অতিবহিত হচ্ছে যতই যেন বাড়ছে ক্ষতির চিহ্ন। সরেজমিনে মঙ্গলবার উপজেলার কাটাছড়া, ইছাখালী, মিঠানালা, ধুমসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকা বীজতলা পচে গেছে নষ্ট হয়ে গেছে ধানের চারা। জমিতে আগাম লাগানো চারাও পচে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষক চারার জন্য পার্শ্ববর্তী উপজেলা গুলোতে খোজ খবর নিচ্ছেন। উপজেলার সব জায়গায় দেখা গেছে একই দৃশ্য। মাথায় হাত দিয়ে আছেন কৃষক। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের জন্য বীজতলা প্রস্তুত করছেন উজেলার অন্যতম সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দূর্বার। চারা পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে বলছেন কৃষকরা।
মিরসরাই উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, আমন ধানের মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের বীজতলা প্রস্তুত কার হয়েছিল। যার মধ্যে ৩৫০ হেক্টর জমির বীজতলা সম্পুর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বাকি ৮৭০ হেক্টর জমির বীজতলা কোন না কোন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এবার আমন ধানের লক্ষমাত্রা ধারা হয়েছিল ১৯ হাজার ৮৫০ হেক্টর। বীজতলা ক্ষতিগ্রস্থ হওযায় ৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমির খালি থাকার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি অফিস।
উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়রেন রাজাপুর গ্রামের কৃষক উজ্জল কুমার নাথ বলেন, ৭ শতক জমিতে ৩ একর ৬০ শতক জমির জন্য আমনের বীজতলা প্রস্তুত করেছি। টানা ৭ দিনের বন্যায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে। গত তিনদিন আমনের চারা জন্য দারে দারে ঘুরছি কিন্তু চারা পাইনি। ফলে হতাশা গ্রস্থ হয়ে পড়েছি। জানিনা চারা সংগ্রহ করতে পারবো কি না। আমার মত আমার গ্রামের অনেক দরিদ্র কৃষকের একই অবস্থা। বীজ না পেলে জমিতে ধান চাষ না করতে পারলে খাবো কি পরিবার পরিজন নিয়ে চলবো কি করে। এছাড়া গবাদী পশুর খাদ্যের জোগান মিটাবো কি করে। এরকম বন্যা কবলে কোন দিন পড়ি না। আমার বয়সে ও দেখিনি।
উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বীজতলা নষ্ট হয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছি কোথাও ধানের চারা পাওয়া যাচ্ছেনা। অর্ধ একর জমির জন্য বীজতলা প্রস্তুত করেছিলাম। কয়েক শতক জমিতে রোপন করতে পারলেনও অর্ধেক জমি খালি পড়ে থাকবে। ধানের চারা না পাওয়াতে।
একই এলাকার বাসিন্দ রাজু দাশ নামের এক কৃষক বলেন, ধান চাষ করে আমরা সারা বছরের খোরাকি জোগাড় করি। এবার চারা নষ্ট হওয়াতে জমিতে ধান চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ঋণ নিয়ে বর্গা জমিচাষ করি। ধানের মৌসুমে ধান বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করি। এ ছাড়া ধান মারাই শেষে গবাদী পশুর জন্য খড় কুডো সংগ্রহ করি। তা দিয়ে গবাদি পশু লালন পালন করি। এবার সব গেলো কি ভাবে কি করবো মাথায় আসছেনা। এ এলাকার অনেক কৃষক জমিতে চারা লাগাতে পারেনি। চারার জন্য হাহাকার চলছে এলাকা জুড়ে। আমার মত অনেকের ধানচাষ জীবিকার প্রধান উৎস হলেও পর্যপ্ত ধানের চার না থাকায় এ বছর বর্গা জমি চাষিদের কপারে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই নাই।
তিনি আরো বলেন, মিরসরাইয়ে এবার বন্যায় দু’দফায় বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারে কিছু জাতের ধানবীজের সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক আবার নিজ বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছেন। কৃষি বিভাগ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন কৃষকদের ধানের চারা উৎপাদনে সহযোগিতা করছে। এখন যেসব কৃষক বীজতলায় চারা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের বিআর-২২, বিআর-২৩, ব্রি-৩৪, ব্রি ধান-৪৬ ও হাইব্রিড ধানি গোল্ড জাতের চারা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর যেসব কৃষক ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমিতে ধানের চারা লাগাতে পারবেন না, তাঁদের এ মৌসুমে আর ধান চাষ না করে সেসব জমিতে আগাম শাকসবজি, শর্ষে, গমজাতীয় ফসল চাষ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।








