মিরসরাই প্রতিনিধি
মিরসরাই উপজেলার ১৬ ইউনিয়ন পরিষদ ও দু’টি পৌরসভার কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। উন্নয়ন কার্যক্রম তো দূরের কথা, স্বাভাবিক জাতীয়তা সনদ এবং জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোও হচ্ছে না। এতে করে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পাসপোর্ট করা, জমি রেজিস্ট্রি, এনআইডি সংক্রান্ত কাজসহ সবকিছু বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ ইউনিয়ন পরিষদগুলো সচল হবে তা জানা যায়নি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্ব অপরিসীম। তৃণমূল পর্যায়ের এই সংস্থার ওপর নির্ভরশীল হাজার হাজার মানুষের প্রাত্যহিক অনেক কর্মকাণ্ড। জাতীয়তা সনদ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত জাতীয়তা সনদ ছাড়া পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, এনআইডি, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশান সনদসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা সম্ভব হয় না। রোহিঙ্গাদের কারণে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দেয়া জাতীয়তা সনদকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার রাস্তাঘাট এবং ব্রিজ কালভার্টের উন্নয়নসহ নানাভাবে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। পরিচালিত হয় গ্রামীণ আদালত, যাতে গ্রামাঞ্চলের হাজার হাজার অভিযোগের মীমাংসা ঘটে। এর ফলে কোর্ট বা থানা পর্যন্ত যেতে হয় না। স্থানীয় সরকার হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমের ওপর ওই এলাকার কয়েক লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বহুলাংশে নির্ভর করে। এই উপজেলায় ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদ ও মিরসরাই এবং বারইয়ারহাট পৌরসভা রয়েছে। এসব পরিষদের বর্তমান মেয়র ও চেয়ারম্যানদের প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগের দলীয় নেতা। সরকার পতনের সাথে সাথে সকলে গা ঢাকা দিয়েছেন। প্রতিটি এলাকার গ্রামীণ পর্যায়ে যতগুলো উন্নয়ন কাজ চলছিল সব বন্ধ হয়ে রয়েছে। কোথাও ঠিকাদার কাজ করছেন না।
জানা গেছে, গত ৫ আগষ্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর সারা দেশের ন্যায় মিরসরাইয়ে নিরাপত্তা অজুহাতে মিরসরাইতেও এলাকাছাড়া হয়ে যান জনপ্রতিনিধিরা। মিরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত রয়েছেন। থানায় পুলিশ না থাকায় নিরাপত্তার ভয়ে তারা অফিস করছেন না বলে জানা গেছে। এদিকে ৫ আগষ্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর মিরসরাই পৌরসভা ও বারইয়ারহাট পৌরসভা সহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে হামলা, ভাংচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মিরসরাই পৌরসভার মেয়রের গাড়ি, বর্জ্য নিষ্কাশনের গাড়ি সহ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে। এছাড়া অফিসের বিভিন্ন কক্ষের জানালার গ্লাস ও ভাঙ্গা হয়েছে। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মিরসরাই উপজেলা ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয় সংবলিত ব্যানার টাঙিয়ে মিরসরাই পৌরসভার দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবনে দখলেরও অভিযোগ উঠেছে। বারইয়ারহাট পৌরসভার মেয়রের ব্যবহৃত গাড়ি ভাংচুর করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পৌর কার্যালয়ের অফিস কক্ষে ভাংচুর করে বেশ কয়েকটি কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বারইয়ারহাট পৌরসভায় অফিস কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। উপজেলার ৮নং দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে জনপ্রতিনিধিরা না আসলেও সচিব ও ডিজিটাল সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা অফিস করছেন। এছাড়া ১ নং করেরহাট, ২ নং হিঙ্গুলী, ১৫ নং ওয়াহেদপুর, ১২ নং খৈয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদও ভাংচুর করা হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেছেন, বিশেষভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে ইউনিয়ন পরিষদগুলো চালু করা হলে সাধারণ মানুষের উপকার হতো। ইউনিয়ন পরিষদ ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে হলেও স্বাভাবিক কার্যক্রমগুলো সীমিত পরিসরে চালু করা দরকার। না হয় মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে।
গত সোমবার সকালে কার্যক্রম চালু করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজা জেরিন, সেনাবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি টিম বারইয়ারহাট পৌরসভা কার্যালয় ও ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় পরিদর্শন করেন। দুই পৌরসভা ও কয়েকটি ইউনিয়নে হামলা ও আগুন দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থায় সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন। এর খেসারত দিতে হচ্ছে এলাকার সাধারণ মানুষকে। তারা জাতীয়তা সনদ এবং জন্মনিবন্ধন করতে না পারায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ আটকে রয়েছে।
করেরহাট ইউনিয়নের ছত্ত্বরুয়া এলাকার বাসিন্দা আমির বকস আক্ষেপ করে বলেন, ‘জাতীয়তা সনদপত্রের জন্য গিয়ে দেখি কেউ নেই। আমার একটি পাসপোর্ট করতে হবে। কিন্তু পাসপোর্ট অফিস খোলা থাকলেও চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট নিতে না পারায় আবেদন করতে পারছি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট স্বাভাবিকভাবেই কেউ আগে-ভাগে নিয়ে রাখেন না। প্রয়োজনের সময় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে সংগ্রহ করে কাজ সারেন। আমাকে এখন সঙ্কটে পড়তে হলো। চেয়ারম্যান কখন আসবেন খবর নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছেন না।’
উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের পশ্চিম মলিয়াইশ এলাকার নিজাম উদ্দিন জানান, ‘আমার বাচ্চার জন্মনিবন্ধন করানো দরকার। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে কেউ নেই। সব কাজ বন্ধ। কী যে করব বুঝতে পারছি না।’
কাটাছরা ইউনিয়নের বঙ্গনূর এলাকার মীর হোসেন জানান, ‘জরুরি কাজে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখি চেয়ারম্যান সাহেব নেই। তাই ইউনিয়ন পরিষদের সব কাজ বন্ধ।’
মিরসরাই পৌরসভার বাসিন্দা শেখ আহম্মদ বলেন, ‘আমার ভাই জমি বিক্রির জন্য ওয়ারিশ সার্টিফিকেট প্রয়োজন। কিন্ত গত এক সপ্তাহ ধরে মেয়র না থাকায় নিতে পারছি না। মেয়র না থাকলে সচিবকে দায়িত্ব দেয়া উচিৎ।’
করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসে নজরুল ইসলাম বলেন, নাগরিক সনদের জন্য পরিষদে কয়েকদিন এসে ফিরে যেতে হয়েছে। কবে থেকে কার্যক্রম চালু হবে তাও বলা যাচ্ছে না।
উপজেলার ৮নং দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাঞ্চন কান্তি পাল বলেন, দুর্বৃত্তরা ইউনিয়ন পরিষদের প্রবেশ পথে থাকা দু’টি সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে। পরিষদে গত ৫ আগষ্টের পর থেকে জনপ্রতিনিধিরা আসছেন না। তবে নাগরিক সনদ প্রদানসহ কিছু সেবা চালু রাখা হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদের আবেদনসহ বিভিন্ন আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। চেয়ারম্যান, মেম্বাররা আসলে অফিসিয়াল কাজ শেষ করে তা প্রদান করা হবে।
বারইয়ারহাট পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সমর কান্তি চাকমা বলেন, পৌরসভার মেয়রের গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ কম্পিউটার, গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ভাংচুর করা হয়েছে বিভিন্ন কক্ষ ও আসবাবপত্র। পৌরসভায় গত কয়েকদিন যাবৎ মেয়র আসছেন না। কয়েকজন কাউন্সিলর আসেন মাঝে মাঝে। পৌর এলাকায় পয়নিষ্কাশন, লাইটিং, নাগরিক সনদ দেওয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেবা চলমান রয়েছে। কম্পিউটার ভাংচুরসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলায় নাগরিক সেবা প্রদান ব্যহত হচ্ছে।
মিরসরাই পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম বলেন, দুর্বৃত্তরা পৌরসভার মেয়রের গাড়ি, বর্জ্য অপসারণ গাড়ি সহ বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করেছে। ভাংচুর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, বেশ কয়েকটি অফিস কক্ষ। এছাড়া পৌরসভার দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবনে বিএনপির কার্যালয় লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর থেকে মেয়র, কাউন্সিলরগণ পৌরসভায় আসেন না। তবে পৌর এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও ওয়ারিশ সনদ প্রদানসহ কিছু কিছু নাগরিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। মেয়র ও কাউন্সিলররা অফিস না করলেও সেবা প্রত্যাশীরা তাদের সাথে যোগাযোগ করে ওয়ারিশ সনদ গ্রহণসহ বিভিন্ন সেবা নিচ্ছেন।
উপজেলার মিরসরাই সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামছুল আলম দিদার বলেন, নিরাপত্তা জনিত কারণে আমি ও মেম্বাররা পরিষদে যাচ্ছি না। আমরা পালিয়ে যাইনি। থানায় পুলিশ আসলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হলে সবাই ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যাবো। পরিষদে না গেলেও আমি সচিবের সাথে যোগাযোগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন কাজ নিয়মিত করছি। আমি বেশ কিছু সার্টিফিকেট স্বাক্ষর করে দিয়েছি, যাতে জনগন ভোগান্তিতে না পড়েন।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজা জেরিন জানান, উপজেলার ১নং করেরহাট, ২নং হিঙ্গুলী, ১৫ নং ওয়াহেদপুর, ১২ নং খৈয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদ ভাংচুর করা হয়েছে বলে চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন। এছাড়া মিরসরাই পৌরসভা ও বারইয়ারহাট পৌরসভায় ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ করা হচ্ছে। উপজেলার ১নং করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্যান্য ইউনিয়ন ও পৌরসভার সেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা প্রদান ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ইউনিয়ন পরিষদগুলো বন্ধ থাকায় জনগন নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, খুব শিগগিরই সব পরিষদ খোলা হবে। সোমবার বারইয়ারহাট পৌরসভা ও করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ পরিদর্শন করেছি। আশা করছি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’







