ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী অপশক্তিকে নির্মূল করতে হবে’
আজ ৩০ ডিসেম্বর (২০২৩) শনিবার বিকাল ৩.৩০ টায় ৫৩তম বিজয়ের মাস উদযাপন উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের বিজয় সম্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়।
জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবৃত্তিশিল্পী মো: শওকত আলীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা পিন্টু সাহার সঞ্চালনায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেখক, সাংবাদিক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহরিয়ার কবির, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান শহীদ, ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম খান রেজভী, বীর মুক্তিযোদ্ধা রেখারাণী গুণ ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পুত্র প্রজন্ম ’৭১-এর সভাপতি নাট্যনির্দেশক আসিফ মুনীর তন্ময়।
অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেন জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবৃত্তিশিল্পী মো: শওকত আলী ও সৈয়দ ফয়সল আহমদ। সঙ্গীত পরিবেশন করেন জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সঙ্গীত বিভাগ সম্পাদক কন্ঠশিল্পী শাহরুখ কবির, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের কার্যকরী সদস্য কণ্ঠশিল্পী গৌতম সাহা, সুমন রায় ও আশীষ ভট্টাচার্য।
আরও উপস্থিত ছিলেন নির্মূল কমিটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সমাজকর্মী কাজী মুকুল, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের অর্থসম্পাদক ড. আরেফীন অমল, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের চারুকলা বিভাগের সহসম্পাদক চারুশিল্পী আর্থার ব্যাপ্টিস্ট মুক্ত, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের কার্যকরী সদস্য সংস্কৃতিকর্মী হারুন অর রশিদ, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সদস্য আলমগীর হোসেন, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সদস্য জাহিদুল ইসলাম, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের সদস্য সায়েরী আক্তার, আফরিন বেগম, জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের প্রচার সম্পাদক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা সাইফ উদ্দিন রুবেল ও জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের কার্যকরী তথ্য সম্পাদক সাংবাদিক সাইফ রায়হানসহ প্রমুখ।
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালে শব্দসৈনিক ও প্রচারযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীদের অবদান আলোচনা করতে গিয়ে লেখক প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘যে কোনও দেশ ও জাতির মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রচারযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের অবদান কোনও অংশে কম নয়। ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে জাতির মানস গঠনে আমাদের শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৭১-এ শিল্পগুরু কামরুল হাসান, মুস্তফা মনোয়ার, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুণ্ডু, প্রাণেশ মন্ডল, বীরেন সোম, আবুল বারক আলভী ও স্বপন চৌধুরীর মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা তাদের চিত্রকর্মের মাধ্যমে ’৭১-এর গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাসহ স্বাধীনতাকামী গোটা জাতিকে। একইভাবে চলচ্চিত্র জগতের বরেণ্য চলচ্চিত্রনির্মাতা জহির রায়হান, আলমগীর কবীর, বাবুল চৌধুরী, সুমিতা দেবী, কবরী সরোয়ার; সঙ্গীতজগতে কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার, সন্জিদা খাতুন, সমর দাস, ওয়াহিদুল হক, মাহমুদুর রহমান বেণু, শাহীন সামাদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, সুজেয় শ্যাম, ডালিয়া নওশীন, রফিকুল আলম, বুলবুল মহলানবীশ, বিপুল ভট্টাচার্য, মোশাদ আলী; নাট্য ও যাত্রা শিল্পী অমলেন্দু বিশ্বাস, কল্যাণ মিত্র, মামুনুর রশীদ, রাজু আহমেদ, সৈয়দ হাসান ইমাম এবং অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবীদের ভেতর অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশীদ, অধ্যাপক অজয় রায়, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক এ আর মল্লিক, অধ্যাপক অনুপম সেন, সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি সিকান্দার আবু জাফর, সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুল, লেখক বেলাল মোহাম্মদ, লেখক আহমদ ছফা, অধ্যাপক গোলাম মুরশীদ ও অধ্যাপক নরেন বিশ্বাসসহ আরও অনেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন।’
শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য ১৯৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বপ্রদানকারী তাঁর প্রধান সহযোগীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ’৭১-এ পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তিÑ যারা ধর্মের নামে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ করেছে তারা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের বদৌলতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে, যার মাশুল এখনও আমাদের দিতে হচ্ছে। বিজয়ের মাসেও ’৭১-এর পরাজিত অপশক্তির সন্ত্রাস ও আস্ফালন আমাদের দেখতে হচ্ছে। এরা ’৭১-এর যাবতীয় অর্জন ধ্বংস করতে চায়। তরুণ সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ’৭১-এ পরাজিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী অপশক্তিকে নির্মূল করতে হবে। আশা করব এই প্রচারযুদ্ধে ‘জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড’ বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।’
১৯৭১-এ বিলেতে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের প্রধান কাজ ছিল বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জনমত সৃষ্টি করা মন্তব্য করে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ব্রিটেনে অবস্থানরত বহু বাঙালি একযোগে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে অনশন আরম্ভ করলে চতুর্থ দিনে একজন মন্ত্রী এসে আমাদের ধর্মঘট ভাঙ্গান এবং তিনি সেদিনই পার্লামেন্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে সংসদে আলোকপাত করেন।’ বিচারপতি মানিক তৎকালীন সময়ে ব্রিটেন অবস্থানরত বাঙালিরা কে কীভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছিলেন সে সম্পর্কে বিশদ স্মৃতিচারণ করেন।
প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ এখনো স্বাধীন হয়নি মন্তব্য করে নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘’৪৭-এ ভারত বিভাগের সময় থেকেই বাঙালিরা বুঝেছিল তারা প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হয়নি। বাঙালিরা পূর্ণ স্বাধীনতা পায়নি এজন্য রাজনীতিবিদগণের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিজীবীরাও তাঁদের মেধা, মনন, কর্ম ও লেখনী মাধ্যমে বাংলাদেশ মানুষকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা এখনো চলমান কারণ একাত্তরের পরাজিত শক্তি ঘাতক দালালরা এ দেশে বসে এখনো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এদেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে তারা নিমজ্জিত। তাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীরা তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং আগামীতেও যাবে।’
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার স্মৃতি ব্যক্ত করে ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম খান রেজভী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে এবং তার নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলাম।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা রেখারাণী গুণ বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই সমাজের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি ১৯৭৪ সালে। তখন আইয়ুব খান মোনায়েম খান মানিকগঞ্জে এসেছিল। আমরা স্কুল থেকে তাদেরকে সংবর্ধনায় অংশগ্রহণ করেছি। সেই আইয়ুব খানই যে আমাদেরকে নিঃস্ব করবে এইটা জানা ছিল না। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ’৭১-এর নির্বাচনে পুলিং এজেন্ট ছিলাম। সবকিছুর সাক্ষী। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে মেয়েদের ২টি বাস লিজ করেছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর চার নেতাসহ মঞ্চে উঠছেন। সেকি শিহরণ, কোনদিন ভুলার নয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে উদ্দীপ্ত হয়ে আমরা ৪ ভাই বোন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ১২ দিন হেটে রাতে দিনে পদ্মা পার হয়ে ভারতে ট্রেনিং নিয়ে আবার দেশে ফিরে স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশ স্বাধীন করেছি। ৫২ বৎসর পরে এসে আমরা কি দেখছি? সেই সংবিধানও নেই। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী রাজাকার জঙ্গি আবার মাথা উচু করে বুদ্ধিজীবীদের শেষ করার জন্য পায়তারা করছে। জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের বিজয় সম্মিলনী পালনকালে মুক্তিযোদ্ধাদের আলোচনা শুনছি। শ্রদ্ধেয় জাহানারা ইমাম, সুলতানা কামাল, জহির রায়হান আরও বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করছি। শ্রদ্ধেয় শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বে আমরা আবার রাজাকারমুক্ত দেশ গঠনের প্রত্যয় ঘোষণা করছি।’
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পুত্র প্রজন্ম ’৭১-এর সভাপতি নাট্যনির্দেশক আসিফ মুনীর তন্ময় বলেন, ‘শহীদদের আদর্শের একটি বড় স্বপ্ন, বাঙালি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের লালন ও বিকাশ। তাদের চিন্তা-চেতনার একটি বড় প্রতিফলন আমাদের ’৭২-এর সংবিধান। যে সংবিধান বঙ্গবন্ধুরও আদর্শ ও স্বপ্নের ফসল। বিজয়ের আনন্দের সাথে প্রত্যয় হোক আদর্শিক লক্ষ্য প্রতিষ্ঠার মহা উদ্যোগ।’
সভাপতির ভাষণে জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াড-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো: শওকত আলী বলেন, ‘বিজয়ের মাসে জাগরণ সাংস্কৃতিক স্কোয়াডের বিজয় সম্মিলনী বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতা ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ড এসব বিষয়ে বাংলাদেশকে দ্বিধাবিভক্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। আজকে মুক্তিযোদ্ধাগণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যে কথা বলেছেন, তরুণ প্রজন্ম এতে সমৃদ্ধ হয়েছে। তাদের চেতনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি আশা করি। গান, কবিতায় যারা অংশগ্রহণ করেছে তাদের প্রতি ধন্যবাদ।’







