কলমে

—–মোহাম্মদ সোহেল

নবান্নের শেষ শুষ্কতা কাঁটাতে কাঁটাতে, শীতের শরীরে যে উষ্ণ সোনালি আভা লাগে, তারই মায়াময় প্রলেপে আজ সুহৃদ সহযোদ্ধার সান্নিধ্যে মিলিত হওয়ার মূহূর্তগুলো মনে পড়ে গেল ছোটো বেলায় ঝলসানো আলোর উস্কানিতে, কলাপাতার খোলসে বাঁধা কৃত্রিম ইটের ভাটায় আমরা খেলার ছলেই নির্মাণ করতাম ভবিষ্যতের কেল্লা।
নির্মল-স্বচ্ছ চোঁখ গুলো কৃত্রিম ধুয়ার তান্ডব! চোঁখ কচলাতে কচলাতে বন্ধুরা বলতেন ” হালারা খের বেশি দে, দুমা যানি ম্যালা উফুরে উঠে “। সে দিন চোখে ছিল একধরনের অলস ধোঁয়াশা, যে ধোঁয়াশা অশ্রুও ঝরাত স্ফূর্তি আর নির্মল আহ্লাদে। সেসব দিনের চোখ হয়তো অনেক কিছুই দেখার দরকার ছিল না, কোনো গুরুদায়িত্ববোধও কাঁধে চেপে বসত না। তখনকার অদেখা ছিল নির্দোষ; আজকের অদেখা বিবেকের কঠোর শাসনে বার বার হৃদয়ে রক্ত ঝরায়। আমরাও পারি দেখেও না দেখার মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লে প্রদর্শন: এটা যেন নিয়মে পরিনত হয়েছে। তাই এই মাহান দায়িত্ববোধেরই সিঁড়ি বেয়ে, যমুনা আঞ্চলিক প্রেসক্লাবের সদস্যবৃন্দের এক অভিযাত্রিক পদযাত্রায় রূপ নিল আজ, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখের এই উজ্জ্বল প্রভাত।
সময়ের সাক্ষী হতে আমরা উপস্থিত হলাম যমুনা রিসোর্টের পরিপাটি পরিবেশে, দাঁড়ালাম যমুনা সেতু আঞ্চলিক জাদুঘরে ইতিহাস-সমৃদ্ধ সংগ্রহশালয়। এখানে প্রাণ-প্রকৃতির ভাণ্ডারে যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্তে, লুকিয়ে আছে এক অনন্য সংগ্রহশালায় রয়েছে যমুনা সেতু আঞ্চলিক জাদুঘর। সেতু নির্মাণকালীন সময়ে শুরু হওয়া এই প্রতিষ্ঠান আজ জীববৈচিত্র্য ও লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত আর্কাইভ। জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত আছে পাঁচ হাজারেরও বেশি নমুনা। এর মধ্যে রয়েছে ১৩৫ প্রজাতির পাখি, ৩২ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৭৫ প্রজাতির মাছ, ৮০৯ প্রজাতির কীটপতঙ্গ, ৯০০ উদ্ভিদ নমুনা এবং ৩৬৫টি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিদর্শন। সংরক্ষিত দুর্লভ প্রাণীদের মধ্যে আছে নীল গাই, চিতাবাঘ, দৈত্য শকুন, হুদহুদ পাখি ও মর্মর ব্যাঙ। কোনো প্রাণীই জাদুঘরের জন্য হত্যা করা হয়নি; সবই প্রাকৃতিক মৃত্যু বা দুর্ঘটনার শিকার।
শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্র: দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য এটিএকটি ব্যবহারিক শিক্ষাকেন্দ্র। প্রতিটি নমুনার সাথে বাংলা, ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নামসহ বিবরণ থাকায় দর্শনার্থীরা সহজেই জানতে পারেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত,পরিপাটি পরিবেশে সাজানো এই জাদুঘর পরিদর্শন এক অনন্য অভিজ্ঞতা। জীবনের নানান রূপ ধারণ করা এই জাদুঘর আমাদের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য ধারক। সবাই মিলে আর বিস্তৃত পরিসরে পরিভ্রমণ করলাম যমুনা ফিউচার পার্কের নবনির্মিত পরিকাঠামো।
কেবল দর্শনই নয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সাথে গভীর মতবিনিময় এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল। জ্ঞান, তথ্য ও অভিজ্ঞতার পারস্পরিক এই আদান-প্রদান শেষে যে মুহূর্তটি সৃষ্টি হলো, তা ছিল ক্যামেরাবন্দি এক দৃপ্ত অঙ্গীকারের-সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি অবিচল আনুগত্যের। এভাবেই, সুশৃঙ্খল ও দায়বদ্ধতার পথরেখা অনুসরণ করে, প্রশাসনের সহযোগী কিন্তু কখনও তার আনুকূল্যের প্রত্যাশী নয়, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, সততায় অটল, আইনের শাসনের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল এবং সত্য প্রকাশে চূড়ান্ত আপোষহীন এক প্রতিষ্ঠানের রূপে বাংলাদেশের মিডিয়া ভুবনে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করছে যমুনা আঞ্চলিক প্রেসক্লাব।
সামনে দিগন্তজোড়া অগ্রযাত্রার পথ, পশ্চাতে ইতিহাসের দুর্নিবার, গতিময় স্রোত। এই পথ চলায় যেন মহান পরম করুণাময় আল্লাহ্ আমাদের সহায় হন। শত প্রতিবন্ধকতা, শত জটিলতা কাটিয়ে উঠতে হবে। নবদিগন্তের উদ্দীপনা যেন শক্তি জোগায়, কিন্তু দূর্গম পথের ক্লান্তিতে যেন আমরা কখনও নিরাসক্ত না হই। প্রতিটি মুহূর্ত মনে রাখতে হবে- আমাদের দেখার দায়িত্বই সমাজের চোখ। সেই চোখ যেন থাকে নির্মল, স্বচ্ছ ও দূরদর্শী।
Post Views: 234
Related