দুনিয়ায় গাড়ি-বাড়ি, পয়সা-কড়ি কিংবা চাকরি— এসব কিছুই নয় সেই সফলতার সামনে, যখন প্রশান্ত আত্মা ধীরে ধীরে হেঁটে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়। দুনিয়ার সুখ-শান্তি ক্ষণস্থায়ী, বড়জোরদু’দিনের; কিন্তু আল্লাহ একবার সন্তুষ্ট হয়ে গেলে সেই জীবনই হয়ে ওঠে মহাসৌভাগ্যের। যে জীবন মানুষের ভালোবাসা ও দোয়ার ভেতর দিয়ে শেষ হয়— তেমন মৃত্যুর জন্য কাঙালেরমতো অপেক্ষা করাই শ্রেয়। কতদিন বাঁচলে তা মুখ্য নয়; কীভাবে বাঁচলে— সেটাই আসল। অর্থবহ জীবনের জন্য সত্যের পক্ষ নিতে হয়, অধিকারবঞ্চিতের পাশে দাঁড়াতে হয়, আর জীবনকে আল্লাহররাহেউৎসর্গ করতে হয়।
যে রবকে পেতে চায় এবং যাঁর প্রতি রবও সন্তুষ্ট হয়ে যায়— তার কাছে দুনিয়ার বাকি সবকিছু তুচ্ছই হয়। যারা জমিনে কেবল বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়নি বরং মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত থেকেছে—তাদের কাছে শাহাদাতেরতামান্না অধরা থাকে না। এমন একটি জীবন, যেখানে কারও ঋণের প্রতি অকৃতজ্ঞতা নেই, বিনীত হতে শরম নেই, ভুল স্বীকার করতে লজ্জা নেই, শিখতে কার্পণ্য নেই, ক্ষমা প্রার্থনা করতে দেরি নেই, কারও ক্ষতির ষড়যন্ত্র নেই, কিংবা কাউকে আঘাত করার ইতিহাস নেই— সে জীবনের পরিসমাপ্তিতে যখন আত্মা খোদার দরগাহে হাজিরা দেয় তখন সেখানে নেমে আসে প্রশান্তি।
কেউ কেউমহৎ জীবনের সন্ধান পায়। মানুষের ভালোবাসা ও দোয়ায় তার জীবন ভরে ওঠে। যার বেদনায় প্রকৃতি কেঁদে ওঠে। আত্মীয় না হয়েও সে সবার পরমাত্মীয় হয়ে ওঠে। শিশু-কিশোর, তরুণ-বৃদ্ধ— যার কল্যাণের জন্য হাত তোলে, খোদা তাকে আপন না করে পারেন না। যার জন্য সবাই কাঁদে তাকে খোদা আপন করে নেন, চির আপন। যে জীবন নিজের জন্য নয়, দেশ ও দশের জন্য উৎসর্গ হয়ে যায়— সে জীবন শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছুই পায় না। যে একবার মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর অকুণ্ঠ দোয়া পেয়েছে, দুনিয়ার কাছে তার আর কোনোই প্রত্যাশা থাকে না। সে রবের প্রিয়জনদের একজন হয়ে যায়।
অর্থহীনতায় বহু বছর বেঁচে থাকার মাঝে কোনো কৃতিত্ব নেই। যে জীবন ইমপ্যাক্ট তৈরি করতে পারে না, যে জীবন শাহাদাতেরতামান্না বুকে ধারণ করে না— সে জীবন গরু-ছাগলের জীবনের মতোই; খাওয়া, ঘুমানো আর বংশবিস্তারের মাঝেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে, মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করে এবং ইমানের সাথে জীবন উৎসর্গ করে— সে জীবন চিরন্তন উৎসব ও সন্তুষ্টির অধিকার অর্জন করে। যাদের মনে খোদার সামনে সন্তুষ্ট চিত্তে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা জাগে না, তারা কেবল জীবিত— মানুষ নয়।
জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজ অর্থবহ হোক। প্রতিটি পদক্ষেপ ও আচরণে মানুষের কল্যাণচিন্তা থাকুক। সৎকর্ম কাকে কতদূর পৌঁছে দেবে— তা কেবল স্রষ্টাই সময়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করেন। তিনি সৎকর্মশীলকে এত অধিক দান করেন যে আত্মা পরিতৃপ্ত না হয়ে উপায় থাকে না। মৃত্যুর পরেও সম্মানিত হওয়া, অচেনা মানুষের দোয়া পাওয়া, কোনো এক পথিকের চোখের পানি ঝরা—এসবও জাগতিক সৌভাগ্যের অংশ, যার হিস্যা জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
হে আত্মা, খোদার অনুগ্রহ পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠো—যেমনটা লাভ করেছেন আমাদের প্রিয়ভাজনওসমানহাদি ভাই।
এমন এক জীবন গঠনে ব্রতী হও, যে জীবন হাদির জীবনের মতো— দুনিয়ায় সম্মানিত এবং আখেরাতে পুরস্কৃত। নিশ্চয়ই শরীফওসমানহাদিকে স্রষ্টা শহিদের মর্যাদায় কবুল করেছেন। জান্নাতেরফুলবাগানেদেশপ্রেমিকহাদির সঙ্গে আল্লাহরসাক্ষাৎ হবে— এই আশাই মনে গহীনে শান্তি দেয়। হাদির যত ভুল-ত্রুটি ছিল, মানুষের দোয়া ও ভালোবাসার বদৌলতে সেগুলো তিনি মুছে দিয়েছেন। আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান, ইহকাল ও পরকালে তার আর কোনো পাথেয় লাগে না। স্বয়ং খোদাই যার রাহবার, তাকে জান্নাতেরফুলবাগিচায় কল্পনায় আঁকতে মন চায়।
বিদায়, Osman Hadi – ওসমানহাদি—
বাংলাদেশের গল্পে পরিণত হওয়া এক মহাপুরুষ।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।







