এম এ হোসেন, রংপুর: রংপুরের মেডিকেল মোড় থেকে তারাগঞ্জ, সড়কের এ অংশটুকুতে অনেকটাই সাবধানে চলার চেষ্টা করে স্থানীয় মানুষেরা। তবুও চালকের বেপরোয়া গতি নিভিয়ে দিচ্ছে একের পর এক জীবন প্রদীপ। যানবাহনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। বাড়ছে সাধারণ মানুষের কান্না। প্রিয়তমা স্ত্রীর সামনে মুহূর্তেই স্বামী হয়ে যাচ্ছে লাশ, মায়ের সামনে সন্তান হয়ে যাচ্ছে শুধুই মাংসপিণ্ড। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ঘটছে ৮.৯৫ শতাংশ আর প্রাণহানি ৮.৮৬ শতাংশ। স্থানীয় মানুষেরা জানান, রংপুরে যত দুর্ঘটনা ঘটে তার অধিকাংশই মেডিকেল মোড় থেকে তারাগঞ্জ পর্যন্ত সড়কেই বেশি ঘটে। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন, অতিরিক্ত গতিসীমা, ওভারটেক, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, গাড়ি চালানোর সময় মাদক সেবন, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো, সচেতনতার অভাব, অন্যমনস্ক হয়ে গাড়ি চালানো, যান্ত্রিক ত্রুটিসম্পন্ন গাড়ি রাস্তায় নামানো, অপ্রশস্ত রাস্তা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা ইত্যাদি। বাংলাদেশ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে আর আহত হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। প্রতিবছর এই সংখ্যা কমছে না বরং বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকিং-কে দায়ী করা হয়। পুলিশ রিপোর্টেও বলা হয় অতিরিক্ত গতি ও চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এছাড়া গাড়ি দ্রুতবেগে ব্রিজে ওঠার সময় দুর্ঘটনা ঘটার ইতিহাসও রয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ আইন অমান্য করা। এক জরিপে দেখা যায় ৯১ শতাংশ চালক জেব্রা ক্রসিংয়ে অবস্থানরত পথচারীদের পাত্তা দেয় না। পাশাপাশি ৮৫ ভাগ পথচারী নিয়ম ভেঙে রাস্তা পারাপার হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২১ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। এসব পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা রংপুরেও সমান তালে বেড়ে চলছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর মেডিকেল মোড়, সিও বাজার, উত্তম হাসনা বাজার, হাজীরহাট, পাগলাপীর বাজার, শলেয়াশাহ বাজার, ইকরচালী, তারাগঞ্জ বাজারসহ কমবেশি প্রায় সব বাজারেই প্রবেশ মুখে নেই কোনও রোড ডিভাইডার, গুরুত্বপূর্ণ সাইন কিংবা গতিরোধক। স্থানীয় কিছু কিছু মানুষেরাও অসচেতন হয়ে বিকেল হলেই বাজার সাজিয়ে বসে পড়েন রাস্তার কোল ঘেঁষেই। ফলে সংকুচিত হয়ে পড়ছে সড়ক। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, প্রয়োজনবোধে আইন কঠোর করতে হবে। গাড়ির মালিকদেরও বাধ্য করতে হবে যাতে তারা কোনো অবস্থাতেই ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিনের গাড়ি রাস্তায় বের করতে না পারেন। মান্ধাতার আমলের রংচটা, টোস খাওয়া দানবসদৃশ গাড়ির পরিবর্তে সুদৃশ্য ও পরীক্ষিত গাড়ি রাস্তায় নামাতে হবে। আরোহীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ব গাড়ির মালিকদেরও। ড্রাইভাররাও যেন বিরামহীনভাবে দীর্ঘ সময় গাড়ি না চালান সেই ব্যবস্থাও মালিকদের করতে হবে। আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে বলে তারা মনে করেন। এদিকে অদক্ষ চালক, ফিটনেসহীন গাড়ি আর সাধারণ মানুষের অসচেতনতার ফলে রংপুরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ঠেকানো যাচ্ছে না। সড়কে সুষ্ঠু ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবস্থা করাসহ সাধারণ মানুষের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছে পুলিশ।








