রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধি: রংপুরে ৪৫ নদীর নাব্যতা সংকটে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা। রংপুর বিভাগের আট জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, ইছামতি, টেপা, করতোয়া, মহানন্দা, আখিরা,কাটাখালী, আলাই, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট ও ধরলাসহ অন্তত ৪৫টি নদ-নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। এর প্রভাব পড়েছে নদীর ওপর নির্ভরশীল বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকায়। হাজারও জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। পানি না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন নদীর ৫ শতাধিক ঘাট। ফলে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা মাঝিরাও বেকার হয়ে পড়েছে। নৌপথ বন্ধ থাকায় যাতায়াতে তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছে বাসিন্দারা। এসব এলাকায় পণ্য পরিবহণের খরচও বেড়ে গেছে। কর্মহীন মাঝি ও জেলেরা জীবিকার তাগিদে পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ ছুটছেন শহরে, কেউবা রিক্সা-ভ্যান চালিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টরা বলেন, উজানের একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার, নদীতে পলি জমা ও ড্রেজিং না করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছরই ডিসেম্বর থেকে উত্তরের নদনদীতে নাব্যতা কমতে থাকে। এমনকি তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টেও চর জেগে উঠে। যতদিন বৃষ্টির দেখা নেই, ততদিন এ অবস্থা বিরাজ করে। এপ্রিল-মে মাসে বৃষ্টি হলে নদ-নদীগুলোতে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে আসে। রংপুরে তিস্তা ঘিরে রয়েছে গংগাচড়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন, গাইবান্ধর সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার উপর দিয়ে তিস্তা নদী প্রবাহিত হয়েছে। এসব এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল। গংগাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের নজের উদ্দিন বলেন, ইউনিয়নে নদীর প্রায় ৯০ ভাগ চরে পরিণত হয়েছে। যারা আগে নদীতে নৌকা চালিয়ে এবং মাছ ধরে সংসার চালাতেন, তারা এখন জীবিকা নিয়ে চরম সমস্যায় পড়েছে। নদীতে পানি সংকটে মাছ নেই। নৌকাও চালানো যাচ্ছে না। অনেকে পুরোনো পেশা বদল করে রিক্সা-ভ্যান চালাচ্ছেন। কেউ কেউ কাজের সন্ধানে শহরে চলে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, নদীর বুকে চর জেগে উঠার আগে যেসব নৌপথ ছিল, সেগুলোও বন্ধ হয়ে গেছে। ক গ্রামের মানুষকে অন্য গ্রামে যেতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল হেঁটে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে ২৫ নদনদীতে ঘাট আছে ২০০টি। নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে-ধরলা, তিস্তা, সতী, রতনাই, স্বর্ণামতী, বটেশ্বরী, সিংগীমারী, বুড়ি তিস্তা মালদাহা, দুধকুমার ও গিদারী। প্রতিবছর এসব ঘাট ইজারা দেওয়া হয়। এখান থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব স্থানীয় উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হয়। প্রতিটি ঘাটে মাঝি আছেন ৬ থেকে ১৫ জন। এখন নদীতে পানি নেই। ঘাটগুলোর গুরুত্ব কমে গেছে। হাতে গোনা কয়েকটি ঘাট চালু আছে। বাকিগুলো বন্ধ থাকায় মাঝিরা কর্মহীন। এ কারণে প্রায় ২ হাজার পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছে। এসব এলাকার ব্যবসায়ীরা বলেন, তারা কম খরচে নৌকায় পণ্য পরিবহণ করতে পারতেন। নৌপথ বন্ধ থাকায় বেশি খরচ করে ঘোড়ার গাড়ি অথবা অন্য উপায়ে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে। এতে চরাঞ্চলে পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে জেলে পরিবার আছে ২৫ হাজার। গড়ে প্রত্যেক পরিবারে সদস্য আছে পাঁচ থেকে সাতজন। নদ-নদীতে পানি না থাকায় মাছ নেই। জেলেরা কর্মহীন। অনেকে পেশা ছেড়ে দিনমজুরের কাজ করছেন। রাজারহাট গতিয়াশ্যাম ঘাটের মাঝি মকবুল হোসেন বলেন, নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চালানো যাচ্ছে না। ঘাট বন্ধ। এ ঘাটের ১০ জন মাঝির অনেকেই শহরে কাজ করছেন। কাঠালবাড়ীর ধরলার কাউয়াহাগা ঘাটের মাঝি আলিম উদ্দিন বলেন, নদীতে চর জেগে উঠায় এখন নৌকা চালাতে হচ্ছে অনেক নদীপথ ঘুরে। এতে সময় বেশি লাগছে, ফলে ঘাটে লোকজন আসে না। আমাদের আয়ও কমে গেছে। উলিপুর উপজেলার হাতিয়া দাসপাড়া গ্রামের জেলে রবিন চন্দ্র বলেন, নদী এখন মরে গেছে। মাছও পাওয়া যায় না। বড় কষ্টে আছি। দিনাজপুরের ইছামতি নদীর অস্তিত্ব প্রায় হারিয়ে গেছে। এ জেলার টাঙ্গন, শুক, কলিগ, নাগর নদীও শুকিয়ে যাচ্ছে। এসব নদীতে ক্রমাগত চর জেগে উঠছে। চরে স্থানীয়রা চাষাবাদ করছেন। পঞ্চগড়ের করতোয়া ও মহানন্দার নাব্যতা কমে গেছে। করতোয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় চর জেগে উঠেছে। দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ শতাধিক ঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে প্রায় দুই হাজার মাঝি পরিবার ও প্রায় চার হাজার জেলে পরিবার সংকটে পড়েছে। কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুক্তাদির খান বলেন, কয়েক বছর ধরে জেলেরা কাজের সংকটে ভুগছেন। পলি জমায় শুষ্ক মৌসুমে নদনদীতে পানি থাকছে না। জেলেরা ছোটবেলা থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরতে অভ্যস্ত। হঠাৎ পেশা বদল করেও তারা ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছেন না। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসিঘাটের শ্রমিক আব্দুল আউয়াল বলেন নদীর নাব্যতা সংকটে প্রায় সকল নৌঘাট বন্ধ হয়েছে গেছে। নৌকার মাঝি ও ঘাটের শ্রমিকগণ অনেক কষ্টে জীবন যাপন করছেন। দীর্ঘদিন ফেরি চলাচল বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের ৯ এপ্রিল গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌ রুটে লঞ্চ চলাচলের উদ্বোধন করা হলেও নদীর নাব্যতা তা বন্ধ রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড উত্তরাঞ্চল রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী মাবুবুর রহমান বলেন, নদ নদীগুলো নিয়ে সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনা আছে। ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার, পলি জমা ও ড্রেজিং না করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এসব নদ নদীতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চরের পলি অপসারণর করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, জরিপ ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ চলছে। এ বিষয়ে রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ভারত থেকে যে পরিমাণ পানি বাংলাদেশে আসে, এর মধ্যে ৭০ ভাগ আসে রংপুর বিভাগের নদ নদীগুলো দিয়ে। বর্তমানে এসব নদ নদীর অবস্থা খুবই করুণ। বিলুপ্তির পথে শতাধিক নদ নদী। নদীগুলো হারিয়ে গেলে কৃষি অর্থনীতি ও জীববৈচির্ত্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ অঞ্চলের মানুষ চরম সংকটে পড়বে। নদীগুলো বাঁচাতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অপ্রতিমের হত্যার বিচার দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
কুমিল্লা: অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীরা। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লার...








