প্রথমে অভাবগ্রস্ত ও নেশাখোরদের কৌশলে বাসায় নিয়ে অজ্ঞান করা হতো। তারপর শরীর থেকে রক্ত বের করে দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় প্রতিব্যাগ বিক্রি করা হতো। অবৈধ এসব রক্তের মূল ক্রেতা ছিল রাজধানীর বিভিন্ন নামধারী ব্লাড ব্যাংক। এসব ব্লাড ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে পান্থপথের আলিফ ব্লাড ব্যাংক, কলেজ গেটের বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংক ও গ্রীন রোডের নিরাপদ হাসপাতালের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি সাভার থানা পুলিশ সূত্রে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে।
সাভার থানা পুলিশ জানায়, একটি চক্র অবৈধভাবে রক্ত সংগ্রহ করে বিক্রি করছে, এমন অভিযোগে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়। এরপর গত বুধবার গভীর রাতে সাভারের থানা রোডের ওয়েল ফুডের ২য় তলায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল জলিল (৫৬) নামে চক্রের মূলহোতাকে আটক করা হয়।
জানতে চাইলে সাভার মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স) নয়ন কারকুন বলেন, গ্রেপ্তার আবদুল জলিল সাভারের থানা রোডের ওয়েল ফুডের ২য় তলায় ভাড়া থেকে প্রায় এক বছর ধরে এভাবে রক্ত সংগ্রহ করে বিক্রি করছিলেন। তিনি এক সময় রাজধানীর কলেজ গেটের বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংকে কাজ করতেন। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নেশাগ্রস্তদের শরীর থেকে রক্ত সংগ্রহ করে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেন তিনি।
জিজ্ঞাসাবাদে জলিল জানান, বিভিন্ন সময়ে অভাবগ্রস্ত নেশাখোরদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে তিনি কৌশলে বাসায় ডেকে নিতেন। এরপর মদ ও অনান্য তরল জাতীয় নেশার সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ভুক্তভোগীদের অজ্ঞান করে তাদের রক্ত সংগ্রহ করা হতো। গ্রেপ্তারের সময় তার সংগ্রহে থাকা ১০ ব্যাগ রক্ত ও রক্ত সংগ্রহের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
র্যাব সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় আলিফ ডায়াগনোসিস নামের ব্লাড ব্যাংকে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের মালিককে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়া ভেজাল রক্ত সংগ্রহ ও বাজারজাত করার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করা হয়। এরা হলেন- নুরুন্নাহার (৩৫), শফিকুল ইসলাম (৪৪) ও জাহাঙ্গীর (৩৫)।
র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. হেলাল উদ্দিন জানান, নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন আইন অনুযায়ী ব্লাড ব্যাংকগুলোতে রক্ত পরিসঞ্চালন বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, ল্যাব সহকারী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, রক্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ প্রণালী আধুনিক ও উন্নত থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি এসব নিয়ম তো মানেইনি বরং অনিয়ম করেছে।
পরের বছর ২৮ অক্টোবর কলেজগেটের বাংলাদেশ ব্লাড ব্যাংক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় ব্লাড ব্যাংকটির ব্যবস্থাপক কিবরিয়া মিয়াজি (৪৭), হাফিজুর রহমান (৩৮) ও ফজলে রাব্বি মিয়াকে (২৬)। সিলগালা করা হয় প্রতিষ্ঠানটি।
র্যাব জানায়, ব্লাড ব্যাংকটি থেকে বিপুল পরিমাণ অপরীক্ষিত ও ভেজালমিশ্রিত রক্ত জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন না নিয়েই অবৈধভাবে অধিক মুনাফার আশায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই পেশাদার, রোগে আক্রান্ত ও মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে আসছে। এছাড়া ব্লাড ব্যাংকটি মাদকাসক্তদের কাছ থেকে সংগৃহীত রক্তে তারা তরল স্যালাইন মিশিয়ে এক ব্যাগ রক্তকে দুতিন ব্যাগ বানিয়ে বিক্রি করছিলেন।
সূত্রমতে, কেবল রাজধানী ঢাকাতেই অবৈধ রক্তের কারবারে জড়িত রয়েছে এমন প্রায় ১৮১টি ব্লাডব্যাংক। রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংকেই স্কিনিং ও ক্রস ম্যাচিং ছাড়াই অবাধে চলছে অনিরাপদ রক্তের কেনাবেচা। এগুলোর ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণও নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার নিয়মনীতির উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একশ্রেণির কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই এসব রক্তকেন্দ্র নীতিমালা অমান্য করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র মতে, জনবল সংকটের কারণে তারা ব্লাড ব্যাংকগুলোতে তদারকি করতে পারে না। প্রধান কার্যালয়ে জনবল থাকলেও তা চাহিদার চেয়ে কম। জেলা অফিসগুলোতে জনবলের সংখ্যা খুবই কম। যে কারণে তারা তদারকি করতে পারছে না। আবার অনুমোদন ছাড়া যেসব ব্লাড ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলো দেখা তাদের বিষয় নয়। সেগুলো দেখছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। তারা মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া র্যাবের আওতায় একটি মেডিক্যাল ইউনিট গঠন করা হয়েছে। তারা গোপন সূত্রে খবর সংগ্রহ করে বেআইনি ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালায়। তবে খুবই সীমিত আকারে। দেশের রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রগুলোর ওপর দুবছর ধরে গবেষণা চালিয়েছে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ। তাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই চলছে শতকরা ৮১ ভাগ রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র। সংস্থাটি বলছে, রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে রক্তদাতা নির্বাচন ও উপযোগিতা নিশ্চিতকরণ, রক্ত সংগ্রহ ও পরীক্ষা, দাতা-গ্রহীতা মেলানো, পরিসঞ্চালন ও রক্ত মজুদ করা, কর্মী প্রশিক্ষণ, শরীর ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত করণীয় উপকরণ ব্যবহার এবং তার পরিচর্যা— এসব বিষয়ের ওপর লক্ষ্য রাখার কথা রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন কেন্দ্রগুলোতে এবং কয়েকটি সরকারি কেন্দ্রেও এ নির্দেশনার কপি পাওয়া যায়নি। এসব কেন্দ্রে শুধু কর্মীরা নন, কেন্দ্রগুলোর প্রধানরাও রক্ত পরিসঞ্চালনবিষয়ক বিভিন্ন নীতিমালা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। শতকরা ৪৭ ভাগ কেন্দ্রে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই রক্ত পরিসঞ্চালনের কাজ চলে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে, রাজধানীর অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেডিক্যাল অফিসার নেই। এসব ব্লাড ব্যাংকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত পাঁচটি ঘাতক ব্যাধির পরীক্ষা করা হয় না। এছাড়া তারা স্টেরিলিটি (সংক্রমণ রোধকারী ব্যবস্থা) মেনে চলে না। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ব্লাড ট্রান্সমিশনের সংজ্ঞা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিদের্শ মতে, নিরাপদ রক্তের জন্য একজন রক্তদাতাকে কমপক্ষে পাঁচটি রক্তবাহিত ঘাতক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে হয়। এগুলো হলো হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি এইচআইভি/এইডস, ম্যালোরিয়া ও সিফিলিস। তারা রক্তদাতা নির্বাচনের পূর্বশর্তও মানে না। নেই শীতাতাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নেই পোস্ট ডোনেশন রুম, পরিবেশও নোংরা। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সর্বনিম্ন ১০০ স্কয়ার মিটার এবং রক্তের উপাদান তৈরির জন্য অতিরিক্ত ৫০ স্কয়ার মিটার স্থানের সংস্থান থাকতে হলেও মনিটরিং কামিটির গাফিলতির কারণে ছোট্ট পরিসরেই গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ ব্লাড ব্যাংক। ডোনার ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্লাড ব্যাংক না থাকার পরও জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে ডোনারদের কাছ থেকে রক্ত নিয়ে সাধারণ ফ্রিজে সংরক্ষণ করছে ক্লিনিকগুলো। পরে চড়া মূল্যে বিক্রি করে এসব রক্তই রোগীদের শরীরে দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও প্রশাসনিক কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
জানতে চাইলে ঢাকা ব্লাড ডোনারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. কায়েস নয়া শতাব্দীকে বলেন, ঢাকা ব্লাড ডোনারস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, অরণ্যে তারুণ্য, স্বেচ্ছাব্রতী, উজ্জীবক ফোরামসহ চারটি সংগঠন রোগীদের জরুরি প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় রক্ত দান করে। আর সেই রক্ত নিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ব্যবসা করছে। রাজধানীর ৮০ শতাংশ ক্লিনিক লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে চলছে। এসব ক্লিনিকের কোনটিরই ব্লাড ব্যাংক না থাকলেও তারা অবৈধভাবে ফ্রিজে রক্ত সংরক্ষণ করছে। তারা রোগীদের আত্মীয়-স্বজনকে চাপাচাপি করে ডোনার সংগ্রহ করে। ডোনারদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে, ক্রস ম্যাচ করে, এরপর রক্ত আর দরকার নেই বলে ব্লাড ব্যাগ ফ্রিজে রেখে দেয়। পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে তা অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেয়। হাসপাতালে রক্ত সংগ্রহ, ক্রস ম্যাচ এবং রক্ত বিক্রি অব্যাহত থাকলেও এ ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না প্রশাসন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সামিউল ইসলাম বলেন, ক্লিনিক ও ব্লাড ব্যাংকগুলো কীভাবে চলছে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও জেলার সিভিল সার্জনদের বলা হয়েছে। অবৈধভাবে চলতে থাকা ক্লিনিকসহ বৈধভাবে চলমান কোনো ক্লিনিকও যদি ডোনারদের রক্ত নিয়ে ব্যবসা করে তবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলেছি।নয়া শতাব্দী







