দক্ষিণ বাংলার বরগুনা জেলায় অবস্থিত আমতলী সরকারি কলেজ নিজ ঐতিহ্য ও একাডেমিক ফলাফলের জন্য এক সময় সমগ্র বাংলাদেশে মাথা উচু করে দাঁিড়য়েছিল । ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি এক সময় শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠানের একটি ছিল। জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল প্রতিষ্ঠানটির । বরগুনা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থী ভর্তি হতো প্রতিষ্ঠানটিতে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল কলেজটি। আজ শিক্ষক সংকটে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটির সুনাম বিলীন হওয়ার পথে। ২০১৬খ্রিস্টাব্দে সরকারিকরণের পর কলেজটিতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সংকট দেখা দেয়। কারণ কলেজটিতে যথাযথভাবে পদ সৃজন না করেই সরকারিকরণ করা হয়েছিল। এই কলেজটিতে একই সাথে উচ্চ মাধ্যমিক, ¯œাতক ( ডিগ্রী), বিএম শাখা, উম্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম চলমান রয়েছে । কলেজটিতে মোট ২৪ টি বিষয়ে পড়ানো হয়। মাত্র ৩১জন শিক্ষক ও ২ জন প্রদর্শকের পদ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। তম্মধ্যে প্রায় সব সময়ই দুচারটি পদ খালি থাকে। কলেজটিতে মাধ্যমিক থেকে ¯œাতক পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে বাংলা বিষয় থাকলেও এ বিষয়ের কোন স্থায়ী শিক্ষক পদ না থাকায় কোন শিক্ষক পদায়ন হচ্ছে না। ফলে বাংলা বিষয়ে কলেজটিতে শিক্ষকহীন অবস্থা থাকায় কখনো পদটি শূন্য থাকে আবার কখনো খন্ডকালীন শিক্ষক ক্লাস নেন। আইসিটি ও ইংরেজির একজন করে শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন কলেজটিতে, যাদের প্রত্যেকের ওপর কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব। ইংরেজিতে দুটি পদ থাকলে একটি পদ বর্তমানে শূন্য রয়েছে। একই অবস্থা রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিসহ কয়েকটি বিষয়ের, সেখানে একজন শিক্ষককে পড়ানোর দায়িত্ব নিতে হয় হাজার বা ততোধিক শিক্ষার্থীর। কলেজটিতে অধিকাংশ বিষয়ে মাত্র একটি প্রভাষকের পদ রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শুধু সহকারী অধ্যাপকের একটি পদ রয়েছে, অন্য কোন পদ নেই। নিয়ম অনুযায়ী এ ধরণের প্রতিষ্ঠানে প্রতি বিষয়ে কমপক্ষে ৪ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বিধি অনুসারে পদ সৃজন হয়নি কলেজটিতে। পদ সৃজনের সরকারি কোন উদ্যোগ না থাকায় দিন দিন একডেমিক কার্যক্রমে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে কলেজটি। একইভাবে কর্মচারী সংকটও রয়েছে কলেজটিতে। রয়েছে ভবন ও শ্রেণিকক্ষ সংকটও। এমন চিত্র দেশের অধিকাংশ জাতীয়করণকৃত কলেজসমূহে। দেশে উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থী ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার। মাত্র ৫ থেকে ৬ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে । বাকীদের একটি অংশ বেসরকারি বিশ^বিদ্যায়ে পড়লেও অধিকাংশ জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি বা বেসরকারি কলেজে পড়াশোনা করে। জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষর্থী প্রায় ২৫ লাখ। অধিকাংশ কলেজেই শিক্ষক সংকট থাকায় ২৫ লাখ শিক্ষার্থী মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যেখানে বিশ^ব্যাপী স্বীকৃত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সাধারণ অনুপাত উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে গড়ে ১:২০ । ওইসিডিভুক্ত দেশসমূহে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত সাধারণ মানের চেয়েও আরো ভালো, অর্থাৎ গড়ে ১:১৪ বা ১:১৬।কিšদ উন্নয়নশীল দেশসমূহে এই হার ১:৪০ কে মানদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হার অনেক বেশি। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩৪, মাধ্যমিকে ১:৪২ থেকে ১:৫৩ এবং মাদ্রাসায় এই হার ১:৮৪। প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতা আরোও ভয়ানক। আমতলী সরকারি কলেজকে উদাহরণ হিসেবে ধরলে কঠিন সত্য এক বাস্তবতা ফুটে উঠবে। এখানে মোট শিক্ষাথীর সংখ্যা প্রায় ৪০০০ এর মতো এবং শিক্ষক মাত্র ৩০ জন। অথাৎ প্রতি শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১৩৩ জন। এমন বাস্তবতা নিয়েই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার গুনগত মান প্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রথমে শিক্ষক সংকট দূর করতে হবে।শিক্ষক সংকট সমাধানের জন্য পদসৃজন খুবই জরুরী। নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে পুরাতন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও আধুনিক শিক্ষাদানের জন্য যোগ্য করে তোলতে হবে। শিক্ষক সংকট সমাধান হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আবাসন ও শ্রেণিকক্ষ সংকট সমাধান করতে হবে। নতুন সরকারের কাছে সবার প্রত্যাশা হবে,শিক্ষক সংকট সমাধানের জন্য বিশেষত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে পদসৃজনের উদ্যোগ গ্রহণ করে জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের ২৫ লাখ এবং মাধ্যমিক স্তরের কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। আশা করি, শিক্ষা বান্ধব মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার স্বপ্নবাজ শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে দ্রæত বাস্তবমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।
লেখক,মো: মহিউদ্দিন শিক্ষক, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা), আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা। সম্পাদক, মাসিক ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এবং অধুনালুপ্ত অনলাইন পত্রিকা-৭১হবংি২৪.পড়স ।







