***********************************
প্রায়োরিটি (Priority) মানে অগ্রাধিকার বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। “শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ আর এই মেরুদণ্ডই যদি ঠিক না থাকে তবে কোন কিছুই ঠিক থাকে না। পৃথিবীর সকল ধর্মই শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফ শুরুই হয়েছে ইকরা মানে পড় দিয়ে। পরিবার থেকে রাস্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র শিক্ষা যদি গুরুত্ব না পায় তাহলে জাতি পিছনের দিকে হাঁটবে। আমাদের দেশে শুধু এসএসসি আর এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে শিক্ষার গুরুত্ব বেড়ে যায়। রেজাল্ট দেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষককে ফেসবুকে তুলোধুনো করা হয়।
আমার ছোটবেলা কেটেছে অজগ্রামে। ৫- ৭ কিঃ মিঃ পাঁয়ে হেঁটে শীতকালে বালি আর বর্ষায় কাঁদা মাড়িয়ে স্কুল যেতে হতো। কোন কারণে একদিন স্কুল না গেলে বাবার মাইর, আর সন্ধ্যার পর কাছারি ঘরে গৃহশিক্ষক মহোদয় পড়াতে বসলেই প্রথম টপিক ভাই বোনদের কেউ একজন অথবা বাবা এসে বলতো, স্যার ও আজ স্কুলে যায় নাই। জোড়া বেতের ব্যবস্থা আগ থেকেই থাকতো নতুবা বাবা নিজস্ব বাঁশ মুড়া থেকে যত্ন করে ঝিংলা বা কন্চি কেটে বেত বানিয়ে স্যারের হাতে তুলো দিতো।
বাবার প্রায়োরিটি ছিলো শিক্ষা। বাবাকে কঠিন হতে হয়েছে কী কারণে তা পরে বুঝলাম। কারণ তখন আমাদের চারপাশে ২-১জন ছাড়া গ্রামের আর কেউ পড়াশোনা করতো না। পদার্থ বিজ্ঞানের মতে কোন কিছুর পরিবর্তনর জন্য বলপ্রয়োগ করতে হয়, বাবা সেটি বুঝতেন। তবে শুধু যে কঠোর ছিলেন তা নয়, অনেক কেয়ারও করতেন। পড়াশোনার কোন উপকরণ লাগবে বলতে দেরি আনতে দেরি করতেন না।
বেশীরভাগ আমাদের গৃহশিক্ষক ছিলেন লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের ছাএ বা আমাদের বাড়ি থেকে একটু দূরে রসুলগন্জ হাইস্কুলের শিক্ষক। শিক্ষকদের জন্য আলাদা লেপ-তোশক এমনকি চলাচলের জন্য সাইকেলের ব্যবস্থা করে রাখতেন। আমরা অনেক ভাই-বোন একসাথে পড়াশোনা করতাম, বোন-রা বড়। মাঝে মাঝে কিছু মানুষ বলতো মাস্টারের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে মনেহয় তাই মাস্টারকে এত যত্ন করে। বাবা উত্তরে বলতেন মাস্টারকে জামাই আদর না করলে পোলাপাইন মানুষ হবে না। আমার মা ও একই রকম ছিলেন মাস্টারের জন্য মাছের বড় টুকরো আলাদা করে রাখতেন। যার ফলাফল হলো খুব বড় কিছু হতে পারি নাই তবে আমরা ৫ ভাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়শোনা শেষ করেছি এবং পরিবারের সবাই ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। কিছু মানুষ শিক্ষকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, তৃতীয় সারির নাগরিক ভাবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে জাতি কখনোই শিক্ষিত হবে না।
কথাগুলো বলার কারণ হলো গত ৫ই আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশৃঙ্খলা হচ্ছিল । তখন কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তে প্রশাসন থেকে দায়িত্ব পেলাম এবং ২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলাম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর দুর্নীতি , অব্যবস্থাপনা, গ্রুপিং, শিক্ষক রাজনীতির কথা নাই বললাম। শুধু শিক্ষার কথাই যদি বলি, প্রতি ২ মাস পর পর অভিভাবক সমাবেশ করে প্রত্যেক অভিভাবক, শিক্ষক এবং ছাএ-ছাএীদের একসাথে মুখোমুখি করে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে যে চিএ পেলাম তা একরকম ভয়াবহ। অনেক অভিভাবক জানেই না সন্তান কোন ক্লাসে পড়ে!!!!! পাশ করেছে না ফেল করেছে তা নিয়ে কোন মাথাব্যথা নাই। অর্থাৎ তার প্রায়োরিটির মধ্যে শিক্ষা নাই।
অনেক অভিভাবক শুধুমাত্র মেয়ে স্কুলে পাঠায় বিয়ে পর্যন্ত একটু আসাযাওয়া করুক তাহলে ভালো জায়গায় বিয়ে হবে। অনেক ছেলেরা মধ্যপ্রাচ্য চলে যাবে আঠারো বছরের অপেক্ষায় তাই স্কুল যাচ্ছে। সৌদি প্রবাসী ১ জন অভিভাবকে তাৎক্ষণিক ফোন দিয়ে জানালাম আপনার মেয়ে ৬ সাবজেক্ট ফেল করেছে। শুনে সে তো অবাক, প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা করে বাড়িতে পাঠায়, জানেই না বাচ্চা পড়াশোনা করে না। ২-১ জন চোখের পানি ফেলে বললো বাচ্চা কথা শুনে না। কানে কানে ১ জন এসে বললো বেশিকিছু বললে গায়ের দিকে তেড়ে আসে। গ্রামে ২০-২৫ % অভিভাবক সচেতন, তারা শিক্ষাকে প্রায়োরিটি দেন। খোঁজখবর রাখেন, স্কুলে যান, প্রাইভেট পড়ান।
শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে কথা বলার দুঃসাহস আমি দেখাবো না। তবে উপজেলায় যখন চাকরি করতাম তখন দেখতাম শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা হতো বেশিরভাগ শুক্রবার দিন। যে ডিপার্টমেন্ট নিয়োগ নিয়ে কাজ করতেন তাদের অফিসের সবাই ফুরফুরে মেজাজে। শুক্রবার মানে ঈদের দিন। পরবর্তীতে এমনও জানতে পেরেছি পরীক্ষায় যে ৮ নাম্বার হয়েছে তার চাকরি হয়েছে। যে প্রথম হয়েছে তার চাকরি হয় নাই। এদের কারো প্রায়োরিটিতে শিক্ষ ছিলো না, ছিলো ধান্ধা । বিভিন্ন রকম ইকুয়েশন এখানে কাজ করতো । তবু্ও আমাদের অনেক ভালো শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও মাথা উঁচু করে গর্বের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক যতীন সরকার স্যারকে ইত্যাদির উপস্থাপন হানিফ সংকেত প্রশ্ন করেন এখনকার শিক্ষক এবং আগের শিক্ষকদের মধ্যে পার্থক্য কী? উনি উত্তরে বললেন, আগের শিক্ষকগণ পড়তেন এবং পড়াতেন, এখনকার বেশিরভাগ শিক্ষকরা শুধু পড়ান।
ক্লাস রুটিন পর্যালোচনা করে দেখা গেল এনটিআরসি থেকে নিয়োগ পাওয়া ইংরেজিতে অনার্স, মাস্টার্স করা শিক্ষক বাংলা পড়ায়। কারণ জানতে চাইলে, বললেন আগে থেকে যারা পড়াচ্ছেন তারা অংক, ইংরেজি, সহ গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট গুলো ছাড়তে চাচ্ছেন না। কারণ এর সাথে প্রাইভেট জড়িত। এরকম হাজারো সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষা ব্যবস্থাপনা।
যে দেশে সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে দলকানাকে বেশি বিবেচনায় রাখা হয় সে দেশে শিক্ষা অন্তত প্রায়োরিটিতে নাই এটি আমি নিশ্চিত। শুধু বাজেট বড় হলেই মানসম্মত শিক্ষা হয় না। তবুও আমাদের ছেলেরা দেশে বিদেশে পড়াশোনায় ভালো করছে। কিন্তু এটি দেশের সার্বিক চিএ নয়।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের এক বক্তব্যে উনি বললেন। কোন বিল্ডিং এর সিঁড়ি যদি চওড়া হয় বুঝতে হবে বাড়িওয়ালার মন বড়। শহরের চলাচলের রাস্তা যদি চওড়া হয় বুঝতে হবে শহরবাসীর মন বড়। কোন দেশের শিক্ষক এবং শিক্ষা ব্যবস্থা যদি ভালো থাকে বুঝতে হবে সে জাতির মন বড় এবং তারা তত সভ্য
দেশের হাওড় এবং চর এলাকার অসংখ্য শিশু এখনও স্কুলে যায় না। তাই সরকার, অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার সাথে জড়িত সবাই শিক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি দিতে হবে তাহলে দেশ পরিবর্তন হতে বাধ্য।
Post Views: 59
Related