একটি দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। আর সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল ও সমৃদ্ধ রাখেন যারা, তারা হলেন শিক্ষক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় সবচেয়ে অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার অংশটির নাম এখন ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার’। যেখানে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত বিরতিতে পদোন্নতি পেয়ে কর্মস্পৃহা বজায় রাখছেন, সেখানে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জীবন কাটছে চরম পদোন্নতি জট আর হতাশার অতল গহ্বরে।
সম্প্রতি বিভিন্ন ক্যাডার সার্ভিসের চিত্র বিশ্লেষণ করলে এই বৈষম্যের এক নির্মম রূপ ফুটে ওঠে। বিসিএস প্রশাসন, ট্যাক্স, অডিটসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার সার্ভিসের ৩৮তম ব্যাচের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই চাকরি জীবনের ৫ বছর পূর্তিতে কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি লাভ করেছেন। এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাগণও সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে পদোন্নতি পেয়ে যান। অথচ, শিক্ষা ক্যাডারের চিত্রটি এর সম্পূর্ণ উল্টো এবং বেদনাদায়ক।
যেখানে অন্যান্য ক্যাডারে ৩৮তম ব্যাচের তরুণ কর্মকর্তারা পদোন্নতির আনন্দ উদযাপন করছেন, সেখানে শিক্ষা ক্যাডারে ৩৮তম ব্যাচ তো বহু দূরের কথা; ৩৬তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও আজ অব্দি পদোন্নতির এক অনিশ্চিত স্বপ্ন বুকে নিয়ে চরম অসহায়ত্বে দিন গুনছেন।
পদোন্নতির এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল একটি প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটি শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬, ৩৭ এবং ৩৮তম ব্যাচের হাজার হাজার কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে এক অন্ধকার নামিয়ে এনেছে।
আর্থিক সংকট: বছরের পর বছর একই পদে আটকে থাকায় তারা যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য বেতন স্কেল থেকে, তেমনি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির এই বাজারে পরিবার নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়া: সমসাময়িক অন্য ক্যাডারের বন্ধুরা যখন নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে চলে যাচ্ছেন, তখন একই যোগ্যতা নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা জুনিয়র হিসেবে পড়ে থাকছেন। এতে তাদের পেশাগত ও সামাজিক মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
মানসিক অবসাদ: পদোন্নতির এই দীর্ঘস্থায়ী জট কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে, যা প্রকারান্তরে ক্লাসরুমের শিক্ষাদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একজন শিক্ষক বা শিক্ষা কর্মকর্তা যখন নিজেই অর্থকষ্ট, বৈষম্য আর পদগত মর্যাদাহীনতার মানসিক যন্ত্রণায় ভুগবেন, তখন তাঁর কাছ থেকে মানসম্মত শিক্ষা বা নতুন প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর হওয়া আশা করা এক প্রকার বিলাসিতা। শিক্ষার মান আর শিক্ষকের মর্যাদা একে অপরের পরিপূরক। শিক্ষকদের এভাবে বঞ্চিত রেখে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ কিংবা ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ প্রতিষ্ঠার স্লোগান কেবলই ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হবে।
শিক্ষা ও শিক্ষকের মান বাঁচাতে রাষ্ট্রকে এখনই ঘুম থেকে জাগতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দেয়াল ভেঙে, কোনো অজুহাত না দেখিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬, ৩৭ এবং ৩৮তম ব্যাচসহ সকল স্তরের যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ক্যাডারের এই ঐতিহাসিক দুর্ভাগ্য আর বৈষম্যের অবসান হোক—এটাই এখন সময়ের জোরালো দাবি।
মোঃ মহিউদ্দিন,
শিক্ষক ( বিসিএস সাধারণ শিক্ষা),
আমতলী সরকারি কলেজ, বরগুনা।








