কে সত্য, কে মিথ্যা জানিনা।
নিজের দ্বায়িত্বে নিজে যাচাই করে নিবেন।
মুজিব সেনা নিউজ : রাজনীতিতে মিথ্যা পরিচয় বা ক্রেডেনশিয়াল ব্যবহার করে ফায়দা লোটার প্রয়াস সর্বদা সর্বত্রই নিন্দিত। তেমন একটি কাজ বহুদিন ধরে করে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন সময়ে তার রাজনৈতিক পরিচয়কে উজ্জল ও বর্ণাঢ্য করার জন্য বলা হয় যে, তিনি ইডেন কলেজের ভিপি ছিলেন।মনজুর-এ-মাওলা সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় সংসদ ‘৯১ এলবাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল গ্রন্থ। তাতে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার
প্যাডে ২০.০৪.৯৪ইং স্বাক্ষরিত শেখ হাসিনার একটি বাণীও সন্নিবেশিত আছে। সেই এলবামে গোপালগঞ্জ-৩ আসনে নির্বাচিত সদস্য শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে,
‘১৯৬২ সালে যখন দেশে সংঘটিত হচ্ছিল ছাত্র আন্দোলন এবং স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন তখন তিনি রাজনীতিতে জড়িত হন। ১৯৬৫ সালে মেট্রিক পাস করে ইডেন গার্লস কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ছাত্র আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান মহিলা কলেজ ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রী সংসদের সহ-সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ৃ ১৯৭৩ সালে শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন।’
কিন্তু প্রকৃত তথ্য এবং সত্য হচ্ছে, শেখ হাসিনা কখনো ইডেন কলেজের ছাত্রী-ই ছিলেন না। তিনি পঁয়ষট্টি সালে এসএসসি পাস করে যে কলেজে পড়াশোনা করেন ১৯৬৪ সাল থেকে সে কলেজের নাম গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ। শেখ মুজিব সরকার কর্তৃক ১৯৭৩ সালে বদরুন্নেসা কলেজ নাম করণের আগ পর্যন্ত এটি সরকারী ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ-ই ছিল। ‘৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা ওই কলেজের ভিপি ছিলেন। সে সময় ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট সেকশনই ছিলো না। ওই বছর সরকারি ইন্টারমিডিয়েট গার্লস কলেজ ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদিকা নাজমা চৌধুরী এবং একমাত্র ভিপি পদ ছাড়া গোটা সংসদ ছিলো তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’ (মেনন গ্রুপ)-এর নিয়ন্ত্রণে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর তা ভুলে যাওয়ার কথা নয়। ইডেন কলেজের ভিপি পরিচয়টা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ গৌরবের। রাজনৈতিক গৌরব বৃদ্ধির জন্য কখনো ইডেন কলেজের ছাত্রী না থেকেও সে কলেজে ভিপি’র ভুয়া পরিচয় প্রদান কি কোনো নেতা-নেত্রীর জন্য অপরিহার্য? ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ভিপি’দের নামের তালিকা পরীক্ষা করলেও দেখা যাবে যে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কখনো ইডেন কলেজের ভিপি ছিলেন না।
আরো একটি প্রসঙ্গ এখানে এসে যায়। শেখ হাসিনা মেট্রিক পাস করেছেন ১৯৬৫ সালে। তার বিএ পাস করার কথা ১৯৬৯ সালে। তার সঙ্গী-সাথীরা তাই করেছেন। শেখ হাসিনা বিএ পাস করতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত লাগালেন কেন? এতে কি তার মেধার বিষয়টি ধরা পড়ে না? হয় তিনি চার বার ফেল করেছেন অথবা ফেল করার ভয়ে পরীক্ষা না দিয়ে পাসের জন্য ১৯৭৩ সালে তার পিতার আমলের ‘ঐতিহাসিক পরীক্ষার’ বছরের জন্য অপেক্ষা করেছেন। আমি নিয়মিত পরীক্ষার্থী ও পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের কথা বা সেই ‘ঐতিহাসিক’ বর্ষে পাস করা সকলের কথা বলছি না। কিন্তু অনিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে যারা (সকলে নয়) সে বছর ‘সহজ পাসের বন্দোবস্ত’ করেছেন বলে প্রচার আছে, ‘তাদের’ কথা বলছি। এমন প্রচারও ছিলো যে, সে বছর অনেক বাড়ির চেয়ার-টেবিলও নাকি চান্স নিয়েছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অশোভন কোনো উক্তি না করে একটি প্রশ্ন বোধহয় রাখা যায় যে, ‘আপনি আপনার অন্যান্য সহপাঠীদের মতো ১৯৬৯ সালে বিএ পাস করলেন না কেন?’
১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো কোনো ‘পাস’ কোর্স ছিলো না। অনার্সে কেউ ফেল করলে তাকে ‘পাস’ ডিগ্রি দিয়ে বিদায় করা হতো। তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএ পাস করেছেন বলা হয় কেন? ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত শত শত কলেজ ছিলো। কিন্তু ফরিদপুরের ‘ভাঙ্গা কলেজ’ বা অন্য কোন কলেজ থেকে পাস করা কোনো ছাত্র-ছাত্রীর কি কলেজের নাম না বলে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেছি’ বলা শোভন? প্রধানমন্ত্রীর পাসের সন থেকে বোঝা যায় যে, তিনি অনিয়মিত ছাত্রী হিসাবে হয়তো পরীক্ষা দিয়ে থাকবেন। সে পরীক্ষায় আর কি কি ঘাপলা হয়েছিল আজ তা আর নাই বা বললাম। তবে, এক্ষেত্রেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাসের কথা প্রচার করার পেছনে ‘ইমেজ’ বাড়ানোর একটা অসাধু প্রবণতাই যে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে, তা বুঝতে কারো বেগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ ধরণের ‘ফলস ইমেজ’ কি বেশি দিন ট্কে থাকে?”
– কাজী সিরাজ / দু:শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই ॥ [ গ্রন্থকানন – সেপ্টেম্বর, ২০০১ । পৃ: ৩৯৭-৩৯৮ ]









