অন্যকে থামানোর সাধ্য বা এখতিয়ার আমাদের থাকে না। যে নিন্দা করবে, সে করবেই। যে ধমক দেবে, সে দেবেই। গীবত থামাতে গেলে বরং শত্রুতা বাড়তে পারে। দোষত্রুটি বলে, সমালোচনা করে যারা তাদের মানসিক দীনতা জাহির করতে চায়, সেটা তারা বাধাহীনভাবেই করুক। কারো সভ্যতার দারিদ্র্য, ব্যবহারের গরিবি এবং কথার বাধাহীনতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে গেলে বরং সম্পর্ক নষ্ট হবে।
যে তার বলার স্বাধীনতার সীমানা জানে না, চর্চার পরিধি মানে না এবং জেনেও না জানার ভান ধরে থাকে, তাকে বোধ-বিবেকে জাগানো মুশকিল। স্বভাব যার বিগড়ে গেছে, রুচিতে যার ব্যাধি জন্মেছে, জিহ্বায় যার অশুদ্ধতা ভর করেছে এবং চিন্তায় যে রুগ্ণ হয়েছে, তাকে থামাতে গেলে, শেখাতে গেলে এবং বোঝাতে গেলে বরং উল্টো বুঝের কথা বলবে। বরং লোকে যা করতে, বলতে ও দেখাতে চায়, তা সফল করুক।
এর প্রতিকারে আমরা কী পারি? ভালো থাকা তো জরুরি। কাজেই কানকে অবহেলা করতে শেখাতে হবে। কে কী বলতে চাচ্ছে, তা কান শ্রদ্ধাভরেই অবহেলা করুক। শুনুক, তবে না জমাক। কান অবহেলা করতে গেলে মস্তিষ্কটা বেঁচে যাবে। মস্তিষ্কের নিরাপত্তা মানেই অন্তরের শুদ্ধতা।
চোখ যেন সবকিছু না দেখে। যেটুকু উপকারী, সেটুকুর দিকে দৃষ্টি দিলে চোখের বরং উপকার হবে। যে চোখ অবহেলা দেখতে যায়, অবজ্ঞার দিকে তাকায় এবং অপ্রাপ্তি দেখে, সে চোখে অশ্রু আসে। বরং চোখ সৌন্দর্য দেখুক। জগতের সব কুৎসিতকুৎসাএড়িয়ে চোখ বিশ্রাম করুক।
যার জিহ্বা সংযত থাকে, সে হিরো হয়ে যায়। শব্দের পরিমিতিবোধ শত্রু কমায়। কাউকে কষ্ট দেওয়ার কথা উচ্চারিত না হলে, সে দোয়া পায়। সমাজ ও সভ্যতার জন্য, পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য যে পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত, তা নিশ্চিন্ত হবে।
বহুরূপী ও মিশ্র স্বভাবের মানুষে সমাজ-সংসার ঠাসা। মন্দদেরউৎপাতবেশি বলেই মনে হয়, সংসারে খারাপ মানুষ বেশি। অথচ না। সমাজে ভালো মানুষের সংখ্যা বেশি না থাকলে সে সমাজ টেকে না। এই সমাজে এখনো ভালো মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।
তবে ভালো মানুষগুলোর মধ্যে জোট ও যোগাযোগ না থাকায়, তারা অনেকটা নিভৃতে চলে এবং আত্মকেন্দ্রিক বলয়ে থাকায় সমাজ তাদের আলোর সবটুকু পায় না। তাতেও ভয় নেই। কখনো যদি প্রয়োজন হয়, সংকট দেখা দেয়, তবে তারা এগিয়ে আসে। সমাজ বিনির্মাণে, ক্ষত দূরীকরণে এবং সংকট কেটে ওঠার কল্পে তারা জাগে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর বেশকিছুনজির আছে। যখনই জাতীয় সংকট তৈরি হয়েছে, তখনই শুদ্ধ মানুষগুলোর মধ্যে ইস্পাত-দৃঢ় ঐক্য হয়েছে।
আপনার গতিপথে অনেকগুলো বাধা। আপনাকে থামিয়ে দিতে কেউ কেউ নগ্ন হস্তক্ষেপ করবে, কেউ ভ্রূকুটি কেটে আত্মবিশ্বাস নষ্ট করবে, আবার কেউ অপতথ্য ছড়িয়ে সম্মানহানি করবে। যদি তাতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তবে গন্তব্যচ্যুত হওয়ার শঙ্কা প্রবল।
সমালোচনা আমলে নিয়ে, নিন্দা উপেক্ষা করে এবং উপহাস গায়ে না মাখিয়ে কাজ করে যেতে হবে। কাজের সফলতা এবং আপনার সাফল্যই পরিহাসকারীদের জন্য মোক্ষম জবাব হবে। সেজন্যই জীবনের চলার পথে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবল ক্ষমতা থাকা উচিত।
অন্যের মন্তব্য যাদের গন্তব্যের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়, তারা দুনিয়ার সফলদের সারিতে জায়গা পায় না। কাজেই সবর করে, কান বুজিয়ে এবং কারো সমালোচনায় ভেঙে না পড়ে লক্ষ্যের পথে ধীর ও দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে।
অল্পায়ুর জীবনটা যাতে বিস্তর আলোর উৎস হয় এবং সময় যাতে সেটা নিয়ে উৎসব করতে পারে—সে চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। যারা তাৎক্ষণিকপ্রতিক্রিয়াশীল, তারা বহুলাংশে ভুল করে। সময়ের চেয়ে উত্তম প্রতিশোধ আর কে নিতে পারে?
জীবনটাকে সময়ের মতো নিভৃতে বহমান করতে হবে। সুযোগগুলো ব্যবহার করে, সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগিয়ে তবেই তো জীবনের জয়ধ্বনি করতে হবে। সবার সব কথা যদি কানে হৃদয়ের কাছে পৌঁছে দেয়, তবে দুনিয়াতে শত্রুর সংখ্যা বেড়ে যাবে। যা সুখকর নয়, তা ইগনোর।
চলতে পথে সবাইকে লাগবে না। তবে কারো সাথে প্রকাশ্যে শত্রুতারও দরকার নেই। জিহ্বায় যদি নিয়ন্ত্রণ থাকে আর মস্তিষ্ক যদি সুচিন্তার উদ্ভাবন করে, তবে যে কেউ মহৎজনে পরিণত হতে পারে। সংযত মানুষই শ্রেষ্ঠ মানুষ। সংযত স্বভাবই বড় হওয়ার সিঁড়ি।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com








