আজকাল বেতন সম্মানের সমানুপাতিক! সরকার কত টাকা বেতন দিলে আমি সন্তুষ্ট হবো? শুনছি সামনেই পে-স্কেল পাবো। ধরি, যার যেখানে আয় তার চাওয়া তার দ্বিগুণ। সন্তুষ্টি কি দ্বিগুনে মিলবে? আমি কম আয় করি নাকি বেশি আয় করি তা মাপি কী দিয়ে? বাজার দর? সঞ্চয়? নাকি প্রতিবেশীর, প্রবাসীর, দুর্নীতিবাজের কিংবা অবস্থানে আমার উপরস্থের আয় দেখে? চলছে না? স্কেলের সবার নিম্নে যিনি, সবার উচ্চে যিনি- কারোররই তো চলছে না। চলবে কত দিলে? চলবে এবং চালিয়ে নিব- এই দুইয়ে সমন্বয় করার দায়িত্ব কার?
বেতন বর্ধিতকরণ- এটা একটা সাময়িক স্টপেজ। যা পাই তার তিনগুণদিলেও চলবে না। হাজারগুণদিলেও আমি অন্তত সন্তুষ্ট হবো না। হাটবারে যখন বাবা ২ টাকা দিতেন তখন মনে হতো পাঁচ টাকা হলে ভালো হয়, যখন বাড়ি ছাড়লাম তখন মাসে ছয় হাজার পেতাম। মনে হতো সাড়ে ছয় হলে অনেকগুলো শখ পূরণ হতো। যখন টিউশন করাতাম, কাঁচা টাকার স্বাদে পড়াশোনার চেয়ে আয়ের পেছনেই বেশিছুটতে শুরু করলাম। উপলব্ধির কালপর্বে
বুঝলাম, এরচেয়েবইয়ের কাছে ফেরার দায়িত্ব বড়।
তখন হঠাৎ ধাক্কা খেলাম। চাকুরির শুরুতে মোটে ১৬১২৩ টাকা দিয়ে শুরু। যে একটু এগিয়ে ছিল তার ২৪ হাজার দেখে মনে হতোওটাতে জীবন সাচ্ছন্দ্যে চলবে। একদিন সেটাও পেলাম। তখন মনে হলে এন্ট্রিএমাউন্ট ৩৩ হাজার ৫০০ না হলে একেবারে চলে না। পেতে শুরু করলাম। এবার ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার, ৯৮ হাজার, নির্ধারিত ১ লাখ ২০ হাজারে মন আটকে আছে! আমারটা আমার কাছেই ছোট!
উল্লেখিত সব অংক একদিন ছাড়িয়ে যাব। তখন আমার মানসিক প্রশান্তি কী আসবে? দ্বান্দ্বিকভোগবাদ আমাকে কোনোদিন মুক্তি দিবে? শিক্ষক হিসেবে বাড়তি টাকা না থাকার মধ্যেও খাতাপত্রঘেটে, পরীক্ষায় ডিউটি করে কিছু টাকা তো পাওয়া যায়। কেউ কেউপ্রাইভেট-টিউশন আছে। কারো কারো আবার অন্য উপায় আছে! গত বছর যা সঞ্চয় করতাম, এই বছর মন চাচ্ছেজমানোটাআরেকটু বাড়াই। আমার প্রয়োজনে? তারচেয়েও বড় কথা, অন্যেরটা শুনে।
বকরিদের ছুটিতে গ্রামে মিলিত হওয়ার বন্ধুদের আগ বাড়িয়ে করা আলোচনায় একবারও মনে হয়নি ধনে কেউ আমার চেয়ে পিছিয়ে আছে। বরং প্রত্যেকেই আমার শেষের অংকটা এখনই ছাড়িয়ে গেছে। এমন গল্প শুনলে ক্ষুধা বাড়ে। তার মানে উৎপাদনে যেতে হবে। আমি যে বৈধ উৎপাদনের শেষ ধাপে আছি। যোগ্যতা, দক্ষতা সব পুঁজি করে যা পাই ত সই। তবে মনে হচ্ছে তাল মেলাতে হলে আরও গতিতে ছুটতে হবে। তাতে নীতি-নৈতিকতা, সততা-সাধুতা সব কেতাবেরটাকেতাবেই ফেরত পাঠাতে হবে। এই সমাজে বাস করতে হলে ভিন্নতর উপায় আছে? কোনো কোনো অফিসের কেরানিরঠাটবাট সভ্য দেশের এমপি মন্ত্রীর আভিজাত্যের চেয়েও বেশি!
যা আয় তা দিয়ে সামাজিকভাবে বাঁচা যায় না- কথা সত্য। কিন্তু এই সামাজিকতা নির্মাণ করলো কারা? যে-কোনো নিমন্ত্রণে উপহার হাতে যেতে হবে? একেকজনেরবহুতল বাড়ি, একাধিক গাড়ি, কাড়িকাড়ি শাড়ি- এই ক্ষুধা জাগিয়েতুললো কারা? চুরিতেও পাপ না দেখা, দুর্নীতির সংজ্ঞা পাল্টে ফেলার দুঃসাহস কারা দেখালো এবং তাকে প্রশ্রয় দিল কারা? যারা পাহারাদার হয়ে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল তারা যদি বড় চোর হয় তবে দেখে রাখবে কে? পে-স্কেলে কষ্টের সাময়িক উপশম হবে কিন্তু দ্রব্যমূল্যের দাম যদি বাড়তেই থাকে, দুর্নীতি যদি দুর্নিবার চলে, পাচার যদি অহরহ ঘটে তবে যে লাউ সেই কদু।
মাইনেতে পয়সা বাড়ালে আমিও সেটার উপকারভোগী, এই সময়ে প্রয়োজনও বটে তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র যে ছিদ্রগুলো আছে সেগুলো মেরামত না হলে মুখ যে প্রশস্ত হতেই থাকবে। তখন তো সব গিলে খাবে। যদি বেতন বস্তায় আনতে হয় কিন্তু খরচ লরিতে পাঠাতে হয়- তবে ফলাফল শূন্য। সমস্যার কেন্দ্রে যেতে হবে। রাষ্ট্রের সামর্থ্যসীমা অতিক্রম করে পারিশ্রমিক বাড়ালে জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ নেমে আসার শঙ্কা আছে। কেউ কম চাইবে না, অল্পতে কেউ তুষ্ট থাকার মানসিকতায় নাই কিন্তু ঋণ করে শ্রাদ্ধ পাতলে তা চামড়া তুলেই আদায় করতে হবে!
দুনিয়ায় সম্পদের ক্ষুধা মিটলে ধর্ম মিথ্যা হয়ে যায়। ক্ষুধাটাকে যৌক্তিক রাখতে হবে। সামাজিক বৈষম্য নিরসন করতে না পারলে এবং বন্টন ন্যায্য না হলে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া গোষ্ঠী বাকিদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা দরকার। পরিবার ও প্রতিষ্ঠানে নৈতিক আলাপের চর্চা বৃদ্ধি করা দরকার। বাজার মনিটরিং করে সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। তাতে অল্প আয়েও ভালো চলবে। সরকারি চাকুরিজীবীদের সম্পদের দিকে দৌড় কমাতে হবে। শুনেছি, চাকুরিকালেই অনেকেই পাহাড়-পর্বত কিনে ফেলে। তাদেরকে ফেরাতে হবে।
মাথায় পাঁচটাকা দুর্নীতি হলে লেজেও দুইটাকা এদিক-সেদিক করার প্রবণতা শুরু হয়। বেতন কত জানার চেয়েও যাদের আয় কত তা জানার প্রতি ঝোঁক তাদের কোন উপায়ে শোধরানো যাবে তা জানি না। তবে নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সুশাসনকে কাগজের পৃষ্ঠা থেকে প্রাত্যাহিকজীবনচক্রের চর্চার মধ্যে আনতে হবে। রাষ্ট্র সুনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য উঠেপড়ে লাগুক। নয়তো সামনে শনিরদশা দৈর্ঘ্য-প্রস্থে আরও বাড়বে।
অনৈতিক ক্ষুধা নিবারণ করতে হবে। নয়তো স্বস্তি, সন্তুষ্টি এবং শান্তি- জীবনে কিছুই আসবে না। কেবল টাকা থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। বরং আরও কতিপয় সমস্যায় মূলে ও শাখায় বাড়ে। বেতন কাঠামো যেমন যুগোপযোগী করা দরকার তেমনি সেবা সহজীকরণ এবং সহজ প্রাপ্য করা আবশ্যক। সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়েই একটা দেশ আগায়।
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com









