শাবলু শাহাবউদ্দিন
এযাবৎ বাংলায় যতগুলো দুর্ভিক্ষ ঘটেছে তার মধ্যে ১৭৭০, ১৯৪৩, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষগুলো বাঙালি মানব সমাজে ব্যাপক ভাবে উল্লেখ যোগ্য । যা আজ অবধি মানুষের মনে নানা ভাবে নাড়া দেয় । সর্বকালের স্মরণীয় দুর্ভিক্ষ ।
আলোচিত দুর্ভিক্ষগুলো আমাদের আজও মনে পড়ে কারণ ঐ দুর্ভিক্ষগুলোতে উল্লেখ যোগ্য হারে মানুষের অপমৃত্যু ঘটেছিল । কিন্তু বর্তমানে যে দুর্ভিক্ষ চলছে, সেই দুর্ভিক্ষ আগেকার দিনের দুর্ভিক্ষের চেয়ে হাজার গুণে বড় দুর্ভিক্ষ, সে কথা আমরা কয়জন ভাবি । বর্তমানে সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, রাজনীতি এমন কোন পর্যায় নেই যেখানে দুর্ভিক্ষ নেই ।
সেই আমলে মানুষের মৌলিক চাহিদা ছিল তিনটি । তার মধ্যে অন্যতম প্রধান মৌলিক চাহিদা ছিল খাদ্য । আর খাদ্যের অভাবে জনজীবনে যে বিপর্যয় ঘটতো তাকে তারা সেই আমলে দুর্ভিক্ষ বলতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের চাহিদার পরিবর্তন ঘটেছে । সেই আমলে সমাজ ছিল সব কিছুর মূলে। আইন, রাষ্ট্র, রাজনীতি কয়জন বুঝতো? শিক্ষার হার ছিল অতি নগণ্য । মানুষ ছিল শৃঙ্খলিত এক সমাজের বাসিন্দা। কিন্তু বর্তমানে সমাজ বলতে তেমন কিছুই নেই । যা আছে তা হলো নকল নকশার প্রতিমূর্তি । সামাজিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে গেছে যাকে সামাজিক দুর্ভিক্ষ বললেও কম বলা হবে। পত্র পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, দুর্নীতি, সুদ, ঘুষ প্রতারণা তো কমন বিষয় । সবচেয়ে বড় বিষয় হল গুরুজনদের সম্মানহানি। পিতা-মাতা-শিক্ষক এখন আর সম্মান পায় না । গৃহচ্যুত হচ্ছে পিতা মাতা; শিক্ষক হচ্ছে নানা ভাবে লাঞ্ছিত । দেশে আইন থাকলেও আইনের আছে নানা ফাঁক ফোকর । ফলে সমাজের অবক্ষয় রোধ করা এখন হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে দুষ্কর।
সে যাইহোক, আমি আসি আমার মূল আলোচনায়, আগেকার দিনে খাদ্যের চরম অভারকে দুর্ভিক্ষ ( ভিক্ষার অভার) বলে উল্লেখ করলেও বর্তমানে কিন্তু দুর্ভিক্ষ বলতে শুধু খাদ্যের অভাব বুঝায় না । এইতো কিছুদিন আগে বাংলাদেশের সুনাম ধন্য নাট্যকার মামুনুর রশিদ উল্লেখ করেছেন যে , বাংলায় এখন সংস্কৃতির (রুচির) দুর্ভিক্ষ চলছে । কথা কিন্তু সত্য । যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, এই সংস্কৃতির দুর্ভিক্ষের মূলে আসলে কারা? স্বচ্ছ উত্তর কিন্তু কেউ দিতে চাইবে না। আমরা ব্যক্তি স্বার্থে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতির দুর্ভিক্ষ ডেকে আনছি । এ কথা আমরা কেউ স্বীকার করছি না । সবাই নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে দায় মুক্ত করছি। এটা কী আদ্য ঠিক করছি? মূলধারার সংস্কৃতিবিদেরাও আজ আর মূলধারায় নেই। তারাও চলে গেছে YouTube view ধারায় । সংস্কৃতির দুর্ভিক্ষ চলছে, এই কথা বলে চুপ থাকলে হবে না; মূলধারার সংস্কৃতির চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। জাতীয় স্বার্থের কাছে নিজ নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সংস্কৃতির কাজ চালিয়ে গেলে হয়তো এই সংস্কৃতি দুর্ভিক্ষ এতো দূরে এগিয়ে আসতো না। মিডিয়াকে একটু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বর্তমানে সংস্কৃতি পাড়ার ( মিডিয়া পাড়ার ) খবর গুলো প্রচার দেখে মনে হয় আমরা যেন মহা দুর্ভিক্ষে আছি। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের কোন কাজ নেই, তাদের এখন আসল কাজ হলো সমালোচনা করা আর পারিবারিক কলোহল নিয়ে ব্যস্ত থাকা। এই ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করা থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সংস্কৃতির দুর্ভিক্ষ দূর করতে হবে।
বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় সংকট হল সামাজিক ও পারিবারিক সংকট । এখন আর সেই শৃঙ্খলিত সমাজ ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া যায় না । পারিবারিক বন্ধন নেই বললেই চলে। এর জন্য কারা দায়ী? যৌথ পরিবার পথ্য হঠাৎ হারিয়ে গেলো কেন ? হারিয়ে গেলো কেন সামাজিক বন্ধন, সামাজিক রীতি-নীতি ? ভূপেন হাজারিকার মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনে জন্য আর নয় কেন? আগের দিনে কবিরাজের নিকট গেলে রোগীকে ভয় দেখিয়ে কবিরাজ অর্থ রোজগার করতো। আর বর্তমানে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারাও তাই করে। কথা কিন্তু এমন হওয়ার ছিল না। মানুষ আর অমানুষের মধ্যে দিনে দিনে তফাৎ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাচ্ছে । কারা মানুষ আর কারা অমানুষ । বুঝা বড় কঠিন । কারণ কী ? কেউ কেউ বলে শিক্ষা ব্যবস্থা এর জন্য দায়ী। তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করেন না কেন ? শিক্ষা ব্যবস্থাকে কে পরিবর্তন করবে ! দিন শেষে কোথাও কর্মসংস্থান না করতে পেরে যে ব্যক্তি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিল অবশেষে সে করবে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ? সে যদি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে তাহলে তো তার আর কর্মসংস্থান থাকবে না। উইপোকা যখন ঘরে বাস করে তখন সে ঘরে কী অবস্থা হতে পারে সেটা আমাদের সবার জানা আছে । তাই এই বিষয়টি নিয়ে বেশি দূর আর যেতে চাই না । ব্যক্তি স্বার্থে আমরা সবাই বদ্ধপরিকর । আঁতে ঘা লাগলে যারা বাবাকে ছাড়ে না তারা আমাকে কেন ছাড়বে ? আর যাইহোক তবুও শিক্ষা ব্যবস্থার একটা পরিবর্তন আনতে হবে। বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদ ভেবেছিলেন, সমাজে যদি শিক্ষিত মানুষ বৃদ্ধি পায় তাহলে সেই সমাজ পরিবর্তন করা খুব সহজ হয়। তাই তিনি মনে করতেন, যে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করবে তাকে পাস করে দেওয়া হোক। তার এই দাবি তার আমলে সফল না হলেও বর্তমান আমলে সফল হয়েছে । কিন্তু ফলাফল হয়েছে ভিন্ন । সু-পরিবর্তনের চেয়ে কু-পরিবর্তন অনেক বেশি হয়েছে । শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপক একটা শূন্যতা রয়েছে; সে দিকে একবার নজর দেওয়া উচিত। আমাদের সমাজে রাজা রামমোহন রায় হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; বাঘা যতীনদের দেখা পাওয়া যায় না । যা দেখা পাওয়া যায় তা হলো অযোগ্য চাটুকর পা চাটা মনীষীদের। দেখে মনে হয় সব জানে। কিন্তু ভবে মা ভবানী । সমাজ ও পারিবারিক দুর্ভিক্ষ দূর করতে হলে সবার আগে দরকার নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় সুশিক্ষা সুনিশ্চিত করণ ।
আবার আসল কথায় ফিরে আসি। রাজনীতি ও রাষ্ট্র । এক শব্দটি অন্য শব্দের সাথে যথাযথভাবে জড়িত । দেশে এখন একশ্রেণীর মীর জাফর মার্কা মনীষী রাজনীতিবিদ তৈরি হয়েছে । তাঁরা নিজেদের স্বার্থে এই সোনার বাংলার কী যে ক্ষতি করছে সে কথা কী এই বাংলা মানুষ একবার ভেবে দেখছে ? ১৭৫৭ সালের পলাশীর কথা কী আজ বাংলার রাজনীতিবিদেরা ভুলে গেছে! মীর জাফরের ব্যক্তিগত স্বার্থে সোনার বাংলা স্বাধীনতা হারালো প্রায় দুই শত বছর। যাদের কারণে আমরা স্বাধীনতা হারিয়ে ছিলাম, তাদের নিকট আবার কেন এই বাংলার ভাগ্য নির্ধারণে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে । এই বাংলা নিরীহ মানুষদের নিয়ে এ দেশের রাজনীতিবিদেরা কেন পাশা খেলা খেলছে ?
রাজনৈতিক দুর্ভিক্ষ এ দেশে যে এখন স্পষ্ট তা আর বলার কিছুই নেই। দেশ প্রেমিক রাজনীতিবিদের উচিত এখন কারো পা না চেটে সামনের সারিতে দাড়িয়ে নেতৃত্ব দান করে রাজনৈতিক দুর্ভিক্ষ দূর করে এই সোনার বাংলা সোনার রাষ্ট্রকে কু রাজনীতি থেকে উদ্ধার করা।
বুদ্ধিজীবী সমস্যা বর্তমান সবচেয়ে জটিল একটি সমস্যা । এখানে উল্লেখ করা যোগ্য যে , একপাল ছাগল যদি এক রাস্তা দিয়ে যেতে পারে , কিন্তু বাংলাদেশের দুইজন বুদ্ধিজীবী সেই রাস্তা দিয়ে যেতে পারবে না। কারণ তারা নিজেদের অন্য গ্রহের জীব মনে করে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক পারলে আপনারা কেন পারবেন না। রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্র চিন্তা ইত্যাদি কাজে আজকাল হাতে গণা কিছু লোক ছাড়া তেমন কোন উল্লেখ যোগ্য মানুষ পাওয়া যায় না । সংসদে ৮০% লোক যারা কোন না কোন ভাবে কোটিপতি ব্যবসায়ী । তারা দেশ চালাবে কী ? তারা তো চিন্তায় আছে কীভাবে ব্যবসায় করা যায় । জাতীয় সংসদের এমনো কিছু সংসদ সদস্য আছে যারা নিজেদের মাতৃভাষা নিজের লেখা প্রবন্ধ পাঠ করতে পারেন না। তারা জনগণের জন্য কী এমন করবে । তাই এখনি সময় রাজনৈতিক দুর্ভিক্ষ দূর করতে দেশের বুদ্ধিজীবীদের এগিয়ে আসা উচিত । নিজেদের মেধা জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগান । যে মেধা জাতির কাজে লাগে না, সে মেধা নিয়ে জন্ম নেওয়াও একটা পাপ কথাটি মনে রাখবেন।
Post Views: 408
Related