প্রথম ইনিংস শেষে পাকিস্তান জিতবে এমন বলা হলে হেসেই উড়িয়ে দিত সবাই। কিন্তু আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তান তাদের চরিত্র মেনে ৪০০ ছাড়ানোর লক্ষ্যের ম্যাচও জিতল। অবশ্য বৃষ্টি আইন ও ফখর জামানের অতিমানবীয় ব্যাটিংয়ে পোয়াবারো হয়েছে দলটির। এ জয়ে ৮ পয়েন্টের সঙ্গে ১ ম্যাচ হাতে থাকায় সেমিফাইনাল স্বপ্ন টিকে থাকল পাকিস্তানের। এদিকে ৮ পয়েন্ট নিয়ে থাকা নিউজিল্যান্ডও শেষ ম্যাচের আগে সেমিফাইনালের স্পষ্ট দাবিদার।
ওয়ানডেতে ৪০০ রানও তাড়া হয়েছে। তবে বিশ্বকাপে কখনই নয়। সর্বোচ্চ ৩৪৫ রান তাড়া করে এ বিশ্বকাপেই শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছে পাকিস্তান। শুধু এ কারণেই নিউজিল্যান্ডের ৪০২ রানের তাড়া করার লক্ষ্যে পাকিস্তানের ক্ষীণ আশা ছিল। সেই আশা বড় করেছেন ফখর। অবিশ্বাস্য বিধ্বংসী ঝড়ো ইনিংসে পাহাড় সমান লক্ষ্য তাড়ায় ঠিক পথ দেখিয়েছেন দলকে। দ্বিতীয়বার বৃষ্টির বাধা পড়ার আগ পর্যন্ত ৮১ বলে ৮ চার ও ১১ ছক্কায় অপরাজিত ছিলেন ১২৬ রানে।
ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই টিম সাউদির বলে মাত্র ৪ রানে আবদুল্লাহ শফিকের বিদায় পাকিস্তানকে ভয় ধরিয়ে দেয়। অধিনায়ক বাবর আজমকে নিয়ে সেই ভয় দূর করেন ফখর। পরের ২৩ ওভারে রান-বল হিসেবের দারুণ ক্রিকেট খেলেছে পাকিস্তান। বাবর হিসেবি খেললেও ফখর ছিলেন বিধ্বংসী। দ্বিতীয়বার বৃষ্টি থামার আগ পর্যন্ত ১৯৪ রানের অপরাজিত জুটি দুইজনের। এর মাঝে ১২৮ রানই ফখরের। বাবর অপরাজিত ছিলেন ৬৩ বলে ৬ চার ও ২ ছক্কায় ৬৬ রানে।
ম্যাচে যে বৃষ্টির বাগড়া আসবে তার আভাষ ছিল শুরু থেকেই। তবে আভাষটা ছিল পরের ইনিংসের জন্য। শুরুর ইনিংস নির্বিঘ্নেই হয়েছে। পাকিস্তানের ইনিংসেই সম্ভাবনা মতো বৃষ্টি নামে। শুরুতে ২১.৩ ওভারের সময় আর দ্বিতীয়বার বাধা পড়ে ২৫.৩ ওভারের সময়। দুবারই বৃষ্টি আইনের হিসেবে এগিয়ে ছিল পাকিস্তান। প্রথমবার ১ উইকেটে ১৬০ রান নিয়ে নিউজিল্যান্ডের রান অনুযায়ী বৃষ্টি আইনের লক্ষ্যে চেয়ে ১০ রানে এগিয়ে ছিল তারা। পরেরবার ১ উইকেটে ২০০ রান নিয়ে তাদের এগিয়ে থাকাটা ছিল ২১ রানে
দলকে এগিয়ে রাখার নায়ক ফখর। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শুরুর ম্যাচের পর সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এই ওপেনার এবার যেন পূর্ণ গতিতে ছুটছেন। আগের ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে সুযোগ পেয়ে করেছেন ৮২ রান। এই ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি তুলে নিলেন। অবিশ্বাস্য পাওয়ার হিটিংয়ে একেকটি ছক্কা পাঠিয়েছেন বেঙ্গালুরু স্টেডিয়ামের দ্বিতীয়তলা গ্যালারিতে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকে ওপেনিংয়ে এই পাওয়ার হিটিং খুঁজে ফিরছিল পাকিস্তান। দলটির ফিরে আসা জ্যোতি হয়ে ফখর দারুণ রেকর্ডও গড়েছেন।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এক বছরে চার সেঞ্চুরি করা পঞ্চম ব্যাটার হয়েছেন তিনি। ওয়ানডেতে এক প্রতিপক্ষের সঙ্গে এমন কীর্তি আছে ডেসমন্ড হেয়নেস, শচিন টেন্ডুলকার, রিকি পন্টিং ও বিরাট কোহলির। শুধু তাই নয়, বিধ্বংসী ইনিংসটিতে দ্বিতীয়বার বৃষ্টি নামার আগ পর্যন্ত ১১ ছক্কা মেরেছেন ফখর। আগের ম্যাচের ৮ ছক্কাসহ দুই ম্যাচেই ১৬ ওভারবাউন্ডারি তার। বিশ্বকাপে কোনো পাকিস্তানী ব্যাটারের সর্বোচ্চ। তাই ২০ ওভার শেষ হওয়ার আগেই সেঞ্চুরি পেয়েছেন ফখর।
এ বিশ্বকাপে রোহিত শর্মার (আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৭.২ ওভারে) পর দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে এই কীর্তি তার। তার আগে বিশ্বকাপে সর্বশেষ ২০ ওভারের ভেতর সেঞ্চুরি করা ব্যাটার ছিলেন ২০০৩ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে কানাডার জন ডেভিসন। বিশ্বকাপে এক ম্যাচে ১০ বা তার বেশি ছক্কা হাঁকানো চতুর্থ ব্যাটারও হয়েছেন পাকিস্তান ওপেনার।
অথচ প্রথম ইনিংস শেষে ম্যাচটি শুধুই নিউজিল্যান্ডের। রাচিন রবীন্দ্রর নেতৃত্বে ব্যাটিং অভিযানে নেমে রান পাহাড় গড়ে তারা। এ আসরে সেরা তরুণের গৌরবটা পেয়েই যাবেন রাচিন। তার ব্যাটে চলছে পূর্ণ বসন্ত। সেই বসন্তের বাতাসে রান ফুলের সুবাস ছড়িয়ে আর একটি সেঞ্চুরি তুলে নিলেন আজ। ক্যারিয়ারের ও আসরে নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরির পথে করেছেন ১৫ চার ও ১ ছক্কায় ৯৪ বলে ১০৮ রান। তার সঙ্গে দলে ফেরা অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের ১৮০ রানের জুটি শক্ত অবস্থানে দিয়েছিল নিউজিল্যান্ডকে।
৫ রানের জন্য সেঞ্চুরির আক্ষেপ নিয়ে ক্রিজ ছেড়েছেন উইলিয়ামসন। দুইজনের বিদায়ের পর ডেরিল মিচেল, মার্ক চ্যাপম্যান ও গ্লেন ফিলিপসরা পাওয়ার হিটিং ক্রিকেটে দলকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যান। শেষদিকে মিচেল ১৮ বলে ১ ছক্কা ও ৪ চারে ২৯, চ্যাপম্যান ২৭ বলে ৭ চারে ৩৯ ও ফিলিপস ২৫ বলে ২ ছক্কা ও ৪ চারে করেন ৪১ রান। তাদের ব্যাটে ভর করেই নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে দ্বিতীয়বার ৪০০ রানের মাইলফলক ছুঁয়েছে ব্লাক ক্যাপসরা। একাদশে স্পেশালিষ্ট স্পিনার ছাড়াই নামা পাকিস্তান চার পেসারের আক্রমণ নিয়ে ছিল বিফল। খরুচে পেসারদের মধ্যে কেবল মোহাম্মদ ওয়াসিম ওভার প্রতি ৬ রান দিয়ে নিয়েছেন ৬০ রানে ৩ উইকেট।
বৃষ্টি বাগড়া দেওয়ার আগপর্যন্ত পাকিস্তানের সামনে ছিল রেকর্ড রান তাড়ার চ্যালেঞ্জ/আইসিসি
এই বেঙ্গালুরু ও রাচিন- দুইজনের যোগসূত্র আছে। তাই মাঠটিকে হতাশও করেননি কিউই ব্যাটার। আদি ভূমিতে করলেন সেঞ্চুরি। এই বেঙ্গালুরুতেই বেড়ে উঠেছিলেন রাচিনের বাবা রবি কৃষ্ণমূর্তি। ওয়েলিংটনে পাড়ি জমানোর পরও ছেলেকে বেঙ্গালুরু ভুলতে দেননি রবি। নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আগে প্রায় প্রতি বছরই কর্ণাটক ক্রিকেট লিগে খেলেছেন রাচিন। বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে এই বেঙ্গালুরুতে খেলে চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামের সঙ্গে নিজেকে চিনিয়েছেন আলাদাভাবে। সেই চেনা-জানার সুবিধা আজ নিলেন রাচিন। সঙ্গে বেঙ্গালুরুতে থাকা আত্মীয়দের বা গ্যালারিতে বসা অনেক কাছের মানুষকেই উপহার দিলেন দারুণ এক অর্জন।
সেই অর্জন বিশ্বকাপে শচিন টেন্ডুলকারের পাশে বসার। কালকের ১০৮ রানে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে শচিনের করা ৫২৩ রান ছুঁয়েছেন রাচিন। সামনের ম্যাচেই কিংবদন্তী ব্যাটারকে ছাড়িয়ে যাবেন ১ রান হলেই। তখন এক বিশ্বকাপে ২৪ বছরের তরুণ হয়েও বেশি রানের রেকর্ড নিজের করে নিবেন ইতোমধ্যে তিন সেঞ্চুরি ও দুই ফিফটি করা রাচিন। এছাড়া কিউইদের হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডও হাতছানি দিচ্ছে এই তরুণকে। ২০১৯ বিশ্বকাপে কেন উইলিয়ামসন ৫৭৮ করেছিলেন। শীর্ষে উঠতে রাচিনের আর ৫৬ রান চাই।
উইলিয়াসনের ছায়াতেই সেরাটা দিয়েছেন রাচিন। বাংলাদেশ ম্যাচে আঙ্গুলের ইনজুরিতে ছিটকে যাওয়া কিউই অধিনায়ক একাদশে ফেরেন এই ম্যাচ দিয়ে। ডেভন কনওয়ে বেঙ্গালুরুর ধীর উইকেটে দেখে খেলেও গতিময় শুরু এনে দেন ৩৯ বলে ৩৫ করে। অথচ হাসান আলির ওয়ানডের শততম শিকার হয়ে ফেরেন উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে। সেই থেকে ইনফর্ম রাচিনকে নিয়ে পরের প্রায় ২৪ ওভারে ১৮০ রানের জুটি গড়েন। রাচিনের মতো উইলিয়ামসনও সেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। অথচ ৭৯ বলে ১০ চারে ও ২ ছক্কায় ৯৫ রানে থামেন কিউই অধিনায়ক। দলীয় ২৪৮ রানে তার ফেরার পর রাচিনও ফেরেন দ্রুত, দলীয় ২৬১ রানে৷ অবশ্য ৩৫ ওভারে এ দুই ব্যাটারের বিদায়ের পরও বিশাল স্কোরে বাধা পড়েনি নিউজিল্যান্ডের।
অবশ্য রান পাহাড় তাদের বেদনার বন্যায় ভেসে যাওয়ার বাধা হতে পারেনি। ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালে ভাগ্য যেমন দলটির সঙ্গে ছিল না, তেমনি আজও মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। পূর্ণ ম্যাচ হলে নিউজিল্যান্ডের পক্ষেই জয় আসতে পারত, তখন দলটির সেমিফাইনালও নিশ্চিত হতো প্রায়। অথচ ম্যাচ শেষে হাসি নিউজিল্যান্ডের নয়, পাকিস্তানের।








