শিক্ষাই একটি জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখার প্রধান কারিগর হলেন আমাদের শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাবৃন্দ। একটি মেধাভিত্তিক, জ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার নেপথ্যে যে ক্যাডার সার্ভিসের অবদান সবচেয়ে নিবিড় ও মৌলিক, তা হলো বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার। সাম্প্রতিক সময়ে দেশ যখন এক নতুন প্রত্যয়ে পথ চলা শুরু করেছে, ঠিক তখনই শিক্ষা ক্যাডারেও একধরনের প্রাণের সঞ্চার লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে নতুন সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপে শিক্ষা ক্যাডার পরিবারে একটি আশার আলো দেখা দিয়েছে। তবে এই আলো যেন অমাবস্যার আঁধারে ঢাকা পড়ে না যায়, সেজন্য পদোন্নতিসহ আনুষঙ্গিক প্রশাসনিক বঞ্চনার দ্রুত নিরসন জরুরি।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষা ক্যাডারে যে কয়েকটি ইতিবাচক উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দীর্ঘপ্রতীক্ষিত হলেও সম্প্রতি শিক্ষা ক্যাডারে যে পদোন্নতিগুলো হয়েছে, তা কর্মকর্তাদের মাঝে দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। সেই সাথে, অনেকের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায়সঙ্গত বদলির সুযোগ তৈরি হওয়া প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতারই প্রমাণ দেয়। এর পাশাপাশি এক যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপে সরকার উপসচিব (ডিএসপুল) পদে শিক্ষা ক্যাডারের ২২ জন যোগ্য কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করেছে। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা ক্যাডার পরিবারে শুধু আনন্দের বার্তা আনেনি, বরং সার্বিক শিক্ষা প্রশাসনে নতুন কর্মোদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাসের সঞ্চার করেছে। সময়োপযোগী ও কল্যাণমুখী পদক্ষেপগুলোর জন্য বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই প্রাণের সঞ্চার কি পূর্ণাঙ্গ মাত্রা পেয়েছে? উত্তর হলো, না। মুদ্রার অপর পিঠে এখনো রয়ে গেছে গভীর বঞ্চনা ও আক্ষেপের চিত্র। বর্তমানের এই ইতিবাচক আবহাওয়ার মধ্যেও শিক্ষা ক্যাডারে চরম হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে প্রারম্ভিক স্তরের পদোন্নতি জট। বিশেষ করে, ৩৬তম, ৩৭তম এবং ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের পদোন্নতিযোগ্য সহস্রাধিক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা আজও প্রভাষক পদে আটকে রয়েছেন। চাকরিতে জ্যেষ্ঠতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের পরও পদোন্নতি না পাওয়া একজন পেশাদার কর্মকর্তার জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণার। জীবনের সেরা সময় ও মেধা দিয়ে যারা শ্রেণিকক্ষে আলো ছড়াচ্ছেন, ক্যারিয়ারের শুরুতে তাদের এই পদোন্নতি বঞ্চনা শুধু ব্যক্তিজীবনকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক গভীর স্থবিরতার জন্ম দিচ্ছে। একই সাথে সহকারী অধ্যাপক হতে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক হতে অধ্যাপক পদে দীর্ঘ সময় পদোন্নতি বঞ্চিতদের দ্রুত পদোন্নতি প্রদানের মাধ্যমে পেশাগত জীবনে তাদেরকে আরও প্রাণবন্ত করা জরুরি।
একই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে পদোন্নতি বঞ্চিত সহকারী অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও। বহু বছর ধরে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল পদস্বল্পতা, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার দোহাই দিয়ে তাঁদের পদোন্নতি আটকে রয়েছে। যখন অন্যান্য ক্যাডারের সমসাময়িক কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেয়ে প্রশাসনিক সিঁড়িতে বহুদূর এগিয়ে যান, তখন শিক্ষার মতো সুমহান পেশায় নিয়োজিত কর্মকর্তারা পদে পদে পিছিয়ে পড়েন। এই বৈষম্য কেবল একজন কর্মকর্তার পেশাগত মর্যাদায় আঘাত হানে না, বরং তাঁর পেশাগত সততা ও উদ্দীপনাকেও ম্লান করে দেয়। পদোন্নতিহীন একই পদে বছরের পর বছর কাজ করে যাওয়া কোনো মেধাভিত্তিক ক্যাডারের পরিচয় হতে পারে না।
যুক্তির নিরীখে যদি বিবেচনা করা হয়, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রশাসনকে গতিশীল করার প্রধান শর্তই হলো সময়মতো পদোন্নতি ও কাজের উপযুক্ত স্বীকৃতি প্রদান। পদোন্নতি কেবল একটি নতুন পদবী বা স্কেল প্রাপ্তি নয়, এটি দায়িত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং কাজের গতি শতগুণ বাড়িয়ে দেয়। পদোন্নতির এই জট ও বঞ্চনা নিরসন করা গেলে শিক্ষা ক্যাডারে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হবে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট।
মানসিক তৃপ্তি ও কর্মস্পৃহা: পদোন্নতি বঞ্চিত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের হতাশা দূর হলে তাঁরা দ্বি গুণ উৎসাহ ও মনোযোগ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরবেন।প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা: পদবিন্যাস সঠিক থাকলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা দপ্তরের কাজ দ্রুত ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হবে।
নতুন উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহ: যোগ্যতার স্বীকৃতি পাওয়া কর্মকর্তারা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ: বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিজ্ঞানভিত্তিক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে অন্যতম সহযোগী হলো শিক্ষা ক্যাডার। শিক্ষাকে বঞ্চিত রেখে সরকারের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন কঠিন হয়ে পড়বে। তাই শিক্ষকদের ন্যায্য পদোন্নতি ও অন্যান্য দাবিগুলোর যৌক্তিকভাবে ও যথাসময়ে নিশ্চিত করতে হবে।
নকলমুক্ত পরিবেশ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষামন্ত্রীর নিরলস চেষ্টা : বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নকলমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ ও সরকারের অন্যতম এজেন্ডা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে বহুমুখী বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন। শিক্ষামন্ত্রীর সুদীর্ঘ সুনাম রয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করার জন্য । তার সুনাম ও সরকারের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করতে মরিয়া বিভিন্ন মহল শিক্ষা খাতে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। ফলে, প্রতিনিয়ত তাকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগী হিসেবে শিক্ষকসমাজকেও বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সরকারের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষদের মানসিক ও আর্থিক সঙ্গতি আরও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। তাই শিক্ষক ও শিক্ষা ক্যাডারের অধিকারগুলো নিয়ে সরকারের সদয় দৃষ্টি প্রদান করা প্রয়োজন।
শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে মাউশির চ্যালেঞ্জ: বর্তমান সময়ে শিক্ষা খাতকে মজবুত ও দৃঢ়ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও তার টিম।বহু বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে এগোতে হচ্ছে মাউশিকে। নানান অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে নতুন বাংলাদেশ বাস্তবায়নে মাউশির নেতৃত্বে কাজ করছে শিক্ষা ক্যাডার। জ্ঞানভিত্তিক নতু বাংলাদেশ বিনির্মাণে মাউশিকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সাথে মহাপরিচালকসহ মাউশির অন্যান্য পদগুলোর গ্রেড সংস্কার করে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেডে পদ তৈরি করে নতুন ও আকর্ষণীয় পদসোপান তৈরি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে যেখানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদমর্যাদা গ্রেড-১, সেখানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মত আরও উচ্চতর ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের পদ গ্রেড-৪ হওয়া শুধুই বেমানান নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে অন্যায্য ও বৈষম্যমূলক। বাস্তবতার নিরিখে দেখলে, মাউশির মহাপরিচালকের পদ সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার করা উচিৎ বলে মনে করছি এবং পরিচালক পদ গ্রেড-১ করে সকল পদের যৌক্তিক আপগ্রেডেশন প্রয়োজন।
এনসিটিবির পরিবেশ ও পদসোপান: সারা দেশে বছরের প্রথম দিন নতুন বই বিতরণ করা সরকারের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোর অন্যতম। সরকারের সেই উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করতে নিরলস কাজ করতে হয় এনসিটিবির। বছরের বড় একটি সময় বন্ধের দিন খোলা রাখতে হয় অফিস। দিন-রাত চলে কর্মযজ্ঞ। বর্তমান চেয়ারম্যানের দিকনির্দেশনায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি এনসিটির কর্মীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ আবাসিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন মনে করছি। চেয়ারম্যানসহ অন্য পদগুলোতে পদসোপান উন্নত করা প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানটিতে। এনসিটিবি যেহেতু সরকারের উচ্চতর সরকারি পদাধিকারী প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের সাথে সরাসরি কাজ করে সেহেতু চেয়ারম্যানের পদের মর্যাদা অন্তত গ্রেড-১ হওয়া প্রয়োজন। চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা গ্রেড-১ এর সচিব পর্যায় হলে এনসিটিবির বহুপাক্ষিক কাজে ভারসাম্য রক্ষায় সুবিধা হবে। একই সাথে অন্যান্য পদের মর্যাদাও আপগ্রেড করা প্রয়োজন।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: শিক্ষা ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা বোর্ড, বেনবেইজ, নায়েম, ডিআইএসহ সকল প্রতিষ্ঠানের পদগুলোর নতুন বিন্যাস ও আপগ্রেডেশন প্রয়োজন।
অধ্যাপক পদ গ্রেড আপগ্রেড: সরকারি কলেজের অধ্যাপক পদ গ্রেড-১ করা প্রয়োজন। একইভাবে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক পদের গ্রেড উন্নীত করা প্রয়োজন।
যথাসময়ে পদোন্নতি সময়ের দাবি: বর্তমান সরকার একটি জ্ঞানভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সরকারের এই মহৎ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষা ক্যাডারকে সহায়ক শক্তি হিসেবে পাশে পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষকরা যদি নিজেরাই বঞ্চনা, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করেন, তবে তাঁদের কাছ থেকে একটি নতুন প্রজন্মের মেধা বিকাশের পূর্ণাঙ্গ আউটপুট প্রত্যাশা করা সমীচীন নয়।
শিক্ষাকে যদি আমরা প্রকৃত অর্থেই জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে চাই, তবে শিক্ষা ক্যাডারের ন্যায্য দাবিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ৩৬তম থেকে ৩৮তম বিসিএস ব্যাচের পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের দ্রুততম সময়ে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে, পদোন্নতি বঞ্চিত সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকদের জট নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা সময় ও পরিস্থিতির দাবি।
শিক্ষা ক্যাডারের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার যদি সমাধান হয়, তবেই এই ক্যাডার তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বিকশিত হতে পারবে। সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই শিক্ষা ক্যাডার পরিবারে একটি সত্যিকারের ‘সোনালি সকাল’ নেমে আসবে—যে সকালে কোনো শিক্ষককে নিজের অধিকারের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে না, বরং প্রতিটি মেধা তাঁর সঠিক মূল্যায়ন পাবে। দেশ গড়ার কারিগরদের এই যৌক্তিক প্রত্যাশা পূরণ করে সরকার শিক্ষা ক্যাডারকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করবে—এমনটাই আজ সমগ্র শিক্ষা পরিবারের আকুল প্রার্থনা।
মোঃ মহিউদ্দিন
বিসিএস ( সাধারণ শিক্ষা),
শিক্ষা ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কলাম লেখক।









