মাহমুদুল হাসান,রামগড় প্রতিনিধি:
খাগড়াছড়ির রামগড় বাজারে দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে অজ্ঞাত পরিচয়ে ঘুরে বেড়ানো এক অসহায় ও স্বজনহীন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রামগড় উপজেলা ও পৌর বিএনপি। দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করা ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের বেওয়ারিশ ফাউন্ডেশনে পাঠাতে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বহন করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন রামগড় উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতৃবৃন্দ।
জানা যায়, দীর্ঘ প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে ওই ব্যক্তি রামগড় বাজারের বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত পরিচয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। গত এক-দুই বছরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করতে পারতেন না। কখনো রামগড় থেকে ফেনী বাসস্টেশন এলাকার আশপাশে ড্রেনের ওপর, কখনো ডাস্টবিনের পাশে কিংবা ময়লা-আবর্জনার মধ্যে পড়ে থাকতেন তিনি। তাঁর কোনো স্বজন, পরিচয় কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁকে খাবার দিয়ে সহযোগিতা করলেও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হচ্ছিল না।
বিষয়টি নজরে আসে সময়ের রামগড় টিভির। অসহায় মানুষটির দুর্দশার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে মানবিক মানুষদের মধ্যে সাড়া পড়ে। এরপর তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই মানবিক উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রামগড় বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল হানান মনসুর। তিনি নিয়মিত ওই ব্যক্তির খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সময় নিজের উদ্যোগে খাবার সরবরাহ করেন এবং তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে রামগড়ের কৃতী সন্তান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চট্টগ্রামের বেওয়ারিশ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর ওই অসহায় মানুষটিকে সেখানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ সময় মানবিক উদ্যোগটির বিষয়টি জানানো হয় রামগড় উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং রামগড় থানা পুলিশকে। বিষয়টি জানতে পেরে রামগড় বিএনপির নেতৃবৃন্দ আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন এবং অসহায় মানুষটিকে রামগড় থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছে দিতে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বহনের দায়িত্ব নেন।
তাঁদের এই সহযোগিতার ফলে নিরাপদে ওই অসহায় মানুষটিকে চট্টগ্রামের বেওয়ারিশ ফাউন্ডেশনে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
এছাড়া মানবিক এই কাজে আরও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন আমিন মেডিকেল হলের মালিক দেলোয়ার রাজু, যিনি প্রয়োজনীয় ফ্যাম্পাস ও ডেটল প্রদান করেন। রামগড় বৈশাখী সেলুন এগিয়ে এসে ওই ব্যক্তির চুল ও দাড়ি কেটে তাঁকে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে দেন। রামগড় পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও এ কাজে সহযোগিতা করেন।
পুরো কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন আবদুল হানান মনসুর। তাঁর সঙ্গে সময়ের রামগড়ের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান এবং মানবিক আলেম কাজী মহিবসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
অবশেষে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ওই অসহায় মানুষটিকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে চট্টগ্রামের বেওয়ারিশ ফাউন্ডেশনে নিয়ে গিয়ে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা, পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে, শুধু চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নয়—ভবিষ্যতে যদি ওই ব্যক্তির কোনো স্বজনের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আর যদি তাঁর স্বজনদের খুঁজে পাওয়া না যায় এবং মৃত্যুর পরও তাঁর পরিচয় অজানা থেকে যায়, তাহলে তাঁর মরদেহ রামগড়ে এনে যথাযথ মর্যাদায় কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করার মানবিক অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
এই উদ্যোগে রামগড় উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতৃবৃন্দের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া বহনের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অসহায় একজন স্বজনহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
সময়ের রামগড় পরিবারের পক্ষ থেকে এই মানবিক উদ্যোগে সহযোগিতা করা রামগড় উপজেলা ও পৌর বিএনপির সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ, রামগড় থানা পুলিশ, আবদুল হানান মনসুর, বৈশাখী সেলুন, রামগড় পৌরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম বেওয়ারিশ ফাউন্ডেশনসহ সকল মানবিক মানুষকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানো হয়েছে।
মানবিক এই উদ্যোগ আবারও প্রমাণ করেছে—মানুষ মানুষের জন্য। মানবতার কোনো দল, মত বা পরিচয় নেই। মানবতাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।








