ঢাকা, ২৫ মার্চ, ২০২৩
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
আজ (২৫ মার্চ) স্বাধীনতা ও গণহত্যার ৫৩তম দিবস উপলক্ষে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি রাত ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ৫৩টি মশাল প্রজ্জ্বলন করেন এবং আলোর মিছিলে নেতৃত্ব দেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়করা, রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দ।
আলোর মিছিলের প্রারম্ভে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের স্মরণে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একই দিন দেশে ও বিদেশে নির্মূল কমিটির সকল শাখা শহীদদের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সহ সমগ্র বিশ্বের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ ও গণহত্যায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের সভাপতিত্বে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি প্রাক্তন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদ খান মেনন এমপি, জাসদের সভাপতি প্রাক্তন তথ্যমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু এমপি, মুক্তিযুদ্ধে ২নং সেক্টরের ক্র্যাক প্লাটুনের কমান্ডার, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, মুক্তিযুদ্ধের ৮নং সাব-সেক্টর কমান্ডার ও মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের গার্ড অব অনার প্রদানকারী সাবেক এসপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ডাঃ আলীম চৌধুরীর সহধর্মিণী শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) সাহাবউদ্দিন আহমেদ বীরউত্তম, স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠশিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষাল, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৌত্রী মানবাধিকার নেত্রী আরমা দত্ত এমপি, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডাঃ শাহাদত হোসেন, ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট-এর সভাপতি বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক, সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম- মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হারুণ হাবীব, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমদের পুত্র কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পুলিশ কর্মকর্তা আবদুর রহমান চৌধুরীর পুত্র অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক এলাহী চৌধুরী।
২৫ মার্চসহ ’৭১-এর দীর্ঘ নয় মাসে শহীদ সকল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নির্মূল কমিটির ঘোষণাপত্রের সঙ্গে একমত পোষণ করে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, ‘’৭৫ সালে স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী চক্র বঙ্গবন্ধুর বংশকে নির্বংশ করে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য নিভিয়ে দিতে চেয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্ধু বলেছিলেন, ‘ধর্ম ধর্মের জায়গা থাকবে, রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়’। বঙ্গবন্ধুর সেই নীতিকেও তারা মাটি চাপা দিতে চেয়েছিল। যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল তাদেরকে খুনি জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানে রূপান্তরিত করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। আজও খুনি জিয়ার সেই দল স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার জন্য তৎপর। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্ত তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে তথাকথিত বিশ্ব মোড়লরা বাংলাদেশের মানবাধিকারসহ নানান ইস্যুতে প্রশ্ন তুলছে। তাদের জেনে রাখা দরকার- বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। যিনি বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘুসহ সকলের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন তাঁর বিরুদ্ধেই মৌলবাদীরা তথাকথিত বিশ মোড়লদের দিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকারের বিষয়ের প্রশ্ন তুলেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আবারও নিরঙ্কুশভাবে বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে বাংলাদেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। তা না হলে এতদিনের অর্জন ম্লান হয়ে যাবে। আসুন আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরো শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনে তাঁকে জয়যুক্ত করে বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নয়ন যাত্রাকে সামনে এগিয়ে নিই।’
৫৩তম গণহত্যা দিবস এবং গণহত্যার কালরাত্রির ঘোষণাপত্র পাঠ করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আইটি সেলে ও প্রজন্ম ’৭১-এর সভাপতি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর পুত্র আসিফ মুনীর তন্ময়। ঘোষাণাপত্রে বলা হয়¬
‘আমাদের ৩১ বছরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ আবারও আমরা মুক্তিযুদ্ধকালের ৩০ লক্ষ শহীদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে গণহত্যার কালরাত্রির কর্মসূচি পালনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পবিত্র প্রাঙ্গণে সমবেত হয়েছি। এ বছর শহীদজননী জাহানারা ইমাম কর্তৃক সূচিত এই কর্মসূচি ৩০ বছরে পদার্পণ করছে। আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির কারণে ২০১৭ সালে ২৫ মার্চ ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ মূল্যায়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথও সুগম হয়েছে।
‘আমাদের নতুন প্রজন্মকে বিশেষভাবে জানাতে হবে ’৭১-এর গণহত্যার ভয়াবহতা ও ব্যাপকতার পাশাপাশি কারা, কেন এই গণহত্যা করেছিল। ’৭১-এর গণহত্যা হয়েছিল ধর্মের নামে পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রতিহত করবার জন্য। ’৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী- প্রধানতঃ জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামের মতো মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন ঘাতক বাহিনী গঠন করে ইসলামের দোহাই দিয়ে বাংলাদেশের ৩০ লক্ষ নিরীহ মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছিল। এই গণহত্যার নির্দিষ্ট রাজনীতি ও দর্শন রয়েছে। এ কারণেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সুযোগ্য সহযোগীরা, যাঁরা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছেন তাঁরা এ ধরনের গণহত্যার পুনরাবৃত্তি রোধ করবার জন্য সাংবিধানিকভাবে ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। গণহত্যা দিবস পালনের সময় এ বিষয়গুলো আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিশেষভাবে জানতে হবে।
‘বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা মুছে ফেলে গণহত্যাকারীদের নিয়ে দল গঠন করেছেন, গণহত্যাকারীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে রাজনীতি ’৭১-এর গণহত্যার আদর্শিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে, গণহত্যাকে বৈধতা দিয়েছে, গণহত্যাকে ধর্মের নামে মহিমান্বিত করেছে- সে রাজনীতি বাংলাদেশে থাকতে পারে না। জাতীয় গণহত্যা দিবসে আমাদের প্রধান দাবি- বাংলাদেশে ধর্মের নামে গণহত্যা ও সন্ত্রাসের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অবিলম্বে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী, রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি সহ পাকিস্তানি গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আরম্ভ করতে হবে।
‘২০১৭ সালের ১১ মার্চ ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’-এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সময় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হলেও গত ছয় বছরে আন্তর্জাতিকভাবে গণহত্যার স্বীকৃতি নিয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
‘বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে একাত্তরে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পরিচালিত পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞকে ‘জেনোসাইড’ বা ‘গণহত্যা’র স্বীকৃতি দিয়েছে ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন’ (২০২১ সালে ৩১ ডিসেম্বর) ও ‘জেনোসাইড ওয়াচ’ (২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি) নামের যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এর ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের পথ সুগম হয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যার বিচার চেয়েছে ভারত।
‘বাংলাদেশের গণহত্যা অস্বীকারকারীদের উদ্যোগ নস্যাৎ এবং দেশে দেশে গণহত্যা নিরুৎসাহিতকরণের পাশাপাশি গণহত্যাকারীদের চলমান বিচারের সমর্থনে এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণের অংশ হিসেবে আমরা আহ্বান জানাচ্ছি- আমাদের সরকার, বিশেষভাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ’৭১- এর গণহত্যা অস্বীকারকারী এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস বিকৃতকারীদের শাস্তির জন্য প্রস্তাবিত আইন দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
‘গণহত্যার কালরাত্রি পালনের এই সমাবেশ থেকে আমরা ঘোষণা করছি- আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে জঙ্গি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সর্বক্ষেত্রে ৩০ লক্ষ শহীদের স্বপ্ন, তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
আমরা অবশ্যই জয়যুক্ত হব।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’







