ফারাও তৃতীয় রামেসিস ছিলেন প্রাচীন মিশরের ২০তম রাজবংশের শেষ মহান সম্রাট। ১২ শতক খ্রিস্টপূর্বাব্দের এক উত্তাল সময়ে তিনি রাজদণ্ড হাতে নিয়েছিলেন, যখন চারদিক থেকে বিদেশি আক্রমণ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত ছিল নীল নদের দেশ। তিনি কেবল একজন দক্ষ প্রশাসকই ছিলেন না, বরং এক জাঁদরেল সেনাপতি হিসেবে ‘সমুদ্রচারী জাতি’ (Sea Peoples)-এর আক্রমণ প্রতিহত করে মিশরকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। ২০তম রাজবংশের স্বর্ণযুগের অবসান ঘটেছিল এক রক্তক্ষয়ী বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে। ফারাও তৃতীয় রামেসিসের শাসনকাল আপাতদৃষ্টিতে সফল মনে হলেও, রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে ঘনীভূত হচ্ছিল ‘হারেম ষড়যন্ত্র’ (Harem Conspiracy), যা মিশরের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।
ষড়যন্ত্রের পটভূমি: সিংহাসনের অদৃশ্য লড়াই
খ্রিস্টপূর্ব ১১৫৫ অব্দে, ফারাও যখন বৃদ্ধ এবং অসুস্থ, তখন তাঁর গৌণ রানী তিয়ে (Tiye) এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করেন। রাজকীয় প্রথা অনুযায়ী সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রধান রানী আইসিসের পুত্র (ভবিষ্যৎ চতুর্থ রামেসিস)। কিন্তু রানী তিয়ে চেয়েছিলেন তাঁর নিজের পুত্র পেন্তাওয়েরকে ফারাও হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় এক বিশাল গোপন নেটওয়ার্ক, যাতে শামিল ছিলেন রাজপ্রাসাদের প্রধান কোষাধ্যক্ষ, সামরিক কর্মকর্তা এবং উচ্চপদস্থ উপপত্নীরা।
তৃতীয় রামেসিসের মমি: একটি ফরেনসিক বিশ্লেষণ
১৮৮১ সালে দেইর আল-বাহারি (Deir el-Bahari) থেকে উদ্ধার করা এই মমিটি দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এক রহস্য ছিল। ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত ধারণা করা হতো তিনি হয়তো বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন, কারণ তাঁর শরীরের ব্যান্ডেজগুলো এতটাই শক্তভাবে প্যাঁচানো ছিল যে বাইরের কোনো ক্ষত দৃশ্যমান ছিল না।
**লুকানো সেই ক্ষত
২০১২ সালে কায়রো ইউনিভার্সিটির রেডিওলজিস্ট সাহার সেলিম এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জাহি হাওয়াস যখন সিটি স্ক্যান করেন, তখন মমির গলার চারদিকের ব্যান্ডেজের নিচে লুকিয়ে থাকা বীভৎস সত্যটি বেরিয়ে আসে। ফারাওয়ের গলায় একটি ৭০ মিলিমিটার চওড়া গভীর ক্ষত পাওয়া যায়, যা ধারালো কোনো ব্লেড বা ছোরার আঘাতে তৈরি হয়েছিল। এই আঘাতটি শ্বাসনালী, খাদ্যনালী এবং প্রধান রক্তনালীগুলোকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।
**মমিকরণ প্রক্রিয়ার জটিলতা
সাধারণত মমিকরণের সময় শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বের করে নেওয়া হলেও ক্ষতস্থানে কিছু করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু রামেসিসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, মমিকরণকারীরা অত্যন্ত যত্নের সাথে সেই বীভৎস ক্ষতটি ঢাকতে প্রচুর পরিমাণে রেজিন এবং লিনেন ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি তাঁর ঘাড়ের চারপাশে একটি শক্ত কলারের মতো ব্যান্ডেজ পরানো হয়েছিল যাতে মাথাটি দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যায়।
হোরাসের চিহ্নের (Eye of Horus) রহস্যময় উপস্থিতি
সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কারটি ছিল ফারাওয়ের গলার সেই গভীর ক্ষতের ভেতরে। স্ক্যানে দেখা যায়, মমিকরণকারীরা ক্ষতের ঠিক ভেতরে একটি বিশেষ রক্ষা কবজ বা অ্যামুলেট (Amulet) স্থাপন করেছিলেন।
** ক্ষতস্থানে হোরাসের চোখ
ফারাওয়ের গলার সেই মরণঘাতি ক্ষতের গভীর স্তরে একটি ‘আই অফ হোরাস’ বা ‘উজাত’ (Udjat) নামক কবজ বসানো হয়েছিল। প্রাচীন মিশরীয় সংস্কৃতিতে এই চিহ্নটি কেবল শক্তির প্রতীক ছিল না, এটি ছিল ‘পুনরুত্থান’ এবং ‘আরোগ্য’ (Healing)-এর পরম চিহ্ন।
**বিচার ও দণ্ড: ‘প্যাপিরাস অফ তুরিন’-এর সাক্ষী
ফারাও নিহত হলেও ষড়যন্ত্রকারীরা ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়। চতুর্থ রামেসিস দ্রুত রাজদণ্ড হাতে নেন এবং ১২ জন বিচারকের একটি বিশেষ কমিশন গঠন করেন। ইতালির তুরিনে সংরক্ষিত ‘জুডিশিয়াল প্যাপিরাস’ নামক নথিতে এই বিচারের প্রতিটি ধাপ লিপিবদ্ধ আছে:
- অপরাধীদের নাম পরিবর্তন: বিচার চলাকালীন অপরাধীদের আসল নাম মুছে দিয়ে তাদের ‘ঘৃণ্য’ বা ‘অশুভ’ নামে ডাকা হতো, যাতে পরকালেও তারা শান্তি না পায়।যেমন একজনকে ডাকা হয়েছে ‘বিনেমওয়াস’ (Binemwese) নামে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো “থিবসের জন্য ক্ষতিকর”।
- কঠোর শাস্তি: ২৮ জন ষড়যন্ত্রকারীকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজপুত্র পেন্তাওয়েরকে রাজকীয় মর্যাদার খাতিরে নিজের প্রাণ নিজে নেওয়ার (আত্মহত্যা) আদেশ দেওয়া হয়।
- পেন্তাওয়েরের মমিকে (Unknown Man E) অপবিত্র বলে গণ্য করা হয়েছিল। তাকে নিয়মমাফিক মমি না করে ছাগলের চামড়ায় (যা প্রাচীন মিশরে অশুদ্ধ মনে করা হতো) মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তার মুখটি যন্ত্রণায় হা করা ছিল, যা নির্দেশ করে যে তাকে অত্যন্ত অপমানজনকভাবে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।
- প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জেনেও যারা নীরব ছিলেন, তাদের নাক ও কান কেটে ফেলা হয়েছিল—যা ছিল মিশরের সমাজে এক চরম সামাজিক ও ধর্মীয় অবমাননা।
এই ষড়যন্ত্র মিশরের রাজকীয় নিরাপত্তাহীনতা এবং নৈতিক অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে দেয়। ফারাওয়ের মৃত্যুর পর শুরু হওয়া এই বিচারকার্য যেমন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছিল, তেমনি উন্মোচিত করেছিল খোদ বিচারকদের নৈতিক স্থলন। বিচারের মাঝপথেই পাঁচজন বিচারক আসামীপক্ষের নারীদের দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হন এবং পরবর্তীতে নিজেরাও দণ্ডিত হন।
***
পেন্তাওয়ের (Pentawer) ফারাওয়ের এই বিদ্রোহী পুত্রের আসল নাম ছিল না, বরং এটি ছিল একটি ‘ছদ্মনাম’ বা বিদ্রূপাত্মক নাম। ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার কারণে বিচারিক নথিতে তাঁর প্রকৃত রাজকীয় নাম মুছে ফেলা হয়েছিল।
- বিদ্রূপাত্মক অর্থ: ‘পেন্তাওয়ের’ নামের একটি সম্ভাব্য অর্থ হলো “যিনি বড় হতে চেয়েছিলেন” বা “সিংহাসন প্রত্যাশী”। এটি তাঁর ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে বিদ্রূপ করার জন্য দেওয়া হয়েছিল।








