১৯৯২ সালে মোস্তফা মহসিন মন্টু আওয়ামীলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার আর আওয়ামীলীগে ফেরা হয়নি। একসময়ের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ও ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত দুঃসময়ে আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া এবং ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েও ১৯৯২ সালে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে মৃত্যু ঘটেছিল মোস্তফা মহসিন মন্টু।১৯৯২ সাল থেকেই তিনি গণফোরামের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করলেও আর কোনদিন আওয়ামীলীগে ফিরতে পারেননি।
ছাত্রলীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল হক মনি যখন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তখন তার সভাপতি ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন।১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি ঢাকা -৫ আসনের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।১৯৯৫ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করেন ।
২০০২ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেছেন।তার উত্তরসূরী হিসেবে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সভাপতি হয়ে এসেছেন কে এম ওবায়দুর রহমান। তার বিপরীতে তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জাসদ নেতা সিরাজুল আলম খান। ছাত্রলীগ নেতা কেএম ওবায়দুর রহমান ১৯৭৮ সালেই বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন। আজ যাকে আপনি আওয়ামীলীগের বড় নেতা হিসেবে দেখছেন, সে কাল নাও থাকতে পারে।আজ যারা আওয়ামীলীগ দাবি করে বড় বড় কথা বলছে তারা যে আগামীকাল বিএনপি ও জামায়াতে যোগ দিবে না তার কি গ্যারান্টি আছে? কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের আরেক সভাপতি ফেরদৌস আলম কোরেশি পর্যন্ত বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন।
২০১৪ সালে যে আওয়ামিলীগ থেকে লতিফ সিদ্দীকিকে বহিস্কার করা হয় সেই আওয়ামীলীগের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি আজ জেলে। লতিফ সিদ্দিকীর মতো কাদের সিদ্দিকীকেও বহিস্কার করা হয়েছিল।সেই কাদের সিদ্দিকীকে জামায়াতের দিগন্ত টিভিতেও দেখা গেছে। লতিফ সিদ্দিকী ও কাদের সিদ্দিকীর পার্থক্য আওয়ামীলীগ কবে বুঝবে ? দলের ভেতরে কে খন্দকার মোশতাক আর কে তাজউদ্দীন এই সত্য বোঝার বোধ আওয়ামীলীগের কবে জাগ্রত হবে?
১/ ১১ সংস্কার আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকায় সংবিধান রচিয়িতাদের একজন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদের বহিস্কারাদেশ আজ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়নি।এর সাথে বহিস্কার করা হয়েছে আওয়ামীলীগের অসংখ্য যোগ্য ও জনপ্রিয় ছাত্র নেতাদের। যার ফলে একদল অযোগ্য চলে আসে সামনের সারিতে।শুরু হয় রাজনীতির নামে মনোনয়ন বাণিজ্য ও খবরদারির রাজনীতি। এমনও হয়েছে নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে নির্বাচন করার জন্য ২০০ আওয়ামীলীগ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এভাবেই উপজেলা পর্যায়ে পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে নৌকা বিক্রি হয়েছে।আজ তারাই এখন আওয়ামীলীগের হর্তাকর্তা। আওয়ামীলীগের বড় বড় পদ দখল করে আছেন তারাই।এরা আজ আওয়ামীলীগ পরিচয়ে গলাবাজি করলেও তৃণমূলের একজন কর্মী ও সমর্থককে আওয়ামীলীগের সমালোচনার জন্য তার চৌদ্দ গুষ্টির ডিএনএ টেস্ট দিতে হয়। কিন্তু ডিএনএ টেস্টে দিতে হয় না ধান্দাবাজ নেতাদের। যার ফলে প্রায় প্রতিটি উপজেলা আওয়ামীলীগ , যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পোস্ট বিক্রি হয়েছে টাকার মাধ্যমে। এরাই আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় বড় জ্ঞান দিবে!
আওয়ামীলীগকে ধ্বংস করার জন্য আওয়ামীলীগ যথেষ্ঠ।১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করা মনিরুল হক চৌধুরী আজ বিএনপির নেতা।১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে দুঃসময়ে ছাত্রলীগের দায়িত্ব পালন করা এম এ আউয়ালের নাম পর্যন্ত ছাত্রলীগের অসংখ্য নেতাকর্মীরা জানে না। আওয়ামীলীগের ৭৬ বছরে নিষেধাজ্ঞা ও নানা সংকট কাটিয়ে বার বার ঘুরে দাঁড়িয়েছে আওয়ামীলীগ। কিন্তু এই ৭৬ বছরে দলটি জনগণের দল থেকে পরিণত হয়েছে জাতীয় বুদবুদে। এর পেছনের কারণ কি?
২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর যুবলীগের কমিটি ঘোষণার মাত্র দুই মাসের মাথায় খুন করা হয় যুবলীগের দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে। পরবর্তীতে তাকে যে খুন করেছিল যুবলীগের আরেক নেতা তারেক সে র্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়। পুলিশি অনুসন্ধানে মাদক ও ক্যাসিনোর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে
তাদের হত্যাকাণ্ডের স্পষ্ট বিবরণ দেয়া আছে।এই দ্বন্দ্বে সামনে আসেন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়া।২০১৭ সালে এসব দূর্বৃত্তের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আসে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের নাম। ক্যাসিনো বাণিজ্য নিয়ে কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে আসে সাপ। পরবর্তীতে বহিস্কৃত হন যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী।একটা সময় শেখ হাসিনার ৩২ নম্বরে গুলি করা ফ্রিডম পার্টির আরমান হয়ে গিয়েছিলেন ঢাক মহানগর যুবলীগের দক্ষিণের সহ – সভাপতি।ঢাকায় কাপড়ের দোকানে কাজ করা মুন্সিগঞ্জের এমরান হোসেন হয়ে গিয়েছিলেন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক!
আওয়ামীলীগের গত ৭৬ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে আওয়ামীলীগ বহুবার খন্দকার মোশতাক ও তাজউদ্দীন চিনতে ভুল করেছে। যুবলীগ নেত্রী পাপিয়াদের কথা কি আপনাদের মনে আছে? যদিও পরবর্তীতে শেখ হাসিনা তার শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এইভাবে একটি সংগঠনকে কারা দীর্ঘদিন ষড়যন্ত্র করে ধ্বংস করলো? আজ আবার স্লোগান উঠে অমুক ভাই, তমুক ভাই! পুরোটাই যেন একটা পঙ্গপালের দল।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন তখন ১৯৮১ সালের ১৭ ই নভেম্বর শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টু। বর্তমানে তিনি পিনাকীর মতো ফ্রান্সে অবস্থান করছেন। মতিউর রহমান রেন্টু শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি একজন বীর প্রতীক। তিনি শেখ হাসিনা নিয়ে একটি বই লিখেছেন ” আমার ফাঁসি চাই।” তার বাড়িও গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর। তিনি ভারত সরকারের দেওয়া বিরল সম্মানেও ভূষিত হয়েছিলেন।১৯৮১ শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামীলীগের সাথে ছিলেন। ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ” আমার ফাঁসি চাই ” বইটি নিষিদ্ধ করে। তারপর তিনি লিখেন ” অন্তরালে হত্যাকারী প্রধানমন্ত্রী ” ২০০৭ সালে ফুসফুসের ক্যান্সারে তিনি মারা যান। তিনি এই বইটি আবেগ থেকে লিখেছিলেন নাকি বাস্তবতা থেকে তা একদিন সময় বলে দিবে। কিন্তু গত ৭৬ বছরে আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আজ পর্যন্ত শত্রু ও মিত্র চিনতে না পারার খেসারত দিচ্ছে আওয়ামীলীগের কোটি কোটি নেতাকর্মী। ১৯৭৮ সালের রাজনৈতিক অধ্যাদেশ ৬ দিয়ে জিয়া যেভাবে আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধ করেছিল সেই পথেই হাঁটছে ইউনূস সরকার।শেখ হাসিনার সরকারকে তুলনা করা হচ্ছে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর সাথে। অপরদিকে ২৩৭ টি আসনে নির্বাচনের মূলা প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি।
২০২৪ সালের ৫ই আগষ্টের পর থেকে আওয়ামীলীগ এক প্রকার রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দলের মধ্যে আবার উঁকি দিতে শুরু করেছে খন্দকার মোশতাক চক্র।২৮ বছর আওয়ামীলীগের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে আমাদের ডিএনএ টেস্ট এখনও দিতে হয় ! কিন্তু ভাইয়া লীগ , পাতি লীগ , সাইনবোর্ড লীগদের কোনকালেই ডিএনএ টেস্ট দেওয়া লাগেনি! ওরাই যেন এখন আওয়ামীলীগের সর্বেসর্বা। আওয়ামীলীগের সমাধি হয়তো এভাবেই রচিত হচ্ছে আগামীদিনে।
কে আওয়ামীলীগ আর কে খন্দকার মোশতাক এটাই আগামীদিনের রাজনীতিতে আওয়ামীলীগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সত্য সবসময় সুন্দর
০৫-১০-২০২৫
Post Views: 139
Related