ঢাকা শহরের ধানমন্ডি এলাকার (পুরনো) ৩২ নম্বর রোডটি যেখানে মীরপুর রোডে এসে মিশেছে, তার অনতি দূরে, ধানমন্ডি লেকের পাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ছিল। ‘ছিল’ মানে, এখন আর নেই, ২০২৪-২৫ সালে কয়েক বারের অপচেষ্টায়, ইউনুস সরকারের মদদে এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর নির্লিপ্ততায় বাড়িটিকে প্রথমে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে এবং তারপর বুলডোজার দিয়ে একাধিক বার ভেঙেচুরে প্রায় ধ্বংস করে ফেলে রাখা হয়েছে।
অন্য অনেক অঞ্চলের মতো ভারতবর্ষে এই (অন্ধ?) বিশ্বাস আছে যে বৃক্ষ, পর্বত, নদীর মতো প্রতিটি বাসস্থানেরও একটি আত্মা কিংবা দেবতা থাকে। বাসস্থান তৈরির আগে সেই বাস্তুদেবতার পূজা করা এখনও ভারতবর্ষের হিন্দু সমাজে একটি প্রচলিত (কু/সু?)সংস্কার। মনুষ্যের মৃত্যুর পর দাহকার্যের সময় হিন্দুধর্মের একটি মন্ত্রে যেমন আত্মাকে বলা হয়: ‘আকাশস্ত নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়’, অর্থাৎ ওহে আত্মা, যে তুমি ‘বায়ুতে মিশে, অবলম্বনহীন, নিরাশ্রয় হয়ে আকাশে’ অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছো, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বিখ্যাত বাড়িটির বাস্তুদেবতারও সেই একই দশা।
সম্প্রতি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাংবাদিক সেই বাস্তুদেবতার নিম্নরূপ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন।
সাংবাদিক: মুখ দিয়ে প্রায় বের হয়ে যাচ্ছিল, অনেকটা সুন্নি মাহার মতো: ‘আপনার অনুভূতি কী?’ কিন্তু না, ঐ ক্লিশে প্রশ্নে যাচ্ছি না। কেমন আছেন, বলুন।
বাস্তুদেবতা: ইদানিং খুব একটা ভালো নেই, তবে ভাববেন না, তার জন্য বিন্দুমাত্র আমার মন খারাপ, কারণ কী জানেন, সেই ১৯৬১ সাল থেকে, বেগম মুজিব ধারদেনা করে বাড়িটা কোনো মতে দাঁড় করানোর পর শেখ মুজিবুর রহমান যখন থেকে এই বাড়িতে সপরিবারে বাস করতে শুরু করেন, তখন থেকে খারাপ থাকা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আপনাকে বুঝিয়ে বলি।
ঢাকা শহরে ঠিকানাহীন শেখ পরিবারের জন্য বেগম মুজিব একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তিনি একটি প্লটের জন্য আবেদন করলে ১৯৫৭ সালে, ৬,০০০ টাকার বিনিময়ে ৩২ নম্বর রোডে কুড়ি কাঠার ৬৭৭ নম্বর প্লটটি তাঁকে দেওয়া হয়। বহু ধারদেনা করে এই প্লটটিতে ১৯৬১ সালে তিনি যে বাড়িটি নির্মাণ করিয়েছিলেন, অর্থাৎ মীরপুর রোডের ক্রসিং থেকে এই রোডের দ্বিতীয় বাড়িটি, ষাটের দশক থেকে ‘শেখ সাহেবের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত হয়। বাড়িটির বর্তমান ঠিকানা: সড়ক নং: ১১, বাড়ি নং: ১০। এই বাড়িটিরই আমি বাস্তুদেবতা।
এই বাড়ি থেকেই ১৯৬৯ সালের পাকিস্তান বিরোধী গণ-আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে এই বাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উন্নীত হয়। এর দুই দিন পর ২৫শে মার্চ তারিখে এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং একই রাতে এই বাড়িতেই তিনি গ্রেফতার হন। সে রাতে এই বাড়িটি গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় হানাদার বাহিনী এই বাড়ি দখল করে রাখে এবং ১৬ই ডিসেম্বর তারিখেও সেই দখল তারা ছাড়েনি। ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে!’ অতি উৎসাহী হয়ে শ্রেফ এই খবর দিতে এসে ১৬ই ডিসেম্বর সারা দিন ধরে ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে কত লোক যে হানাদার সেনাদের গুলিতে বেঘোরে মরেছে, আমার নিজের চোখে দেখা।
নিরাপদ সরকারি বাসভবনে না থেকে অনিরাপদ ৩২ নম্বরে থাকার সিদ্ধান্ত একান্তভাবে বঙ্গবন্ধুর। স্বাধীনতার চার বছর পর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর থেকেই এই বাড়িতে কেউ থাকে না, বাড়িটিতে রাত কাটানোর দুঃসাহসও হয়তো কেউ আর করেনি। বাড়িটি অনেকটা পোড়ো, পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবে পড়েছিল ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত। ১৯৯৪ সালে বাড়িটিকে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
২০২৪ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আগস্টের ৫ তারিখেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাদুঘরে রক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিষসহ যাবতীয় দ্রষ্টব্য বস্তু হয় ভস্মীভূত হয়েছে, কিংবা লুট হয়ে গিয়েছে। ২০২৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি বাড়িটি বুলডোজার নিয়ে এসে ভাঙ্গা হয়। দুই কুখ্যাত ইউটিউবার, ফ্রান্স থেকে পিনাকি ভট্টাচার্য ও আমেরিকা থেকে ইলিয়াস হোসেন এই অপকর্মে ইন্ধন যোগালেও, বিএনপি ও এনসিপি সহ একাধিক রাজনৈতিক দল এই ধ্বংসযজ্ঞে অংশগ্রহণ করেছিল।
পুলিশ ও সেনাবাহিনী নির্লিপ্তভাবে দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছে, আমি নিজের চোখে দেখেছি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে উড়ে এসে জুড়ে বসা, কুবাক্য বলার জন্য কুখ্যাত ওসমান হাদি খুন হওয়ার অজুহাতে ৩২ নম্বর বাড়ি আবারও বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হয়। এবারও কর্তৃপক্ষ এই বাড়ি ভাঙায় নীরব সম্মতি দিয়েছে। (ক্রমশঃ)
Post Views: 152
Related