পিন্টু দাশ, (নিজস্ব প্রতিনিধি চট্টগ্রাম)
১০ বছর আগে মানিলন্ডারিং মামলায় কারাভোগকারী বিএনপির এক সময়ের বহিষ্কৃত নেতা মো. আলী আব্বাস হঠাৎ মাঠে সরব হয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি কিংবা আহ্বায়ক হতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। গত ১৫ বছরে যাকে মাঠে ময়দানে সার্চলাইট জ্বালিয়েও দেখা যায়নি সেই সাবেক ইউপি সদস্য আব্বাস এখন পুরো দক্ষিণ জেলা চট্টগ্রাম সামলানোর স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু ১৬ দিন ধরে নেতৃত্বশূন্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির এই গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক শাখার শীর্ষ নেতৃত্বে যোগ্য ও পরীক্ষিতদের খোঁজা হচ্ছে বলে দলীয় হাইকমান্ড সূত্রে জানায়।
শীর্ষ পদ পেতে বসে নেই পদপ্রত্যাশীরাও। তাঁরাও নানাভাবে লবিং তদবির করছেন। এবারে সভাপতি বা আহ্বায়ক পদে বেশ আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান জুয়েল, সাবেক সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ ইদ্রিস মিয়া, সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট ইফতেখার হোসেন চৌধুরী মহসিন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মো. মহিউদ্দিন। সে ক্ষেত্রে তলানিতে দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ আলী আব্বাস। তবে এদের মধ্যে খুব বেশি সমালোচনা শোনা যাচ্ছে মেসার্স আব্বাস ট্রেডিং এর কর্ণধার মো. আলী আব্বাসের। গতকালও নুর মোহাম্মদ সড়কের বিএনপি কার্যালয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ধাওয়া খেলেন সেই আলী আব্বাস ও সাবেক এমপি সরোয়ার জামাল নিজাম।
এক সময় দক্ষিণে পাল্টা কমিটি দিয়ে বহিষ্কৃত হলেও পরে প্রত্যাহার হয়। এমনকি ৫ আগষ্টের পরে পুনরায় লবিং তদবির শুরু করছেন তিনি। গত ৮ সেপ্টেম্বর নিজেকে সাধু সাজতে বিএনপির কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটিতে ৫৭২ নম্বর ক্রমিকে দুই লক্ষ টাকার অনুদান দিয়ে পুরো ফেসবুকে লোক দেখানো ঝড় তোলেছেন। বিএনপি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন অর্থপাচারকারী মামলার অনুদান ফেরতযোগ্য।
ওদিকে, আলী আব্বাস নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করলেও তাঁর উঠবস আর ব্যবসা সব আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে। ২০১০ সালের একটি নথিতে দেখা মিলে, আব্বাসসহ কর্ণফুলী আওয়ামী লীগের তিন নেতা ‘কর্ণফুলী বিল্ডার্স এন্ড ডেপলাপার লিমিটেড’ নামক কোম্পানি খুলেন।
ঠিকানা দেখানো হয় নগরীর আন্দরকিল্লার কে.এম.সি টাওয়ারের তৃতীয় তলা। এতে ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন তৎকালিন কর্ণফুলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক বর্তমান দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব হায়দার আলী রনি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমির আহমেদ।
এই বিএনপি নেতা আব্বাস, এক সময় নিজেই গুজব রটিয়েছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তারেক রহমানের কাছে ২ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন। এ জন্য তিনি মানিল্যান্ডারিং মামলার আসামি হলেন। অথচ এসবই ছিলো গুজব আর গল্প কাহিনী। বর্তমানে আলী আব্বাস কেন্দ্রীয় বিএনপির কিছু সিনিয়র নেতাদের সাথে বৈঠক আর ছবি তোলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন।
কে এই আলী আব্বাস!
তথ্য বলছে চট্টগ্রাম কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটার ইউনিয়নের খোয়াজনগর এলাকার মো. আলী আব্বাস চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। বর্তমানে দলের কোনো কমিটিতে নেই তিনি। এক সময় চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য (মেম্বার) ছিলেন।
২০১১ সালে তিনি কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৪৫ কোটি ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৭৫৩ টাকা পাচার করেন। এ অভিযোগে দায়ের করা দুদকের একটি মামলায় তিনি খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক হিসেবে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে কারাগারে ছিলেন। প্রায় আড়াই বছর জেলে কাটান।
সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে আলী আব্বাস ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল) এবং কৃষি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে চাল আমদানির এলসির বিপরীতে ৭২ কোটি টাকা ঋণ নেন। কিন্তু চাল আমদানি না করে এ অর্থ তিনি বিদেশে পাচার করেন বলে অভিযোগ উঠার পর দুর্নীতি দমন কমিশন তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামে।
তদন্তে ৪৪ কোটি ৩৫ লক্ষ ৮১ হাজার ৭৫৩ টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হবার পর ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি নগরীর কোতোয়ালী থানায় দুদকের সহকারী পরিচালক মো.মাহবুবুল আলম বাদি হয়ে আলী আব্বাসসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা (নং-৪৬/১৩) দায়ের করেন। যার অভিযোগপত্র নং-৪৯৪। মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪ (২) ও ৪ (৩) ধারায় আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
মামলায় ৯ অভিযুক্তরা হলেন-জিওডেটিক সার্ভে কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কবির, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার সাবেক প্রধান মো. জাকারিয়া, ব্যাংকের সাবেক অতিরিক্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. ইউনুস, সাবেক ফরমাল অতিরিক্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট শফিউল আলম, কৃষি ব্যাংক চট্টগ্রামের সাবেক কমকর্তা ওলী নেওয়াজ খান (মৃত), ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম, সহকারি মহাব্যবস্থাপক মো. সায়েদুজ্জামান, আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখার সাবেক উপ-মহাব্যবস্থাপক ও শাখা প্রধান আলী হোছাইন।
কিন্তু আরো অভিযোগ ব্যাংকের টাকা দিয়ে নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে কর্ণফুলী, পটিয়া, বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলার একাধির স্পটে জমিজমা কিনেন। বাকি টাকা বিদেশে পাচার করেন। এরমধ্যে ২০২১ সালের ২৩ মে চট্টগ্রাম কৃষি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে বিএনপির এই নেতার নেওয়া ৮৫ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ৪৮ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করা সংক্রান্ত নথি তলব করেছে হাইকোর্ট।
কারণ যে ক্যাটাগরিতে একজন ঋণগ্রহীতা রি-সিডিউল এর সুবিধা পাবেন, আলী আব্বাস সে ক্যাটাগরিতে পড়েননি। যেহেতু তিনি ঋণ গ্রহণ করলেন খাদ্য শস্য আমদানির, পরে ঋণের টাকায় ক্রয় করলেন স্ত্রীর নামে জমি। এটি আইনবহির্ভূত প্রতারণাও বটে।
এরমধ্যে গত বছরে জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদন শুনে বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দিয়েছিলেন, সুদ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত কেন আইন কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা হবে না। এমনকি তখন আইনজীবী চঞ্চল কুমার বিশ্বাস বলেছিলেন, কৃষি ব্যাংক সম্পূর্ণ রাষ্ট্রয়ত্ত ব্যাংক।
এই ব্যাংকের সমস্ত টাকা জনগণের। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ঋণের সুদ মওকুফ করতে পারে না। তা ছাড়া আলী আব্বাসের বিরুদ্ধে এই ঋণ সংক্রান্ত দুটি মামলা রয়েছে। একটি অর্থঋণ আদালতে, আরেকটি আর্থপাচারের অভিযোগে দুদকের মামলা। দুদক প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণ পেয়েছে ঋণের টাকা তিনি বিদেশে পাচার করেছেন।
তার মালিকানাধীন মেসার্স আব্বাস ট্রেডিংকে ভোগ্য পণ্য (চাল, ডাল, চিনি, তৈল ও গম) আমদানির জন্য ঋণ দেওয়া হয় ২০১১ সালে। পণ্য এনে বিক্রির পর ঋণ পরিশোধের কথা থাকলেও ১০ বছরেও ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করেননি বিএনপির সমালোচিত নেতা আলী আব্বাস।
২০১৯ সালে নাশকতার অভিযোগে কর্ণফুলী থানায় দায়ের হওয়া এক মামলায় তিনি আরেকবার কারাগারে যান। এর আগেও ত্রুটিপূর্ণ সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ করায় দুদক আলী আব্বাসকে প্রধান আসামি করে ৪ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে আরেকটি মামলা করেন।
যার স্পেশাল মামলা নং-১৩৩/১৪। মামলাটি বিচারের জন্য স্পেশাল জজ আদালতে গেলে নতুন নম্বর পড়ে-১৩/১৬। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের অর্থঋণ মামলা ৪৫২/২০১৩ সোলেনামা সম্পাদনের মাধ্যমে কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
এক্ষেত্রে দুদক বলছে, চট্টগ্রামের মেসার্স আব্বাস ট্রেডিং এর প্রোপাইটর মো. আলী আব্বাস প্রতারণার মাধ্যমে ভূয়া জমি ও ভবনের বিপরীতে গৃহীত ঋণের টাকা নিজ নামে ও স্ত্রীর নামে ব্যক্তিগত সম্পদ এ রূপান্তর করায় দুদক ২০১৩ সালে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের করেন।
এসব নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় তিনি শিরোনাম হন, ‘ভুয়া জামানতে বিএনপি নেতাকে ৪৪ কোটি টাকা ঋণ’ ‘অবৈধ ভাবে বিএনপি নেতার ৪৮ কোটি সুদ মাফ’ বাংলা নিউজে সে সময় শিরোনাম হয় ‘ বিএনপি নেতার ৪৮ কোটি টাকা সুদ মাফের নথি তলব,’ দৈনিক আজাদী লিখেন ‘ দক্ষিণ জেলা বিএনপি নেতা আব্বাসের সুদ মওকুফের নথি চেয়েছে হাইকোর্ট,’ দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন লিখেছে ‘বিএনপি নেতা আব্বাসসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট’ দৈনিক সাঙ্গু লিখেছে বিএনপি নেতা আলী আব্বাস উধাও’ দৈনিক সমকাল লিখেছে চট্টগ্রামে ভুয়া জমি দেখিয়ে ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, দৈনিক আজাদী লিখেছে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগে ব্যবসায়ি কারাগারে।’
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, অনেকের ধারণা ছিল বিলুপ্তির পর দু-তিন দিনের মধ্যেই চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির নতুন কমিটি দেওয়া হবে। কিন্তু দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অসুস্থ হয়ে পড়া এবং এ কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম দেশের বাহিরে থাকায় নতুন কমিটি গঠনে বিলম্ব হওয়াও আরেক কারণ বলে খবর পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে মহাসচিব দেশে ফিরেছেন বলে জানা যায়।
এসব নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আব্বাস বলেন, ‘নেতাদের নানা মামলা থাকতে পারে। সেটা আইনের বিষয়। সব সময় দলের মধ্যে একটি ষড়যন্ত্রকারী গ্রুপ রয়েছে তাঁরা মাঠে ময়দানে সক্রিয় না। উপরের লেভেলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। আশা করি দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটিতে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল এবং গ্রহণ যোগ্যদের দায়িত্ব দেবে দল।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মহাসচিব বিদেশ থেকে চিকিৎসা শেষে দেশে এসেছেন। শিগগরই দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ সব মহানগরের কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আশা করি তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাহিদা মতো কমিটি দেওয়া হবে। কোন বিতর্কিত লোকজন কমিটিতে পদ পাবে না।’
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপিতে জাফরুল ইসলাম চৌধুরী সভাপতি ও শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০১১ সালে পুর্নগঠন হলে জাফরুল ইসলাম চৌধুরী আবারো সভাপতি ও গাজী শাজাহান জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যা ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে ভেঙে দেওয়া হয়।
একই বছরের ২ অক্টোবর মহানগর বিএনপি’র সিনিয়র তৎকালীন সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ানকে আহ্বায়ক এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপি’র তৎকালীন সভাপতি মোস্তাক আহমেদ খানকে সদস্য সচিব করে দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র কমিটি গঠন করা হয়।







