নারীর কাপড় খুলে তার সাথে পশুর মতো সহবাসের নামও রোমান্স নয় ।রোমান্স হচ্ছে শরীর ও মনের আবেগ ও আকর্ষণ , মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে প্যাসিয়ন বলা হয়।এতে শারীরিক টানের পাশাপাশি মানসিক টান ও উদ্দীপনা থাকে ।শুধু প্যাসিয়ন থাকলেই রোমান্স হয় না।প্রেমিক ও প্রেমিকার মাঝে ইমোশনাল ভালনারেবিলিটি তথা প্রাণ খুলে বাঁচার প্রবণতা থাকতে হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে ইনটিমেসি বলে।ভয় , দূর্বলতা সহ সব খুলে বলা যায় এমন একজন বিশ্বস্ত জীবন সঙ্গী।এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ইন্টেলেকচুয়াল ইনটিমেসি।বই , সিনেমা , রাজনীতা , সমাজ , দর্শন ও বিজ্ঞান সবকিছু নিয়ে যার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলা যায় এমন একজন জীবন সঙ্গী।
🔴শুধু টাইম পাস করা , কিংবা শরীরের ঘ্রাণ নেওয়াই রোমান্স নয়। প্রিয় মানুষটির সাথে একসাথে রান্না করা , সময় বের করে একসাথে ঘুরতে যাওয়া , পরিবারের সকল কাজে প্রিয় মানুষটিকে সহযোগিতা করা এসবও রোমান্সের অংশ ।শুধু প্রিয় মানুষটির কোলে মাথা রেখে আকাশ দেখাটাই রোমান্স নয়। নিরূপণ জীবনের সুখ ও দুঃখ প্রিয় মানুষটির সাথে ভাগ করে নেওয়া রোমান্সের অংশ।
🔴রোমান্সে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ফিজিকাল ইনটিমেসি।এটা বলতেই নুনুভুতির ভাইরাস সেক্স ছাড়া আর কিছুই বুঝে না।এটা একটা মানসিক রোগ।এই মানসিক রোগে আক্রান্তরা কখনোই রোমান্টিক কাপল ( জুটি) নয়।রোমান্টিক হতে হলে প্রিয় মানুষটিকে হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করতে হয়। দুজন দুজনকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে হয়।চুলে হাত বুলিয়ে দিয়েও ফিজিকাল ইনটিমেসি হয়। কপালের টিপ ঠিক করতে করতে অথবা ঠোঁটের লিপস্টিক ঠিক করতে গিয়ে ফিজিকাল ইনটিমেসি হয়। প্রিয় মানুষটির কপালে চুমু খাওয়া , ঠোঁটের স্পর্শে উষ্ণ হওয়া , কান পেতে হৃদয়ের স্পন্দন শোনাও ফিজিকাল ইনটিমেসি । মনযোগ দিয়ে প্রিয় মানুষটিকে বুঝতে হয়।
🔴এতকিছুর পরও রোমান্টিক কাপল হওয়া সহজ নয়।যাকে ভালোবাসো তার সাথে জীবনের সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে।এই সম্পর্কে শর্ট টাইম ও লং টাইম কমিটমেন্ট থাকা জরুরি। সম্পর্কের কমিউনিকেশন থাকাটা জরুরি । দূর থেকেও অনুভবে অনুভবে ভালোবাসা হয়।কথা না হলেও মন ও শরীর জুড়ে যেন শুধুই সে রয় ।মাঝে মাঝে ঝগড়াও বড় মধুর মনে হয়।দুটো জিনিস মাথায় রাখলে জীবনটা ভীষণ রকম রোমান্টিক ।
এক) প্রিয় মানুষটিকে কখনোই কোন মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিবে না ।
দুই) প্রিয় মানুষটি যেন সবসময় তোমার কাছে সবচেয়ে বেশি কম্পোর্টেবল ও নিরপদ বোধ করে।কম্পোর্টেবল সাইলেন্স তথা নিরবতার সৌন্দর্যের সাথে প্রিয় মানুষটির অন্তরঙ্গ অনুভুতি ছড়িয়ে থাকে ।এসব হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়।
🔴এমন বিষয় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ইউটিউবে একটি মুভি সামনে চলে এলো। মুভির নাম – ” পেহলা পেয়ার । পেহলা পেয়ার শব্দের বাংলা অর্থ হচ্ছে প্রথম প্রেম । অনেকের মতো আমিও ভেবেছিলাম প্রেম জিনিসটা বোধহয় খুব সোজা।মন ছুঁয়ে শরীর ছুঁয়ে দিলেই প্রেম হয়ে যায় না ।এই বোধটা জাগ্রত হয় ” পেহলা পেয়ার ” মুভিতে আখিল আক্কিনেনি ও ভারতীয় অভিনেত্রী পূজা হেগড়ে এর দূর্দান্ত অভিনয় দেখে।
আখিল আর আমার জীবনের গল্পের কিছু মিল আছে।আখিল আমেরিকা থেকে বিয়ে করতে দেশে আসে। পরিবার থেকে তার জন্য পাত্রী দেখা হচ্ছিল। প্রথম মেয়েটিকে দেখেই সে বলে , পছন্দ হয়েছে। কিন্তু সে তখন পছন্দের সংজ্ঞাই জানতো না। একপর্যায়ে তার পরিচয় হয়ে যায় পূজা হেগড়ের সাথে। পূজা একটি কৌতুকের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতো। তার একটি প্রশ্ন ছিল – মানুষ বিয়ে কেন করে ⁉️
🔴বাংলাদেশে আসার পর আমিও বারবার ভেবেছি , মানুষ কেন বিয়ে করে?
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে বিয়ে মানেই হচ্ছে যৌন সম্ভোগে । এরাই আসলে আহম্মক। এজন্য বিয়ের পর এরা ঘরের বউকে প্রথমে যৌন দাসী ও পরে ঘরের চাকরানি বানায়। বিয়ের পর এক এক করে নিজের বউকে তার মোহরানা দিয়ে কিনে নেওয়া ব্যাক্তিগত সম্পদ ভেবে এক এক করে বউয়ের স্বপ্ন ও ইচ্ছার কবর দেয়।। অপরদিকে একটি মেয়ের কাছে বিয়ে হচ্ছে একটি সামাজিক , পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। তাই সে মুখবুজে সারারাত স্বামীর কাছে থেকে ৭২ হুরের গল্প শুনে। ওই নারী বুঝতে পারে বিয়ের মাধ্যমে সে প্রতারিত হয়েছে।তার জন্য জান্নাতে কোন হুর নেই।ফলে এটাকে আপনি বাঙালি নারীদের কম্প্রোমাইজ , এডজাসমেন্ট ও স্যাক্রিফাইস ম্যারিজ বলতে পারেন। এক্ষেত্রে নারীর একমাত্র সম্বল হয় সবার সামনে হাসিমুখে থেকে একলা একা নিরব হলে দু’ ফোঁটা চোখের জল।
🔴আখিল পূজার ” মানুষ কেন বিয়ে করে” প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। কিন্তু মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল পূজাতে।এই মুগ্ধতা থেকে তার আর কোন মেয়েই ভালো লাগে না। অপরদিকে পূজা ছিল বাস্তববাদী।সে শুরুতেই আখিলের ২০/ ২৪ দিনে মেয়ে দেখে আবার আমেরিকা উড়ালের গল্প শুনে ছবি দেখেই তাকে রিজেক্ট তথা প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিলো।সব মেয়ে আমেরিকার বিলাসবহুল জীবনের লোভী হয় না। পূজার প্রয়োজন ছিল তার সাথে রোমান্স করতে পারবে এমনি একজন প্রিয় মানুষ। অপরদিকে আখিলের আমেরিকার দামী চাকরি, নিজের বাড়ি এসব বিবেচনায় মনে হতো সেই মোস্ট ইলিজেবল ব্যাচেলর। সুস্বাস্থ্য , আর্থিক স্বচ্ছলতা , সামাজিক মর্যাদা , পারিবারিক ঐতিহ্য , ব্যাক্তিত্ব ও আকর্ষণ সবদিক থেকে তার নিজেকেই সবচেয়ে বেশি যোগ্য মনে হতো । কিন্তু আখিলের সেই ভুল ভেঙে দিয়েছিল পূজা।
🔴অর্থসম্পদ ও শারীরিক সৌন্দর্য জীবনের সবকিছু নয়। জীবনসঙ্গী সেই হওয়া উচিত যে হবে রোমান্টিক।শুধু মুখ দিয়ে ” আমি তোমাকে ভালোবাসি” বললেই কেউ রোমান্টিক হয়ে যায় না। রাতে ফোন দিয়ে ” টেক কেয়ার জানু” বললেই সে রোমান্টিক নয়। রোমান্টিকতার বিশাল এক ব্যাপ্তি আখিল বুঝতে পারে যখন সে আমেরিকায় ফিরে যায় অর্থাৎ পূজার শূন্যতা ও তাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। শরীরের আকাঙা নয় , বরং হৃদয় ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আখিল ফিরে আসে পূজার জন্য। কিন্তু সে দেখে তার পূজা বদলে গেছে। পরিবার , সমাজ ও বিয়ের চাপ এসব সইতে না পেরে সে তার পরিবার থেকে আলাদা হয়ে গেছে।তার বিয়ের জন্য দেখা সকল পুরুষকে সে এক এক করে প্রত্যাখ্যান করছে।আখিল এটাকেই পূজার মন জয় করার সুযোগ হিসেবে নেয় এবং পূজার কাছে আসে। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসায় প্রায় সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে দাঁড়ায় নিয়তি।আখিল ও পূজা দু’জনেই সেই নিয়তির শিকার হয়। নিজের অফিসের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে এক পর্যায়ে আখিলের ব্যাক্তিত্বের প্রেমে পড়ে যায় আরেক তরুণী। একপর্যায়ে তাদের বিয়ের দিন ঠিক হয়।সেই বিবাহের দিনে জোকস বলতে আসে পূজা। সবাইকে হাসাতে গিয়ে মনের অজান্তেই প্রিয় মানুষ হারানোর শোকে সে কেঁদে দেয়।আখিল এইবার বুঝতে পারে ” মানুষ কেন বিয়ে করে” । তখন সে পারিবারিক সকল নিয়ম ভেঙে শুধুই পূজাকে চায়। একপর্যায়ে পেছনে থেকে পূজার কোমর জড়িয়ে ধরে।তার শরীরের ঘ্রাণ নেয় ।তখনি আমার সেই ডায়ালগটির কথা মনে হয়েছিল –
” যদি কেউ আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে তবে তাকে আমি আমার শরীরের সাইজ বলে দিবো।”
🔴প্রিয় বন্ধুরা , ” কারো শরীরের সাইজ জানা ও বুঝার আগে তার মনকে বুঝো। মনের সৌন্দর্যের চেয়ে বড় সৌন্দর্য এই পৃথিবীতে আর কিছুই নাই।এই পৃথিবীর স্বর্গ ও নরকের বসবাস হচ্ছে মানুষের হৃদয়। এজন্যই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলে গেছেন, “এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির – কাবা নেই। ”
রোমান্সের কোন জাত – পাত, ধর্ম ও বয়স নেই।তাই শরীরের পূজো না করে মানুষের মনকে পূজো দাও , তবেই শান্তি মিলবে।”
সত্য সবসময় সুন্দর।
লুসিড ড্রিম








