আশির দশকের কথা! স্বৈরাচার লে,জে,হু,মো, এরশাদের নতুন ফর্মূলা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদ্ধতি। নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হলো। এতকাল যাদেরকে কলারোয়ার রাজনীতির প্রাণ পুরুষ মনে করা হতো তারা সব হঠাৎ মিম্রয়মান হয়ে গেল, ঢাকায় স্থায়ী বসবাস করা এক ধনকুবেরর জৌলুসপূর্ণ প্রচারনার কাছে। নাম শেখ মনিরুজ্জামান! কলারোয়ার মানুষ তাকে আগে কখনো দেখেছে কিনা সন্দেহ! হঠাৎ ট্রাক ভর্তি, শাড়ি, লুঙ্গি, নগদ টাকার বান্ডিল টেবিলে সাজিয়ে বিপুল সংখ্যক ভোখা নাঙ্গা আমজনতার হাতে নতুন শাড়ি, লুঙ্গি আর নগদ নোট ধরিয়ে দিচ্ছিলেন তখন চারিদিকে তারস্বরে দানবীর শেখ মুনিরুজ্জামান হয়ে উঠছিলেন যেন একমূর্তিমান অবতার! মাঠের রাজনীতির পোড় খাওয়া সব রাজনীতিক শ্রদ্ধেয় মমতাজ চাচা, বিএম নজরুল ইসলাম, ফারুক স্যার, মোসলেম কমান্ডার কাকু, সোনা কাজী চাচা, হাসনাত ভাই সহ কলারোয়ার সব দলের সব তাবড় রাজনীতিকরা যেন এক ফুঁতে নিভে গেল। টাকা আর প্রচারের কাছে হেরে গেল রাজনীতি।
হিমাগার ব্যবসায়ী হাই স্কুলের গন্ডি না পেরোনো ধনঢ্য শেখ মনিরুজ্জামান হয়ে গেলেন রাজনীতিবীদ কাম উপজেলা চেয়ারম্যান। অসহিষ্ণু আচরণ, টিএনওকে মারধোরের অপরাধে নয় মাসের মাথায় ১২ জন চেয়ারম্যানের অনাস্থা প্রস্তাবে তিনি বরখাস্ত হলেন। আসলো উপ নির্বাচন! এবার শেখ মনিরুজ্জামান প্রার্থী করলেন তার স্ত্রীকে! অক্ষরজ্ঞান না জানা আটপৌরে গৃহনী হঠাৎ হয়ে গেলেন বেগম বিলকিস জামান। এবারও সেই টাকার খেলা আর প্রচারনার দৌরাত্যে কলারোয়ার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ভাষা সৈনিক শেখ আমানুল্লাহ স্যারকে জামানত বাজেয়াপ্ত করিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেন। হেরে গেল রাজনীতি জিতে গেল অবিবেচক জনগণের নির্বুদ্ধিতা।
নব্বই এর দশকের কথা! ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রেলমন্ত্রী! অতঃপর বিহারের দেড় বারের মুখ্যমন্ত্রী! লালু প্রসাদ যাদব! দ্বিতীয় বার বরখাস্ত হলেন যখন ৯৭’তে! তখন তিনি হেঁসেল থেকে ডেকে এনে তার নিরক্ষর স্ত্রীকে বিধান সভায় দাড় করিয়ে দিলেন। যে মহিলা সারা দিন রান্না ঘর আর গরুর গোয়াল সামলাতেন। জন আবেগে তিনি হয়ে গেলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী!!!! জনগণ একবারও ভাবলো না কাকে তারা তাদের নেতা বানাচ্ছেন?
পশ্চিম বাংলার একজন চমৎকার মেধাবী বিতার্কিক আছেন। নাম চন্দ্রীল ভট্টাচার্য। বাচনভঙ্গি, যুক্তির প্রখরতা, নিরবিচ্ছিন্ন বলার পটুতায় মানুষটাকে আমি দারুন পছন্দ করি। তিনি একটি বক্তিতায় বলছিলেন, গণ কখনো কোন বিষয় তলিয়ে দেখে না। তারা স্রোতে গা ভাঁসায়। যেদেশে পথের পাঁচালী লগ্নি উঠাতে পারে না, সেদেশে বেঁদের মেয়ে জ্যোৎস্না বক্স অফিস হিট করে। সেদেশেন গণের মতামত নিয়ে কিছু করা অসম্ভব!
গতকাল গাজীপুরের সিটি নির্বাচন হলো! ঝুঁট ডন জাহাঙ্গীরের অরাজনৈতিক মা গাজীপুরের মেয়র নির্বাচিত হলেন জনগণের ভোটে! মানুষ জাহাঙ্গীরের মা এর যোগ্যতা দেখে ভোট দিয়েছে এটা আমি কেন কোন বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষ বিশ্বাস করবে না। তাহলে কেন তাকে মেয়র বানানো হলো? চন্দ্রীল ভট্টাচার্যের কথায় ফিরে যাই! গণ কখনো তলিয়ে দেখে না। তারা বিষয় বস্তুর ভিতরে ঢুকে সেটা নিয়ে ভাবে না। এজন্য গণের মতামত কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত না! গণমত মানেই যে সঠিক! এটা একটি ভুল থিউরি!
কেন জাহাঙ্গীরের লেখাপড়া না জানা, অরাজনৈতিক মাকে জনগণ মেয়র নির্বাচিত করলেন? স্বাধীনতা পরবর্তী এদেশের ভোটের রাজনীতির কিছু মেরুকরণ হয়েছিল! সেটা এখনো চলমান! এদেশে ভোট মূলত দুটি ধারায় হয়! একপক্ষ আওয়ামীলীগ! অপর পক্ষ এন্টি আওয়ামীলীগ! এন্টি আওয়ামীলীগ যখন বিভক্ত হয় তখন অনায়াসে আওয়ামীলীগ জিতে যায়! আবার এন্টি আওয়ামীলীগ যখন একত্রিত হয় তখন আওয়ামীলীগ কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে!
এন্টি আওয়ামীলীগ কারা? ৫৪’র যুক্ত ফ্রন্ট নির্বাচনে একচ্ছত্র মুসলিমলীগকে হারিয়ে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় বসেছিল কিছু দিন। ৭০’র নির্বাচনে মোটামুটি জেনে গিয়েছিল এদেশের বাঙ্গালীদের মনোভাব। স্বাধীনতা পরবর্তী পরাজিত সেই গোষ্ঠিটা তাদের বাহ্যিক পরাজয় মেনে নিয়েছিল! কিন্তু ভিতরে পুষে রেখেছিল পরাজয়ের নিদারুন কষ্টটা। তারা এবং তাদেরই ছানাপোনাদের রক্তে ঢুকে গেছে পিতৃপুরুষের পরাজয়ের রোষ! এরাই মূলত এন্টি আওয়ামীলীগ! এই এন্টি আওয়ামীলীগাররা আসলে ভেবে কিংবা প্রার্থি দেখে কিংবা মেনুফেস্টো দেখে কিংবা উন্নয়ন দেখে কখনোই ভোট দেয় না। তাদের মগজেই থাকে আওয়ামীলীগকে হারাও।
তাহলে আওয়ামীলীগ কি ক্ষমতায় যাওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে? মোটেই না। ইতিহাস সাক্ষী আওয়ামীলীগ কখনো বন্দুকের নলের মুখে কিংবা জনরোষে ক্ষমচ্যুত হয়নি। তেমনি ইতিহাস সাক্ষী আওয়ামীলীগ কখনো পিছনের দরোজা দিয়ে কিংবা বন্দুক উঁচিয়ে ক্ষমতায় যায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই আওয়ামীলীগের ইতিহাস। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামীলীগ অপ্রতিরোধ্য। গাজীপুরে সেটা সম্ভব হয়নি। বরিশালেও হবে বলে মনে হচ্ছে না। দরকার ছিল শুধু জাহাঙ্গীর নয়, ক্যামেরায় বন্দী জাহাঙ্গীরের পিছনে যারা ছিল তাদেরকেও বহিস্কার করা! ঘরের মধ্যে দুঃশাসন রেখে রাবণ লঙ্কাপুরী রক্ষা করতে পারেনি। ক্ষমতা দিয়ে পাশে মীরজাফর রেখে সিরাজৌদ্দলা বাংলা রক্ষা করতে পারেনি। তেমনি ঘরের মধ্যে খুনী মোস্তাককে প্রবেশাধিকার দিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজে, পরিবার, ও বাঙ্গালীদের রক্ষা করতে পারেনি।
আগে হাইব্রিড, বেঈমান তাড়ান। ঐক্যদ্ধ আওয়ামীলীগ সুরক্ষা করুন। বিজয় সুনিশ্চিত।
Post Views: 346
Related