বাক্যটা পড়েই আমাকে চূড়ান্ত বিচার করার আগে, এই লেখাটিকে ঘৃণাভরে ছুড়ে ফেলার আগে, শেষ পর্যন্ত পড়ুন। যদি আজ আপনার এতদিনের সাজানো নৈতিকতার প্রাসাদে আমি সামান্যতম ফাটলও ধরাতে না পারি, তবে বুঝবেন এই কলম ধরার কোনো অর্থই নেই।
👉বরাবরের মতোই এই আর্টিকেলটিও আপনাকে মানসিকভাবে আঘাত দিতে পারে। পরবর্তী অংশ নিজ দায়িত্বে পড়ুন।
আমরা এক আশ্চর্য ভণ্ডামির জগতে বাস করি। যেখানে অনেক নারী মুখে সততা আর ভালোবাসার কথা বলে, কিন্তু তাদের হৃদয়ের কম্পাসটা প্রায়শই ঝুঁকে থাকে ক্ষমতা আর উত্তেজনার দিকে। তারা এমন এক দ্বৈত জীবন যাপন করে, যেখানে তাদের যৌবনের শরীরী আকাঙ্ক্ষা আর পরিণত বয়সের বাস্তবতার চাহিদা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন পুরুষের কাছে বিকিয়ে যায়। আর এই নির্মম দ্বিচারিতার বলি হয় সরল, বিশ্বাসী, ‘ভালো ছেলে’রা এবং দিনশেষে, খোদ সেই শ্রেণীর নারীরাও।
এই লেখাটি কোনো পুরুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ নয়। এই লেখাটি সমস্ত নারীকে ঢালাওভাবে চরিত্রহননের জন্যও নয়। এই লেখাটি হলো প্রেম ও বিয়ের বাজারের সেই অন্ধকার গলির ব্যবচ্ছেদ, যেখানে আবেগ হলো মুদ্রা, যৌবন হলো পণ্য, আর বিয়ে হলো এক লাভজনক চুক্তি। এই লেখাটি আপনারই হাতে আপনার মতো অনেক নারীর মুখোশটা খুলে দেওয়ার এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা।
আসুন, আপনার বা আপনার মতো অনেক মেয়ের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে ফিরে যাই। চোখটা বন্ধ করে একবার ভাবুন তো। কারা ছিল ক্যাম্পাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পুরুষ?
সেই ছেলেটা, যার একাডেমিক রেজাল্ট ভালো ছিল, যে শিক্ষকদের কথা মন দিয়ে শুনত, যে লাইব্রেরিতে বসে নোটস বানাতো, আর আপনাকে দেখলেই লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলত? নাকি সেই ছেলেটা, যার বাইকের পেছনে বসার জন্য অনেক মেয়েই মুখিয়ে থাকত? যে ক্লাস পালাতো, গিটার হাতে গান গাইতো, নিয়ম ভাঙার মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দ খুঁজে পেত এবং আপনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এমন একটা হাসি দিত, যাতে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠত?
সততার সাথে বলুন, অধিকাংশ মেয়ের মন কার জন্য কেঁপে উঠেছিল?
হতে পারে আপনি প্রথম ছেলেটার সাথে নোটস আদান-প্রদান করেছেন, তার সাহায্য নিয়েছেন, তাকে ‘ভালো বন্ধু’র তকমা দিয়েছেন। কিন্তু বহু মেয়ের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল দ্বিতীয় ছেলেটা। তার ওই বেপরোয়া ভাব, ওই ‘যা খুশি তাই করি’ মনোভাব, ওই সামান্য বিপদের গন্ধ—এগুলোই নারীসত্তার এক আদিম অংশকে জাগিয়ে তুলেছিল।
কেন এমন হয়? কারণ, প্রকৃতির নিয়মেই অনেক নারীর গভীরে এমন একজন পুরুষের প্রতি আকর্ষণ কাজ করে, যে শক্তিশালী, যে তাকে রক্ষা করতে পারবে। আর অপরিণত বয়সের চোখে, নিয়ম ভাঙাটাই ছিল শক্তির প্রদর্শন। যে ছেলেটা সমাজের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে, সে আপনাকেও আগলে রাখতে পারবে—এই ছিল মস্তিষ্কের এক সরল হিসাব। তার বাইকের গর্জন অনেক মেয়ের কাছে মনে হতো পৌরুষের গর্জন। তার সিগারেটের ধোঁয়া মনে হতো স্বাধীনতার সুবাস।
সেই বয়সে আপনারা অনেকেই তার মধ্যে কোনো ভবিষ্যৎ দেখেননি, কোনো নিরাপত্তা দেখেননি। দেখেছিলেন শুধু তীব্র, বিশুদ্ধ উত্তেজনা। তার সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত ছিল একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো। আর সেই ‘ভালো ছেলে’টা? সে ছিল বাড়ির পাশের পার্কের মতো। নিরাপদ, শান্ত, কিন্তু বিরক্তিকরভাবে অনুমানযোগ্য। বহু মেয়েই তো পার্কে হাঁটতে চায়নি, চেয়েছিল রোলার কোস্টারে চড়তে।
এই যে কামনার দাবানল, এটাই ছিল অনেকের প্রথম চালিকাশক্তি। তারা একজন প্রেমিক চায়নি, চেয়েছিল এক উত্তেজনার জোগানদার। আর সেই খেলায়, ভালো ছেলেরা জন্ম থেকেই এক পরাজিত সৈনিকের দলে।
এবার আসি সেই ভালো ছেলেগুলোর কথায়। তাদের অপরাধ কী ছিল?
তাদের প্রথম অপরাধ ছিল, তারা আপনাকে বা আপনার মতো মেয়েদের সম্মান করত। তারা শরীরের দিকে না তাকিয়ে, চোখের দিকে তাকাতো। তারা রাত কাটানোর স্বপ্ন না দেখে, সারাজীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখত। তারা নারীকে ‘মাল’ ভাবত না, ‘ভালোবাসার মানুষ’ ভাবত।
তাদের দ্বিতীয় অপরাধ ছিল, তারা ছিল সৎ। তারা মন পাওয়ার জন্য মিথ্যে অভিনয় করত না। বাইক না থাকলে পায়ে হেঁটে পথ চলতে দ্বিধা করত না। তারা যেমন, ঠিক তেমনভাবেই নিজেদেরকে উপস্থাপন করত।
তাদের তৃতীয় এবং সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল, তারা ছিল ‘সহজলভ্য’। তারা অপেক্ষা করত। একটা ফোনের জন্য, একটা মেসেজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ে থাকত। আপনি যখনই আপনার সেই ‘বখাটে’ প্রেমিকের সাথে ঝগড়া করে কাঁদতেন, আপনার চোখের জল মোছানোর জন্য এই ভালো ছেলেটার কাঁধটাই হয়তো একমাত্র আশ্রয় ছিল।
আপনার মতো এমন অনেক নারীই কী করেছেন? আপনারা তাদের সেই সম্মান, সেই সততা, সেই ভালোবাসাকে দুর্বলতা ভেবে নিয়েছেন। আপনারা তাদের নিঃস্বার্থ আবেগকে নিজের ইমোশনাল ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাদের কাঁধে মাথা রেখে আপনার বখাটে প্রেমিকের জন্য কেঁদেছেন, তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন, কিন্তু দিনশেষে ফিরে গেছেন সেই বখাটের কাছেই।
আপনারা অনেকেই তাকে বন্ধুত্বের কবরস্থানে জীবন্ত কবর দিয়েছেন। তাকে বুঝিয়েছেন যে, এই পৃথিবীতে ভালোমানুষির কোনো দাম নেই। সম্মান দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে নারীর মন পাওয়া যায় না; নারীর মন পেতে গেলে তাকে অবহেলা করতে হয়, তাকে নিয়ে খেলতে হয়।
এই ধরনের ব্যবহারের কারণেই আজ বহু ভালো ছেলে ভালোবাসার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তারা আজ সফল, প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু তাদের ভেতরটা একরাশ অবিশ্বাস আর cynical (নৈরাশ্যবাদ) ধারণায় ভরা। তারা আজ নারীকে আর ভালোবাসার মানুষ হিসেবে দেখে না, দেখে এক opportunistic (সুবিধাবাদী) প্রাণী হিসেবে। এই ছেলেগুলোকে এই ভয়ানক দানবে পরিণত করার জন্য আপনার মতো এক শ্রেণীর নারীরাই দায়ী।
সময় বয়ে যায়। নদীর জল অনেক দূর গড়িয়ে যায়। আপনার বয়স ২৫ পেরিয়ে ২৭, তারপর ৩০ ছুঁই ছুঁই। যে রোলার কোস্টার রাইডটা আপনাকে একসময় শিহরিত করত, এখন সেটাতেই আপনার মাথা ঘোরে। যে ‘বখাটে’ ছেলেটার বেপরোয়া জীবন আপনাকে আকর্ষণ করত, এখন তার কোনো ভবিষ্যৎ না থাকাটা আপনাকে আতঙ্কিত করে।
হঠাৎ করেই আপনার বা আপনার মতো অনেক নারীর হিসেবগুলো বদলে যায়। ভেতরকার আদিম প্রবৃত্তিটা ছুটিতে যায়, আর তার জায়গায় জেগে ওঠে বাস্তববাদী, হিসেবী সত্তা। বায়োলজিক্যাল ঘড়িটা টিক টিক করে জানান দেয়, এবার থিতু হতে হবে।
আর তখনই এক শ্রেণীর নারী বিয়ের বাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এবার অনেকেই আর শিকারী নয়, নিজেই একটা পণ্য। বয়স, সৌন্দর্য, পারিবারিক স্ট্যাটাস—সবকিছুই এখন ‘মূল্য’ নির্ধারণ করছে।
চাহিদার তালিকাটাও আমূল বদলে যায়।
‘বাইক’ বদলে হয়ে যায় ‘গাড়ি আর নিজের ফ্ল্যাট’।
‘গিটারের সুর’ বদলে হয়ে যায় ‘ব্যাংক ব্যালেন্সের স্টেটমেন্ট’।
‘বেপরোয়া সাহস’ বদলে হয়ে যায় ‘ভালো বেতনের চাকরি আর সামাজিক নিরাপত্তা’।
‘উত্তেজনা’ বদলে হয়ে যায় ‘স্থিতিশীলতা’।
আপনারা এখন মরিয়া হয়ে সেই ‘ভালো ছেলে’টাকেই খুঁজছেন, যাকে দশ বছর আগে ‘বোরিং’ আর ‘খ্যাত’ বলে পাত্তাই দেননি। আপনারা এখন এমন একজন পুরুষ চান, যে দায়িত্ব নেবে, ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করবে। আপনারা এখন আর প্রেমিক খুঁজছেন না, খুঁজছেন একজন নির্ভরযোগ্য ‘মানব এটিএম’ এবং ‘সোশ্যাল স্ট্যাটাস সিম্বল’।
ধরে নিলাম, আপনি আপনার কাঙ্ক্ষিত পাত্রকে পেয়েও গেলেন। সেইরকমই একজন ভালো ছেলে, যে এখন প্রতিষ্ঠিত। সে আপনাকে বিয়ে করল, কারণ তারও এখন সংসার করার বয়স হয়েছে। সে আপনাকে সম্মান দেয়, আপনার সব চাহিদা পূরণ করে। দামী শাড়ি, গয়না, বিদেশে ভ্রমণ—কোনো কিছুরই অভাব নেই। সমাজের চোখে আপনারা এক ‘পারফেক্ট কাপল’।
কিন্তু রাতের আঁধারে, যখন আপনারা দুজন এক বিছানায় শুয়ে থাকেন, তখন কি সেই উত্তাপটা অনুভব করেন? আপনার স্বামী যখন আপনাকে স্পর্শ করে, সেই স্পর্শে কি ভালোবাসা থাকে, নাকি শুধুই কর্তব্য? আপনি কি তার বুকে মাথা রেখে সেই নিরাপত্তা পান, নাকি এক শীতল দূরত্ব অনুভব করেন?
সত্যিটা হলো, বহু ক্ষেত্রে আপনি তাকে সম্মান করেন, হয়তো ভালোবাসার অভিনয়ও করেন, কিন্তু আপনি তাকে মন থেকে কামনা করেন না। আপনার শরীর হয়তো তার সাথে মিলিত হয়, কিন্তু আপনার আত্মা পড়ে থাকে অতীতের সেই উত্তেজনাময় দিনগুলোতে। আপনার অবচেতন মন এখনো সেই বখাটে ছেলেটাকেই খোঁজে। আপনি আপনার স্বামীর 안정 (স্থিতিশীলতা) চান, কিন্তু কামনা করেন আপনার পুরনো প্রেমিকের আবেগ।
আর আপনার স্বামী? সে কি বোঝে না? সে হয়তো মুখ ফুটে কিছু বলে না, কিন্তু সে জানে, সে আপনার ‘প্রথম পছন্দ’ ছিল না। সে ছিল আপনার ‘বাধ্যতামূলক পছন্দ’। সে আপনার জীবনের ভালোবাসা নয়, সে আপনার জীবনের ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’। এই উপলব্ধিটা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। সে আপনাকে সব দিতে পারে, কিন্তু আপনার কাছ থেকে সেই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগটা পায় না। ফলে, সেও ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
ফলাফল? এক ছাদের নিচে দুটি নিঃসঙ্গ आत्मा (আত্মা)র বসবাস। একটি নিখুঁত, সুন্দর কিন্তু প্রাণহীন সম্পর্ক। বাইরে থেকে দেখতে এটা একটা সুখী সংসার, কিন্তু ভেতরটা একটা সাজানো কবরস্থান। এই যে একাকীত্ব, এই যে অতৃপ্তি—এটাই বহু নারীর দ্বিচারিতার সবচেয়ে বড় শাস্তি।
শআয়নার সামনে দাঁড়ানোর সাহস আছে?
এখন বলুন, দোষটা কার? সমাজের? পুরুষের? নাকি কিছু নারীর নিজের দ্বিচারিতার?
যে ভালো ছেলেগুলোকে আপনারা যৌবনে অবহেলা করে ‘বন্ধুত্বের’ আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন, তাদেরকেই আপনারা পরিণত বয়সে স্বামী হিসেবে খুঁজে বেড়ান। আর যখন পান, তখন অভিযোগ করেন, “ও আমার মন বোঝে না, ও রোমান্টিক না।”
সে রোমান্টিক হবে কী করে? তার ভেতরের আবেগ আর বিশ্বাসকে তো আপনাদের মতো নারীরাই বহু আগে খুন করে ফেলেছে। সে এখন একজন দায়িত্ববান পুরুষ, কিন্তু তার ভেতরের প্রেমিক সত্তাটা মরে গেছে। আর তাকে খুন করেছেন আপনি।
অন্যদিকে, যে বখাটে ছেলেদের পেছনে আপনারা যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন, তারা আজও বখাটের মতোই রয়ে গেছে। তারা হয়তো অন্য কোনো তরুণীর জীবনে ঝড় তুলেছে। তাদের কাছে আপনারা ছিলেন শুধুই একটা সাময়িক উত্তেজনা, একটা ট্রফি, এর বেশি কিছু নয়।
এই নির্মম সত্যটা স্বীকার করার সাহস দেখান। ভালোবাসা কোনো মৌসুমী ফল নয় যে, এক মৌসুমে টক খাবেন আর অন্য মৌসুমে মিষ্টি খুঁজবেন। সঙ্গী নির্বাচন কোনো শপিং নয় যে, যৌবনে ফ্যাশন আর পরিণত বয়সে ডিসকাউন্ট খুঁজবেন।
আপনি যদি সত্যিই একজন ভালো সঙ্গী চান, তবে এমন একজন পুরুষকে খুঁজুন, যার মধ্যে দায়িত্ববোধের সাথে সাথে আবেগের স্ফুলিঙ্গও আছে। যার মধ্যে ভালো মানুষির সাথে সাথে আপনাকে শাসন করার মতো পৌরুষও আছে। একজন ভালো মানুষ মানেই ‘বোরিং’ নয়, আর একজন ‘বখাটে’ মানেই আকর্ষণীয় নয়। এই সাদা-কালো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন।
নাহলে, আপনার জীবনটা এভাবেই কেটে যাবে। একজন ‘নিরাপদ’ স্বামীর সাথে এক ‘অনিরাপদ’ জীবন, যেখানে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হয়তো ভরা থাকবে, কিন্তু আপনার ভালোবাসার ট্যাংকটা থাকবে শূন্য। আর সেই শূন্যতা আপনাকে আজীবন তাড়া করে বেড়াবে।
এখন বলুন, আপনার কি এখনো রাগ লাগছে? নাকি নিজের প্রতিই একরাশ ঘৃণা আর করুণা হচ্ছে? আপনার একাকীত্বের জন্য কে দায়ী—একবার ভেবে দেখবেন কি?








