বাংলাদেশে সরকার স্বীকৃত ৬ টি বিখ্যাত যৌনপল্লী আছে । যাইহোক, লেখাটি লিখতাম না, কিন্তু কিছু বাংলাদেশীদের কলকাতার যৌনপল্লী এবং ভারতকে নিয়ে খুবই বাজে বাজে মন্তব্য করায় লেখাটা লিখতে বাধ্য হলাম…
মানবসভ্যতার ইতিহাসে যৌনপল্লির অস্তিত্ব এক দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায়। যুগে যুগে মানুষ যখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে এগিয়েছে, তখনই সমাজের অন্তরালে এক অন্ধকার বাস্তবতা থেকে গেছে—যৌনপল্লি বা পতিতালয়। একে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে—গণিকালয়, বেশ্যালয়, খানকিপাড়া, পতিতাপল্লি কিংবা পতিতালয়। মূলত এটি এমন এক স্থান যেখানে টাকার বিনিময়ে যৌনসঙ্গম ঘটে থাকে, আর যাঁরা এই কাজ করেন তাঁদের আমরা যৌনকর্মী বলে থাকি।
যৌনপল্লির ধারণা কেবল আধুনিক সমাজের সৃষ্টি নয়; প্রাচীন গ্রিস, রোম, ভারতবর্ষ থেকে শুরু করে ইউরোপের মধ্যযুগ পর্যন্ত বিভিন্ন আকারে এটি বিদ্যমান ছিল। বাংলার সমাজেও এ প্রথার গভীর শিকড় রয়েছে। প্রাচীনকালে গণিকারা রাজসভায় শিল্প, সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে সম্মানিত ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁদের অবস্থান সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক সময়ে নগরজীবনের দ্রুত পরিবর্তন ও নগরায়ণের ফলে যৌনপল্লির বিস্তার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি সরকারিভাবে বৈধ হলেও, এটি সামাজিকভাবে এখনো কলঙ্কিত। অধিকাংশ যৌনকর্মী বাধ্যতামূলকভাবে এই পেশায় আসেন—দারিদ্র্য, প্রতারণা, পাচার কিংবা পারিবারিক অস্থিরতার কারণে। এদের একটি বড় অংশ কখনোই স্বেচ্ছায় এই জীবনের দিকে পা বাড়ান না। একবার যৌনপল্লির অন্ধকার জগতে প্রবেশ করলে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের উপর বাড়িওয়ালী বা সর্দারনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। সাধারণত একজন সর্দারনীর তত্ত্বাবধানে কয়েকজন থেকে শুরু করে কয়েক ডজন যৌনকর্মী কাজ করেন।
বাংলাদেশে কয়েকটি সরকারি অনুমোদিত যৌনপল্লি রয়েছে, যেগুলোর মধ্যে দৌলতদিয়া যৌনপল্লি সবচেয়ে বড় এবং সুপরিচিত। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বৃহত্তম পতিতালয়গুলোর একটি। এছাড়াও কান্দাপাড়া, টানবাজার, গাঙ্গিনাপাড়া, রথখোলা এবং সন্ধ্যাবাজার যৌনপল্লিও ইতিহাস ও পরিসরের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এসব যৌনপল্লি শুধু এক একটি স্থান নয়, বরং সামাজিক বাস্তবতার আয়না। এখানে জন্ম নেওয়া শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং সমাজের অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়।
যৌনপল্লির বিস্তারের একটি দিক হলো “ভাসমান যৌনকর্মী”। তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট পতিতালয়ে আবদ্ধ থাকেন না; বরং শহরের বিভিন্ন প্রান্তে খণ্ডকালীন বা অনিবন্ধিতভাবে এই কাজে যুক্ত থাকেন। ফলে সরকারি বা বেসরকারি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এঁদের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৮ সালে স্থানীয় এনজিওর এক হিসাবে বাংলাদেশে যৌনকর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের UNAIDS-এর হিসেবে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজারে।
যৌনপল্লির প্রশ্নে দ্বন্দ্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। একদিকে রাষ্ট্র এটি আংশিকভাবে বৈধ স্বীকৃতি দেয়, অন্যদিকে সমাজে যৌনকর্মীদের প্রতি অবজ্ঞা, ঘৃণা এবং বৈষম্য জারি থাকে। অথচ বাস্তবে এঁদের জীবন অর্থনৈতিক টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রাম ছাড়া আর কিছু নয়। অনেক গবেষক ও সমাজকর্মীর মতে, যৌনপল্লি কেবল অবক্ষয়ের প্রতীক নয়, এটি অর্থনৈতিক শোষণ, নারী পাচার এবং শ্রেণি-বৈষম্যেরও ফল।
আজকের বাংলাদেশে যৌনপল্লিকে ঘিরে নানা বিতর্ক, সামাজিক আন্দোলন ও মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা নতুন মাত্রা পাচ্ছে। যৌনকর্মীদের মানবিক মর্যাদা, তাঁদের সন্তানের শিক্ষার অধিকার এবং স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। বহু দেশে পতিতাবৃত্তি বৈধ হলেও আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; আবার অনেক দেশে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ মধ্যবর্তী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে—এখানে আইনি স্বীকৃতি থাকলেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নেই।
সুতরাং যৌনপল্লির ইতিহাস কেবল পেশাদার যৌনকর্মের কাহিনি নয়, বরং সমাজের অন্ধকার দিক, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও নারী-শোষণের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসের নানা স্তর পেরিয়ে আজও যৌনপল্লি বিদ্যমান, এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা সামাজিক কলঙ্ক বয়ে বেড়ালেও তাঁদের জীবন আমাদের সামগ্রিক সমাজচিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এঁদের জীবনসংগ্রামকে উপলব্ধি করাই আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।








