সবার সঙ্গে কথাবার্তায় স্বাভাবিক, আচরণে কোমলপ্রাণ, অঙ্গভঙ্গিতে
হাসিখুশি; কিন্তু এসবের মধ্যেই কারো কারো সঙ্গে কথা বলার সময় মেজাজ
পাল্টে যায়, আচরণ বদলে যায়, সরলতা হারিয়ে যায়। তবে এসবের সব দায়
আপনার নয়। যিনি আপনার কাছ থেকে যেমন ব্যবহার প্রাপ্য হয়েছেন, তার
অনেকটাই তার নিজের অর্জন। কারো ছায়া দেখলেও মন খারাপ হয়ে যায়, কারো
কণ্ঠ শুনলেও কষ্ট হয় কিংবা কারো উপস্থিতিতে অস্বস্তি জাগে—তবে সেটিও
সেই ব্যক্তিরই অর্জন।
কোনো কিছুতে কষ্ট পেয়ে, কারো কিছু আচরণ অপছন্দ করতে করতে আপনি যে
অভ্যাসে পৌঁছেছেন, তাতে অনেকেই আপনার নিষ্ঠুরতা, রূঢ়তা কিংবা
আত্মঅহংকার দেখবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যও হতে পারে। গল্পের আড়ালের
গল্প আবিষ্কারের নেশা আমাদের নেই। আমরা যা দেখি, সেটাই বিশ্বাস করি; যা
শুনি, সেটাকেই সত্য বলে ধরে নিই। ব্যক্তিভেদে যদি ব্যবহার ভিন্ন হয়,
পদক্ষেপ পাল্টে যায়, স্বর ও সুর বদলে যায়, তবে দৃশ্যমানের বাইরেও নিশ্চয়ই
আলাদা কিছু গল্প আছে। অন্তত তা নিয়ে ভাবা উচিত।
কেউ কেউ স্বার্থের জন্য বদলায়। কাউকে কাউকে পরিস্থিতিও বদলে দেয়। তবে
অধিকাংশ মানুষের বদলে যাওয়ার পেছনে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রই দায়ী। দূর
থেকে আমরা মানুষের সেই রূপটাই দেখি, যা সে দেখাতে চায়। যারা পাশাপাশি থাকে,
তারা না-দেখানো অনেক কিছুই দেখে। দীর্ঘদিন একসঙ্গে চললে, নিয়মিত কথা
বললে কিংবা কোনো লেনদেন থাকলে মানুষকে চেনা সহজ হয়।
মানুষ এমনি এমনি বা রাতারাতি বদলায় না। বদলে যেতে নির্দিষ্ট অভিঘাত লাগে।
নানান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিহিংসা—মোটকথা সমাজের নানা প্রভাবক মানুষকে
প্রতিদিন অল্প অল্প করে পাল্টে দেয়। স্বাভাবিক পরিবেশেও বিশেষ কারো
উপস্থিতিতে আবহাওয়াই বদলে যায়। হয় স্বস্তি আনে, নয় অস্বস্তি টানে।
অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ তার আচরণের প্রতিফলই ফিরে পায়। একজন মানুষ
আরেকজনের সামনে স্রেফ একটি আয়না।
যাদের সঙ্গে একসময় প্রাণোচ্ছল আড্ডা হতো, রাতভর সময় কাটত কিংবা না
দেখলে দুঃখ হতো, তাদের হারিয়েও আজ অনুভূতি না হওয়ার নিশ্চয়ই কারণ আছে।
স্বার্থের পৃথিবী সামনে এলে অনেক কিছুই ফিকে হয়ে যায়। যার কথায় কান আরাম
পেত, যার সঙ্গ সময়কে স্বস্তি দিত কিংবা যার উপস্থিতি হৃদয়কে শান্ত করত,
তার অবহেলা, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণেই আজ
অন্যরকম গল্পের জন্ম হয়েছে।
প্রথম দেখাতেই, একবার আলাপেই কিংবা স্বাভাবিক ব্যবহারেই মন অশান্ত হয়ে
ওঠে না। শান্তি হরণের দায় যার ওপর চাপে, একসময় তাকে ঘৃণার সমস্ত শক্তি
দিয়েই উচ্চারণ করা হয়। দূরের মানুষকে ভয় কম; যত ভয় কাছের মানুষকে, আপন
মানুষকে। জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যথা, সবচেয়ে নিষ্ঠুর আঘাত, বিশ্বাস হারানোর
সবচেয়ে বড় কারণ—অনেক সময় আপন মানুষই। যে বদলে যায়, মানুষ কেবল
তাকেই দায়ী করে। অথচ যে তাকে বদলে দেয়, তাকে প্রশ্ন করার প্রয়োজনও খুব
কম মানুষ অনুভব করে।
যার সঙ্গে মধুর সময় কেটেছে, তার সঙ্গেই চিরশত্রুতার সময় আসতে পারে, যদি
মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে স্বার্থান্ধ হয়ে বদলে যায়। মানুষের জন্য আপন থাকা সহজ,
তবু মানুষ শত্রু হওয়ার মতো কঠিন পথই বেছে নেয়। কল্পনায় শত্রু বানিয়ে
অনেকেই ঘৃণার পাহাড় গড়ে তোলে। একসময় ক্রোধের বিস্ফোরণে তাসের ঘরের
মতো ভেঙে যায় আস্থা, ভেঙে যায় বিশ্বাস-ভরসা।
মানুষ তখন সামনে-পেছনে তাকিয়ে দেখে, সে একা। জীবন নামের যাত্রায় সে যেন
নিঃসঙ্গ এক শেরপা। আবার অনেকেই জীবনের কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হতে
হতাশায় ডুবে যায়। কেউ কেউ বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হতে হতে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়
নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ জীবনের এমন দুর্বিপাকের মধ্য দিয়ে গেছে যে, আর
ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখার সাহসও পায় না। অনেক সময় মানুষই মানুষের বাঁচার
পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ায়।
জীবন অভিজ্ঞতার এক সুবিশাল ভাণ্ডার। প্রত্যেক মানুষ সেখানে নিত্য রসদ
জোগায়। বিচিত্রতার নৈপুণ্যে কারো জীবন হয়ে ওঠে ফুলের বাগানের রঙিন
প্রস্ফুটন। আবার কারো জীবন যেন ভাগাড়—পচা গন্ধে ভরা। কাছে যেতে
অস্বস্তি লাগে, আপন ভাবতে অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে হয়। সহজ বিকল্পের
যুগে সম্পর্কের জন্য পরিশ্রম করতে চায় কজন? মানুষ সস্তা আরামের খোঁজে
গিয়ে প্রকৃত স্বস্তির ভাণ্ডারই হারিয়ে ফেলেছে।
জীবনের এই উত্থান-পতনের জন্য ব্যক্তি একাই দায়ী নয়; অনেক সময় তার
পরিবেশ ও আশপাশের মানুষও সমানভাবে দায়ী। তাই সহ্যের ধৈর্য থাকা দরকার।
মানুষ যা আকাঙ্ক্ষা করে, তা সব সময় পায় না; এমন সুখস্মৃতি জীবনে খুব কমই
আসে। না-পাওয়াকে উপভোগ করতে পারলে, অপ্রাপ্তিকে জয় করতে পারলে এবং
অভিযোগ কমিয়ে আনতে পারলে সহাবস্থান সহজ হয়।
জীবন অল্পদিনের যাত্রা। তাই যতটা সাদামাটা, সহজ-সরলভাবে এখানে কাটানো
যায়, ততই মঙ্গল। আকাশছোঁয়া প্রত্যাশাই অনেককে অসুখী করে। আশা হোক
বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবেই জীবন ও সুখ পরস্পরের সমানুপাতিক
হয়ে উঠবে।
রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com









