আমাদের সম্মিলিত আশার জায়গাটিতেও শিক্ষার্থীরা। আমাদের সন্তানরাই তো কালে কালে শিক্ষার্থী। যুগে যুগে তারাই অন্ধকার থেকে আমাদের উদ্ধারকারী-ত্রাতা এবং আগামীর নির্মাতা। শিক্ষক হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে কখনোই শিক্ষার্থীদের সাথে দূরত্ব কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে সবসময় ভাবতে হবে। শিক্ষকদের জন্য শিক্ষার্থী ছাড়া বাইরের আর কোনো যুতসই ও যৌক্তিক পরিচয় নেই। আদর্শ শিক্ষকদের বড় দায়িত্ব পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদেরকে ঘিরে। ঝরে যাওয়ার শঙ্কায় পড়া শিক্ষার্থীদেরকে কীভাবে সঠিক ট্র্যাকে রাখা যায় সেটাই শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব। এখানে ব্যর্থ হলে সে শিক্ষক হিসেবেও হয়তো সফল নয়।
আজ কেবল শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করি। পড়ে না, ক্লাস করে না কিংবা কথা শোনে না। শিক্ষক হিসেবে দায় আমাদের নাই? আছে। দিনে দিনে শিক্ষার্থীদের সাথে দূরত্ব তৈরি করেছি। কেউ কেউ ছাত্র-শিক্ষকদের সম্পর্ককে নিয়ে গেছি অর্থমূল্যের বিনিময়ে। ক্লাস না করে শিক্ষার্থীদের কোচিংকেন্দ্রিকতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না এসে অনলাইনে ভাইয়ামুখী শিক্ষায় আগ্রহ হওয়া কিংবা পাঠাভ্যাসবিমুখতাসম্যক সিস্টেমের ব্যর্থতার ফল। যে দায় যুগ যুগ ধরে তৈরি হয়েছে সেটার এখন খেসারত দেওয়ার কাল চলছে। ক্ষতিপূরণ শেষ হলে অমানিশার অন্ধকারও দূর হবে। স্বপ্ন দেখি, আবার আলোয় উদ্ভাসিত হবে বিশ্ব।
শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে প্রত্যাশার যে পারদ চাপিয়ে দেওয়া হয় তা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরসক্ষমতার অনেকটাই বাইরে। কত শত জঞ্জালে জড়িয়ে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকেজো করে রাখার পায়তারাদীর্ঘদিনের। এখনও পরিসংখ্যান নিলে দেখা যাবে, শ্রেণি কার্যক্রমের বাইরে কোচিং ও প্রাইভেট সংস্কৃতির সম্পৃক্ততার শিক্ষকদের নেতৃত্ব বেশি। কোনো কোনো শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক পরিচয়ের চেয়ে কোচিং-প্রাইভেটের শিক্ষক হিসেবে বেশিনামকরা। কারো কারোপ্রাইভেটের বিজ্ঞাপন ক্লাসরুমে পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়। শিক্ষকরা যখন ‘মান’ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন তখন গর্ব করার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে কোচিং-প্রাইভেট পাবেন? তবে স্কুল, কলেজগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব বেশি কেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেমানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষকের অভাব, ক্লাসরুমের ঘাটতি, ক্লাস টাইমের ত্রুটি সর্বোপরি শিক্ষায় আনন্দের অভাব। শিক্ষা ব্যবস্থতাতেওআধুনিকতারছোঁয়ার ঘাটতি। কেবল পরীক্ষাভীতিজাগিয়ে তো শিক্ষা ব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়া যাবে না। যুগোপযোগী কারিকুলাম দিতে হবে, এক্সটা কারিকুলারএক্টিভিটিস এক্টিভ করতে হবে, শিক্ষকদেরকে আধুনিক সুযোগসুবিধা দিতে হবে। মোটকথা, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে না পারলে যোগ্য জাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আমাদের অবকাঠামো বিনির্মানে যতটা আকর্ষণ ততটা মনোগত জগতের গঠন ও উন্নয়নে নাই। এই আগ্রহ না থাকার অন্তরালের কারণও স্পষ্ট!
দীর্ঘদিন দেশে সুশিক্ষার খরা গেছে। নকল করে, পরীক্ষার আগে প্রশ্ন পেয়ে, অটোপ্রমোশন ও পাশ দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে হ-য-ব-র-ল ব্যবস্থা প্রবেশ করেছে তা রাতারাতি দূর করা যাবে না। দূ্র্গতিদূরীকরণে দরকার মাস্টারপ্ল্যান। এখানে এখন অতি কঠোর পদক্ষেপে সামাল দিতে গেলে ভাঙবে, মচকাবে। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় শিক্ষাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর আনতে হবে। বর্তমান সরকার ও শিক্ষামন্ত্রী শুরু থেকেই শিক্ষাকে যেভাবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তাতে সুশিক্ষার পরিবেশ শীঘ্রই ফিরবে। সেক্ষেত্রে সকল শ্রেণিরঅংশীজনের সহযোগিতা লাগবে।
তবে যা যা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক তাতে যেন শিক্ষার্থীদের স্বার্থ মূখ্য হয়। প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখানো আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে তা শিক্ষার্থীদেরকে বিগড়ে দিয়ে নয় বরং ভালোবেসে। বুঝিয়ে, অনুপ্রেরণা দিয়ে। শিক্ষার্থীদের বয়স এবং বাস্তবতা বিবেচনা করে, তাদের আবেগ এবং পারিপার্শ্বিকতার মূল্যায়ন করে তাদের প্রতি সদয় মনোভাব, সহানুভূতিশীল এবং সহমর্মী হতে হবে। অহেতুক কঠোরতা, অনৈতিক প্রশ্রয় প্রবণতা এবং অযৌক্তিক জটিলতার পথ এড়িয়ে প্রজন্মকে ডিল করতে হবে। দায়িত্বশীলদের ভাষায় মোড়াতে হবে অলঙ্কার।
গত শতকের প্রজন্মের চেয়ে এই প্রজন্মের ভাষা, বুঝ এবং আচরণ ভিন্নরকম। এদেরকে তো সেকেলে ধ্যান-ধারণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বরং বর্তমানের জন্য যেটা বেস্টসেটাকেই তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। অতীতের মূল্যবোধ দিয়ে এদেরকে মাপতে গেলে, বিচার করলে বিলক্ষণ ভুল হবে। বিগত দিনের শিক্ষার্থীদেরকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও নতুন প্রজন্মকে সাহস দিয়ে সামলাতে হবে। যারা চব্বিশের গণ-অভ্যূত্থানের সরাসরি প্রত্যক্ষ অংশীজন, তাদেরকে কোনো চাপে ফেলে, ভয় দেখিয়ে কিংবা ষড়যন্ত্র করে অধিকার ও ন্যায্যতাভোলানো যাবে না। দমানোর প্রবণতাও আত্মঘাতী হবে। তাদের সাথে মিশতে হবে, বসতে হবে এবং মন খুলে কথা বলতে ও শুনতে হবে। তবেই তাদের ওপর প্রভাবক হওয়া সহজ হবে।
ভুল বড়রাও করতে পারে, ছোটদের ভুল করা তো শেখার স্বার্থেই জরুরি। তবে ভুল হলে স্বীকার করা, ‘সরি’ বলা এসব ইতিবাচকদৃষ্টিভঙ্গি। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা, সার্বিক স্থিতিশীলতা এবং শিক্ষার্থীর দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে উভয় পক্ষের নমনীয়তা এবং সচেতনতা জরুরি। কেউ যাতে রাষ্ট্রের ক্ষতি করতে না পারে, ইন্ধন দিয়ে নিজেদের ধ্বংস ঘটাতে না পারে সে ব্যাপারে সম্যকভাবে সজাগ থাকতে হবে। বর্তমান সরকার শিক্ষা ও শিক্ষার্থী বান্ধব। এই ইতিবাচক পরিবেশকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। শিক্ষার্থীদের যাতে আন্দোলন করে অধিকার আদায় করতে না হয় সে ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশের সজাগ থাকা জরুরি। শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব অধ্যয়নে মনোনিবেশ করা। যারা পড়ে তারা গড়ে। পরীক্ষায় কী আসবে সেটা শিক্ষার্থীদের কাছে গৌণ ভাবনা হওয়া উচিত। সিলেবাসের আলোকে যে পড়ে সে পারে। কঠিনকে যে সহজ করে নিতে পারে সেই তো জীবনমেয়াদি দৌড়ে সবার থেকে এগিয়ে থাকে।
সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের দায়িত্ববোধের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। সন্তানকে সুপথে রাখার, তাদেরকে তাদের জন্য মঙ্গলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার বড় দায়িত্ব পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের। ক্যারিয়ারগড়তে গিয়ে, পয়সা ও খ্যাতির পিছনে ছুটতে গিয়ে সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে ভুলে গেলে কোনো অর্জনই জীবনের কোনো কাজে আসবে না। যার কাল পরীক্ষা সে আজ সারাদিন বাইরে আন্দোলন করতে গেলে কী ক্ষতি তা যদি একসাথে বসে না বোঝান তবে এই ক্ষতির ক্ষতিপূরণ কী? অভিভাবকগণ যেন কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্র, সরকার, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরীক্ষাকে তাদের সন্তানদের শত্রু না ভাবে। যদি তা ভাবে তবে তাতে কিছুই অর্জন হবে না বরং সব সম্ভাবনা মুকুলেই বিনষ্ট হবে। চ্যালেঞ্জে ফেললেই বোঝা যায় কতদূর দৌড়াতে পারবে!
পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সৌহার্দ্যমূলক যোগাযোগ রক্ষা করেই একটা উন্নত জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে সর্বোচ্চ পুঁজি ভাবতে হবে। আজকের শিক্ষার্থীদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারলেই আগামীদিনে সঠিক প্রতিফল পাওয়া যাবে। সকল ধরণের বিপথ ও বিপদ থেকে শিক্ষার্থীদেরকে ফিরিয়ে রাখার জন্য সে পথগুলোকেই বন্ধ করে দিতে হবে। সমাজে অন্যায়-বৈষম্য চালু রেখে, নেশা-আড্ডার সুযোগ রেখে প্রজন্মকে সুস্থ করে গড়ে তোলা যাবে না। সততার পরীক্ষায় যাতে আমাদের সন্তানেরা পাশ করতে পারে সেজন্য প্রথমেই আমাদেরকে সততার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে— অভিভাবক হিসেবে, শিক্ষক হিসেবে, সরকার হিসেবে— এ দায়িত্ব সবার। সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সন্তানদের থেকে সর্বোচ্চ ফলটাই আমরা ঘরে তুলতে চাই। স্বপ্ন দেখি, আজকের শিক্ষার্থীরাই আমাদের স্বপ্নে দেখা দেশের চিত্রটাকেবাস্তবতায় রূপ দেবে। মুকুলেই যেন স্বপ্ন না ঝরে!
রাজুআহমেদ, প্রাবন্ধিক।
raju69alive@gmail.com









