তার বরটা ছিল বিদেশফেরত। শসার বুকের মতো গায়ের রং, নেশাভাঙ করে না, স্বভাব-চরিত্রও মন্দ না। অথচ আপুটা সংসার করতে পারল না। জানতে পারলাম, আপুই নিজে উদ্যোগী হয়ে ডিভোর্স দিয়েছে।
ডিভোর্সের বেশ কয়েক বছর পরও আপুকে একা থাকতে দেখে একদিন কৌতূহল থেকে জানতে চাইলাম,
“আচ্ছা আপু, আপনার এক্স বরের কি সমস্যা ছিল? আসল সমস্যা কী ছিল?”
আপু দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল,
“বলার মতো তেমন কোনো সমস্যা না। তবে আমি থাকতে পারলাম না। অন্য কেউ হলে হয়তো পারত, দিব্যি সংসার করত, সন্তান হতো, একসাথে বৃদ্ধ হতো। আমার পক্ষে থাকা সম্ভব হয়নি।”
আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম,
“টাকা-পয়সাও তো ছিল শুনলাম। তাহলে আসল সমস্যা কী?”
আপু হেসে উত্তর দিলেন,
“দরিদ্র মানুষের সাথে থাকা যায়, কিন্তু ছোটলোকের সাথে নয়। ব্যাটা বিদেশ থেকে এসেছে, তার পকেট ভর্তি টাকা, মোবাইল ভর্তি ব্যালেন্স, অথচ সে সিএনজি ড্রাইভারকে মিসকল দেয়, টাকা খরচের ভয়ে কল দেয় না। ঈদের আগে দেশে আসায় শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য নতুন পোশাক কিনতে হয়েছে, তাই প্রতিজ্ঞা করেছে ঈদের আগে আর দেশে আসবে না। বাপু, তুই ঈদের আগে আয় বা পরে আয়, কিন্তু আমার কাছে আর আসিস না। তিন মাস ছিলাম, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আর একদিনও থাকতে পারিনি।”
সেদিন আপুর কথা শুনে হেসেছিলাম। বয়স কম ছিল, জীবনঘনিষ্ঠ সমস্যাগুলো বোঝার মতো পরিপক্বতা তখনো আসেনি, তাই বুঝতে পারিনি।
আমার আম্মার দিকের লতায়-পাতায়, পাতায়-লতায় প্যাঁচানো এক আত্মীয়ের শ্বশুরবাড়ি আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। আমি জানতাম না। তাদের সন্ধান পেয়েছি গতবছর বন্যার সময়। ধরি, মেয়েটার নাম লাকি (ছদ্মনাম)।
আমি বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করার সময় তাদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেছিলাম, যেন তাদের জন্যও কিছু করতে পারি।
তাদের বাড়ি বন্যার পানিতে প্রায় দুই মাস ডুবে ছিল। দরিদ্র পরিবারটা সহায়-সম্বল হারিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এসে উঠেছিল।
আমার ফোন পেয়ে ভদ্রলোক ভীষণ খুশি হয়ে ত্রাণের আশায় ছুটে এসেছিলেন। তিনি তিন হাজার টাকার ত্রাণ নিতে এসে আমার বাচ্চাদের জন্য চিপস, চকলেট, চানাচুর, জুস, বিস্কুটসহ প্রায় পাঁচশ টাকার উপহার এনেছিলেন। ভদ্রলোকের এমন কার্যকলাপ দেখে আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি বেশ কয়েকদিন। অবশ্য ফোন করে তখন আমি তাকে এই পাগলামির জন্য বেশ বকেছিলাম।
গত দুই বছর আর তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ হয়নি।
আমার শ্বশুরবাড়িতে প্রচুর আম। খাওয়ারও কেউ নেই, পাড়ারও কেউ নেই। মানুষ দিন-রাত চুরি করে আম নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে আম্মা কিছু আম পাড়িয়ে ভাড়াটিয়াদের বাসা, পাড়া-প্রতিবেশী আর কাছাকাছি থাকা পরিচিত আত্মীয়দের বাসায় পাঠান।
আমার আশেপাশে তেমন কোনো আত্মীয় নেই, আবার আম দেওয়ার মতো পরিচিতও কেউ নেই। বাবার বাড়িও দূরে, তাদেরও আমগাছ আছে।
হঠাৎ আমার লাকিদের কথা মনে পড়ল। শুনেছি তাদের বাড়িতে কোনো আমগাছ নেই। তাই আমি লাকির জামাইকে ফোন করে আম নিতে আসতে বললাম।
ভদ্রলোক আমার ফোন পেয়ে আম নিতে ছুটে এলেন। সঙ্গত কারণে আমি তাকে বাড়িতে না ডেকে ছেলেকে দিয়ে রাস্তার পাশে আম পাঠালাম।
আজও লোকটা আম নিতে এসে চকচকে একটা দুইশ টাকার নোট আমার ছেলের পকেটে গুঁজে দিয়ে আম নিয়ে চলে গেল। এরপর বারবার ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করেছে, বাচ্চাদের জন্য কিছু আনতে পারেনি বলে।
আমি আজও ভদ্রলোকের আচরণে বোকা বনে যাই। কী বলব, বুঝে উঠতে পারি না। শুধু বললাম,
“আমরা বাচ্চাদের হাতে কখনো টাকা দিই না।”
আসলে ধন থাকলে মানুষ ধনী হয়, কিন্তু মন না থাকলে মানুষ, মানুষ হতে পারে না।
আমাদের চারপাশে কত ধনী আছে, কিন্তু মানুষ আছে কয়জন?
হঠাৎ করেই আজ লাকি মেয়েটাকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হলো। তার বর হয়তো তাকে দামী কাপড় কিংবা উন্নত জীবন দিতে পারেনি, কিন্তু নিরাপত্তা আর নিশ্চয়তা দিতে পেরেছে।
ও হ্যাঁ, লাকির বর ভদ্রলোক একবারও আমার ফোন রিসিভ করেনি। কেটে দিয়ে নিজেই ফোন করেছে.









