আমি একজন মেয়ে। আমার বয়স ৩০ বছর। আমি ঢাকায় থাকি। আমি একটা কিন্ডারগার্টেনের টিচার। আমি অবিবাহিতা। আমার থেকে ৩ বছরের ছোট একটা বোন ছিল, সে মা-রা গেছে। শুরু থেকেই আমার প্ল্যান ছিল, আমি অনার্স কমপ্লিট করে তারপর বিয়ে করব। আমার বাবা-মাও এতে রাজি ছিলেন। অনার্স শেষ হলে তারা আমার জন্য ছেলে খুঁজবেন, আর আমি সেই সময় মাস্টার্সে ভর্তি হবো। মাস্টার্স চলাকালীন সময়েই বিয়ে করবো—এটাই ছিল আমাদের পরিকল্পনা। কিন্তু আমার যখন ২৪ বছর বয়স, আমি তখন ফাইনাল ইয়ারে পড়ি। বাবা-মা তখনই আমার জন্য ছেলে দেখা শুরু করেন। আমার বোনের তখন ২১ বছর বয়স। তখন আমাদের পরিবার জানতে পারে, সে একজন ছেলের সাথে রিলেশনে আছে। তারা ওকে সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে চাপ দেয়। কিন্তু সে কাউকে না জানিয়ে কাজী অফিসে বিয়ে করে ফেলে।
এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আমাদের এলাকায় অনেক বদনাম রটে। যদিও বিয়ের এক মাসের মধ্যে দুই পরিবারই বিষয়টি মেনে নেয়। কিন্তু ছোট বোনের এই ঘটনার পর আমার বিয়ের আলোচনা পরিবার থেকে স্থগিত হয়ে যায়। এরপর যখন আমার বয়স ২৬ এর বেশি, তখন একজন ছেলের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের তারিখও এক মাস পর নির্ধারিত ছিল। তখন তিনি আমাকে একবার ঘুরতে নিয়ে যান। আমরা কিছুটা কথা বলতাম, যোগাযোগ ছিল। কিন্তু বিয়ের মাত্র চার দিন আগে তিনি আরেকজন মেয়েকে বিয়ে করে অন্য শহরে চলে যান এবং আমাকে ব্লক করে দেন। এই ঘটনাটিও জানাজানি হয়, আবার আমাদের বদনাম হয়। আমার খুব কষ্ট লাগে, কারণ এটিই ছিল জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের সাথে ঘুরে দেখা এবং কথা বলা (আমি সব সময় মেয়েদের স্কুল-কলেজে পড়েছি)।
এরপর আবার বিয়ের আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়।
এর মধ্যে আমার বোন মা-রা যায়। তখন তার বাচ্চার বয়স ছিল ১ বছর। বলতে গেলে আমি আর আমার মা তাকে বড় করছি, বিশেষ করে আমি। আমি ৩-৪ ঘণ্টা স্কুলে থাকি, বাকি সময়টা প্রায় সময় তার সাথে থাকি। তার বাবা প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এসে তাকে দেখে যায়। রাতে প্রায়ই আমাদের সাথেই খাওয়া-দাওয়া করেন। এখন বাচ্চার বয়স ৩ বছর, সে আমাকে “মা” বলে ডাকে। এখন দুই মাস আগে আমার বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজন আসেন। ওর শাশুড়ি প্রায়ই আসেন। এসে বাচ্চাকে নিয়ে যান আবার সন্ধ্যায় দিয়ে যান, অথবা আমরা গিয়ে নিয়ে আসি। এইবার অনেকদিন পর তারা এসেছিলেন, কিন্তু আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। তারা চারজন বসে কথা বলছিলেন। আমি বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। মাঝে মাঝে চা-নাস্তা বানিয়ে দিয়ে এসেছি। তখন বাচ্চার বাবা সেখানে ছিলেন না।
দুই ঘণ্টা পর আমাকে ডাক দেওয়া হয়। আমি গেলে তারা বলেন, তারা চান আমি যেন আমার ছোট বোনের স্বামীকে বিয়ে করি। তাদের মতে, বাচ্চার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো হবে। আমি আসলে কী বলবো বুঝতে পারছি না। আমি বাচ্চাটাকে ছাড়া থাকতে পারি না, নিজের সন্তানের মতো বড় করছি। বাচ্চাকে কেউ এক রাতের জন্যও নিতে পারে না। আমি না থাকলে সে সারারাত কাঁদে। এমন অবস্থায় যদি আমার অন্য কারও সাথে বিয়ে হয়, তাহলে বাচ্চার কী হবে? আর আমি নিজেও তাকে ছাড়া কীভাবে থাকবো, সেটাও জানি না। আর কথা হলো, আমার বোনের স্বামী আমার চেয়ে প্রায় দেড় বছরের ছোট। সে আমাকে “আপু” বলে ডাকে। তাকে কীভাবে বিয়ে করবো, বুঝতে পারছি না।
এসব ভাবলেই খুব মানসিক চাপ লাগে। এখনো আমার বোনের ব্যবহার করা জামাকাপড়, চিরুনি, ব্রেসলেট, জুয়েলারি সবকিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা আছে। আমি বুঝি, সে এখনো আমার বোনকে অনেক ভালোবাসে। তাহলে আমি কীভাবে এর মধ্যে ঢুকবো?
যে বিছানায় আমার বোন শুয়েছে, সেই বিছানায় কীভাবে আমি শুবো? যে মানুষের বুকে মাথা রেখে আমার বোন ঘুমিয়েছে, তার বুকে আমি কীভাবে মাথা রাখবো? এসব ভাবলেই খুব অস্বস্তি লাগে। এর মাঝে তিনি আমাকে একদিন বাইরে কথা বলতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সারাদিন কথা বলে যা বুঝলাম, তিনি বিয়েতে রাজি, যদি আমার কোনো আপত্তি না থাকে এবং আমি বাচ্চাটাকে সারাজীবন নিজের সন্তানের মতো দেখি। তিনিও একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। তিনি পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট। বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকেন। বাচ্চাটা পুরো সময় আমার সাথেই থাকবে। তার পরিবারও চায়, তাকে বিয়ে দিতে। তাদের মতে, অন্য কাউকে বিয়ে করার চেয়ে বাচ্চার খালাকে বিয়ে করা ভালো হবে, যিনি বাচ্চাটাকে বড় করছেন। তিনি আমাকে এসবই বলেছেন। কিন্তু সত্যি বলতে, তিনি অনেক ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ। তার মধ্যে ম্যাচিউরিটি আছে, সবকিছু গুছানো।
তবে নিজের চেয়ে দেড় বছরের ছোট একজনকে বিয়ে করা, তাও আবার নিজের বোনের স্বামী—এই বিষয়টা আমার কাছে খুবই বিব্রতকর লাগছে। যদিও আমাকে দেখতে তার চেয়ে ছোট লাগে, কিন্তু বাস্তবে আমি বড়।
তারপরও তিনি আমার বোনকে অনেক ভালোবাসেন। তার বাসায় গেলে প্রতিটা জায়গায় আমার বোনের স্মৃতি আছে। আলমারিতে এখনো আমার বোনের জামাকাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখা আছে। আমি এগুলো ভাবতেই পারি না। আমি ভেবেছিলাম, আমার বোন মা-রা যাওয়ার পর হয়তো আমি বিয়ে করলে বাচ্চাটার কী হবে—এই চিন্তা সবসময় আমাকে ভয় দিত। এখন আমি সত্যিই খুব কনফিউজড। কি করা উচিত আমার?
পাঠিয়েছেন









