সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আমরা ঘরের দরজায় বা গলির মোড়ে যে ময়লার স্তূপ দেখি, তা আমাদের কাছে কেবলই দুর্গন্ধযুক্ত এক আপদ। অথচ আধুনিক বিশ্বে এই ‘আপদ’ বা বর্জ্যই হচ্ছে অন্যতম মূল্যবান জাতীয় সম্পদ। উন্নত দেশগুলো যখন বর্জ্যকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করছে, তখন আমাদের দেশে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য ল্যান্ডফিলে গিয়ে পরিবেশ, মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি বিষাক্ত করছে। আমাদের এই সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খামতি বদলে ফেলার এখনই উপযুক্ত সময়।
উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও আমাদের বাস্তবতা
উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সুইডেন আজ তাদের উৎপাদিত বর্জ্যের মাত্র এক শতাংশেরও কম মাটিতে ফেলে। বাকি পুরোটা তারা বিদ্যুৎ, ঘর গরম করার জ্বালানি কিংবা উচ্চমানের জৈব সারে রূপান্তর করছে। এমনকি নিজেদের প্ল্যান্ট সচল রাখতে তারা বিদেশ থেকে বর্জ্য আমদানি করছে। সিঙ্গাপুর সাগরের বুকে বর্জ্যের ছাই দিয়ে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র বানাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপান এআই সেন্সর ও রোবোটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে বর্জ্য সংগ্রহ ও আলাদা করার কাজটি নিখুঁতভাবে করছে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে হয়তো রাতারাতি এমন শতভাগ রোবোটিক প্রযুক্তি আনা সম্ভব নয়, কিন্তু আমাদের রয়েছে একটি বড় শক্তির জায়গা। বাংলাদেশের বর্জ্যের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই হচ্ছে জৈব বা পচনশীল বর্জ্য। এই বিপুল পরিমাণ পচনশীল আবর্জনাকে যদি আমরা সঠিকভাবে ‘অ্যানারোবিক ডাইজেস্টর’ বা আধুনিক কম্পোস্টিং প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করতে পারি, তবে তা দেশের কৃষিখাতে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটাবে।
কৃষির আধুনিকায়ন ও সারের চাহিদা হ্রাস
বর্তমানে আমাদের কৃষিখাত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে এক নীরব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মাটির প্রাকৃতিক উর্বরা শক্তি কমছে, নষ্ট হচ্ছে উপকারী অণুজীব, আর প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ইউরিয়া বা টিএসপি সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। অথচ শহরের কাঁচাবাজার ও বাসাবাড়ির পচনশীল বর্জ্যকে যদি বাণিজ্যিকভাবে উচ্চমানের জৈব সারে রূপান্তর করে কৃষকের কাছে সুলভে পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে রাসায়নিক সারের ওপর আমাদের ক্ষতিকর নির্ভরতা নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। এটি একদিকে যেমন আমাদের মাটির স্বাস্থ্য ফেরাবে, অন্যদিকে নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করবে।
বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা ও টেকসই সমাধান
এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের একটি ত্রিমুখী বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনায় হাঁটতে হবে:
উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ: প্রতিটি বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা দুটি ডাস্টবিনে ফেলার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। মিশ্র বর্জ্য থেকে পরে সম্পদ আলাদা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন।
প্লাস্টিক ও ই-বর্জ্যের জন্য আর্থিক প্রণোদনা: সাধারণ মানুষ যখন জানবে নির্দিষ্ট বুথে প্লাস্টিকের বোতল বা ভাঙা ইলেকট্রনিক্স জমা দিলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি টাকা বা রিওয়ার্ড পয়েন্ট পাওয়া যাবে, তখন কেউ আর তা ড্রেন বা নদীতে ফেলবে না। একই সাথে উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়িত্ব বা Extended Producer Responsibility (EPR) নীতি আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের বর্জ্য রিসাইকেল করতে বাধ্য থাকে।
অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: দেশের লাখ লাখ টোকাই ও ভাঙারি ব্যবসায়ী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্জ্য আলাদা করার কাজ বছরের পর বছর ধরে করছেন। তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, সেফটি গিয়ার ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় এনে ‘গ্রিন জব’ বা পরিবেশবান্ধব পেশার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।
বর্জ্যকে অভিশাপ না ভেবে সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতাই পারে বাংলাদেশকে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাবলম্বী ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্রে পরিণত করতে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে আমরা যদি এখন থেকেই বর্জ্যভিত্তিক একটি বৃত্তাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমি গড়ে তুলতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের শহরগুলো আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হবে। নীতিনির্ধারক, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত ও জরুরি পদক্ষেপই পারে এই সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান এনে দিতে।
ছামিউল আলম রাসু
সাংবাদিক, অধিকার কর্মী।








