গাজীপুর আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কঠোর মনোভাব বুঝে গাজীপুরে নৌকাকে জয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এখানকার গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতাদের চাপে জাহাঙ্গীরের পাশ থেকে সরে যাচ্ছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা। এতে স্বস্তি ফিরছে আওয়ামী লীগের নৌকা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা আজমত উল্লাহ খানের শিবিরে। দলের বিদ্রোহী প্রার্থীও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারাও তাঁদের নেতাকর্মীদের নৌকার পক্ষে কাজ করতে কঠোর নির্দেশনা দিচ্ছেন। সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা গাজীপুরে এসে কর্মিসভা করেছেন। আজ মঙ্গলবার যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার সঙ্গে গাজীপুরে আসবেন কর্মিসভা করে নেতাকর্মীদের কঠোর দিকনির্দেশনা দিতে। এমন তৎপরতার পর জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠরা বেশ চাপে পড়েছেন।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের দু-একজন সাবেক নেতা ও ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী এখনো জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আছেন। গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, গাছা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ রানা, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য মঈনুল হোসেনসহ কয়েকজন নেতাকে এখনো পাশে পাচ্ছেন জাহাঙ্গীর।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, গাজীপুরে আওয়ামী লীগকে বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান ও সাধারণ সম্পাদক আতাউল্লাহ মণ্ডল। এই নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাকে বিজয়ী করতে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে একাধিক নেতা নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে মাঠে নামতে না পারলেও নিজেদের অনুসারীদের নৌকাকে বিজয়ী করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লাহ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দলের নেতাকর্মীদের শতভাগ সহযোগিতা পাচ্ছি। আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী কাজে নেমে গেছে। এখন পর্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে আমাদের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড করতে হচ্ছে। মহানগর থেকে শুরু করে থানা, থানা থেকে ওয়ার্ড, ওয়ার্ড থেকে ৪৮০টি কেন্দ্র পর্যন্ত ঘরোয়া কর্মিসভা করে ফেলেছি। নির্বাচনের যে প্রস্তুতি, মোটামুটি সেই প্রস্তুতি নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এগুলোতে কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে না।’
নির্বাচনের মাঠে বিএনপির পদধারী এক ডজন নেতা : সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয়ভাবে বর্জন করেছে বিএনপি। কিন্তু গাজীপুরে স্থানীয় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অন্তত ডজনখানেক নেতা ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া ৫৭ ওয়ার্ডের বেশির ভাগেই বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা প্রার্থী হয়েছেন।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য হাসান উদ্দিন সরকারের ভাতিজা শাহনুর ইসলাম স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হয়েছেন।
নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে যাঁরা কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নগরীর ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে পুবাইল থানা বিএনপির সদস্যসচিব নজরুল ইসলাম খান, ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডে টঙ্গী পূর্ব থানা বিএনপির সদস্যসচিব শফিউদ্দিন শফি, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে সদর থানা বিএনপির আহ্বায়ক ও বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান আজমল ভূইয়া, ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে বাসন থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর আহমেদ, ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে গাজীপুর মহানগর শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ও বর্তমান কাউন্সিলর ফয়সাল আহামেদ সরকার, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে বাসন থানা বিএনপির সদস্যসচিব বর্তমান কাউন্সিলর মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী মুসা, ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তানভীর আহম্মেদ, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর ও সদর মেট্রো থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হান্নান মিয়া, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে গাছা থানা বিএনপির সদ্য সাবেক সদস্যসচিব ফারুক খান, ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ওয়ার্ড বিএনপির সদস্যসচিব আউয়াল সরকার ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ডে মহানগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি সুলতান উদ্দিন আহম্মেদ। এ ছাড়া নগরের ২৩, ২৫, ২৯, ৩৪, ৪৯, ৫৫ সহ বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডেও বিএনপিকর্মী, সাবেক নেতারা প্রার্থী হয়েছেন।
জাহাঙ্গীরের রিট খারিজ : গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যে রিট করেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম, তা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্টে। মনোনয়নপত্র দাখিলের দিন পর্যন্ত ঋণখেলাপির তালিকায় জাহাঙ্গীর আলমের নাম থাকায় খারিজ করা হয় বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ফিদা এম কামাল ও এম কে রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মোহাম্মদ মোরশেদ। সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস।
আদেশের পর জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর গত ৩০ এপ্রিল গাজীপুর সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ফরিদুল ইসলাম মেয়র পদে জাহাঙ্গীর আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। পরে আপিলে এ নির্বাচনে আপিল কর্তৃপক্ষ ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার সাবিরুল ইসলাম রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।







