গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি। আগামী বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে রাজধানীর সঙ্গে লাগোয়া দেশের সবচেয়ে বড় এই সিটি করপোরেশনে। সে হিসেবে আজ মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে নির্বাচনী প্রচারণা। কে হচ্ছেন গাজীপুর সিটির পরবর্তী নগরপিতা না নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ।
প্রচারণার শেষ দিকে এসে ব্যস্ত সময় পার করছেন মেয়র থেকে শুরু করে কাউন্সিলর প্রার্থীরা। দিনরাত বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। নেতাকর্মীদের কারোই দম ফেলার ফুরসত নেই। সবাই সকাল-সন্ধ্যা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভোট প্রার্থনা করছেন। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা সবখানে জমে উঠেছে নির্বাচনী আমেজ। পথসভা, কর্মীসভাসহ নানা উপায়ে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যস্ত প্রার্থীরা। তবে ভোটাররা বলছেন, নাগরিক সমস্যা সমাধান, রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা যিনি নিশ্চিত করতে পারবেন তাকেই নির্বাচনে বেছে নেবেন তারা।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খানের জয় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখছেন। সোমবার সিটি করপোরেশন এলাকার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া যায়।
এসব ভোটার জানান, নির্বাচনে দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি অংশ না নেওয়ায় মেয়র পদে নৌকার প্রার্থী আজমত উল্লা খান কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বলে মনে করছেন তারা।
ভোটারদের জানান, ২০১৩ সালে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আজমত উল্লা খান। এর আগে তিনি ১৮ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে আগে থেকে আজমতের প্রভাব রয়েছে। বিএনপি অংশ না নেওয়ায় আজমত উল্লা এই সুবিধাটা পেতে পারেন। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন তার জন্য ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াতে পারেন।
এদিকে প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদার। গত রোববার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
গতকাল সোমবার দিনভর প্রচারণা চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খান। দুপুরে ভোগরা বাইপাস এলাকায় শিল্প উদ্যোক্তা সালাউদ্দিন চৌধুরীর উদ্যোগে আয়োজিত কর্মীসভায় আজমত উল্লা খান বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতির কারণ হয় এমন কিছু করবেন না। গাজীপুর নগরে বহু শিল্পকারখানার পাশাপাশি লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। নির্বাচিত হলে তাদের জন্য কর্মপরিবেশ ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণে নানামুখী ভূমিকা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। এছাড়া ওয়ার্ডভিত্তিক ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে স্বল্পমূল্যে শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা হিসেবে বিনামূল্যে কার্ড দেওয়াসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেন।
বিকেলে বাসন এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি। এ সময় গাজীপুরের উন্নয়নের জন্য নৌকা মার্কায় ভোট চান তিনি।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর কাশিমপুর ও কোনাবাড়ি এলাকায় গণসংযোগ করে ভোট চান জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এম এম নিয়াজ উদ্দিন। স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সিটি করপোরেশন গড়তে নগরবাসীর কাছে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট চান তিনি।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী গাজী আতাউর রহমানও শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প এলাকা গাজীপুরে বেকারত্ব থাকার কোনো কারণ নাই উল্লেখ করে মেয়র নির্বাচিত হলে গাজীপুরে যেকোনো চাকরির ক্ষেত্রে গাজীপুরের অধিবাসী ও ভোটাররাই প্রাধান্য পাবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী জায়েদা খাতুন অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় বের হলে টঙ্গীতে চারবার তার ওপর হামলা করা হয়েছে। গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে, কয়েকটি নির্বাচনে তার এজেন্টদের পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তার প্রচারণায় একাধিকবার গাড়ি থামিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। কর্মীদের মারধর, নির্যাতন ও প্রতিনিয়িত হুমকি প্রদান করা হচ্ছে।
আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে গাজীপুর সিটিতে। ইতোমধ্যে নির্বাচনে সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার ও এজেন্টদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে এলাকায় বৃহস্পতিবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্র জানায়, নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা বিধানকল্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হবে। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অস্ত্রসহ একজন এসআই অথবা এএসআই ও চারজন কনস্টেবল, অস্ত্রসহ একজন আনসার, একজন অস্ত্রসহ এপিসি, লাঠিসহ চারজন মহিলা ও ছয়জন পুরুষ আনসার-ভিডিপি সদস্যসহ ১৭ জন মোতায়েন থাকবে। আর সাধারণ কেন্দ্রগুলোতে অস্ত্রসহ একজন এসআই অথবা এএসআই ও তিনজন কনস্টেবল, অস্ত্রসহ একজন আনসার, একজন অস্ত্রসহ এপিসি, লাঠিসহ চারজন মহিলা ও ছয়জন পুরুষ আনসার-ভিডিপি সদস্যসহ ১৬ জন মোতায়েন থাকবে।
গত ৩ এপ্রিল পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে আগামী বৃস্পতিবার গাজীপুর সিটিতে ভোটের জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনে মোট ভোটার ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৬ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৬২ জন এবং মহিলা ভোটার ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৬৯৬ জন। এছাড়াও বিপরীত লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার আছেন ১৮ জন। ৪৮০টি ভোট কেন্দ্রে ইভিএমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।






