দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি মাত্র ৬ মাস। ‘দলীয় সরকার’ না ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ অধীনের নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবির প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো এখন দুই জোটে বিভক্ত। একটি সরকার দলীয় আওয়ামী লীগ জোট, আরেকটি সরকারবিরোধী বিএনপি জোট। এর বাইরেও রয়েছে ছোট ছোট দলগুলোর জোট ও উপজোট। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই কদর বাড়ছে তাদের। দলগুলোও চাঙ্গা হচ্ছে। জোট প্রশ্নে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে (জাপা) পাশে চায় দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। জাতীয় পার্টিও আসন সমীকরণে নির্বাচনি জোটে যেতে ইচ্ছুক। সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের কাছে ‘এককভাবে’ না ‘জোটবদ্ধ’ তা জানতে চেয়েছেন। তবে জোটে যাওয়া নিয়ে এবারও তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভক্তি। আওয়ামী লীগ নাকি বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি জোটে যাবে তা নিয়ে ত্রিশঙ্কু বিভক্ত হয়ে পড়েছে জাতীয় পার্টি। দলটির একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে এ তথ্য।
তারা বলছেন, জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। অপর একটি অংশ জি এম কাদেরের নেতৃত্বে বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনি জোট করতে চায়। জাপার সিনিয়র ও সংসদ সদস্যদের আরেকটি অংশ দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। তারা রওশন এরশাদ ও জি এম কাদের গ্রুপের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রেখে চলছে। দিনে তারা জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান মানেন, আর রাতে রওশন এরশাদকে। রাতে সরকারি দলের লবিং ও রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। তবে এ নিয়ে দলের সিনিয়র ও জুনিয়র নেতারা প্রকাশ্য মুখ খুলতে চাইছেন না। কারণ এ মুহূর্তে তারা প্রকাশ্যে এলে দলীয় মনোনয়নসহ সাংগঠনিক পদ-পদবি হারাতে পারেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় পার্টির ঢাকা মহানগরের নেতা এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে, আর সেই নির্বাচনে অংশ নিলে রাজধানী ঢাকার কোনো আসনেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হতে পারবে না। আবার বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে অংশ নিলে জাপাকে ঢাকা মহানগরের কোনো আসন ছেড়ে দেবে না দলটি। আর আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করলে কাজী ফিরোজ রশিদ এবং সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এবং গুলশান-বনানীর আসন ছাড় দিতে পারে। কেননা ২০১৪ ও ১৮ সালের নির্বাচনে ওইসব আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিয়েছিল। দলের চেয়ারম্যানসহ হেভিওয়েট নেতাদের নিজ নিজ নির্বাচনি আসনের অবস্থা খুবই খারাপ।’
ওই নেতার ভাষ্যমতে, ‘জাপায় কিছু নেতা আছেন যারা শুধু নির্বাচন করেন সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য। ফলে জাপার এককভাবে নির্বাচন করার কোনো অবস্থান নেই। ফলে জোট করেই নির্বাচনে যেতে হবে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের পৃথক কাউন্সিল ডাকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তেমনি জি এম কাদের দলের ভাঙন রোধে সব প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্যদের পাশে চান। কিন্তু রওশন পৃথক দল গঠন করলে সবাই জি এম কাদেরের সঙ্গে থাকবেন এমন প্রতিশ্রুতি দেননি। তবে রওশন পৃথক দল গঠন করলেও জি এম কাদের তার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো আপোষে যাবেন না, এমন মনোভাব প্রকাশ করেন। দলের স্বার্থে প্রেসিডিয়াম সদস্যদের অনেকেই রওশনের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর পরামর্শ দেন।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলের প্রেসিডিয়াম ও সংসদ সদস্য এবং নেতা-কর্মীদের নিয়ে পৃথক বৈঠক করেছেন। এ যৌথ সভায় উঠে আসে জোট গঠন নানা বিষয়। তবে নির্বাচনে কোন দল বা জোটকে সমর্থন দেবে তা চূড়ান্ত হয়নি। এজন্য আরও সময় নেয়ার আলোচনা হয়েছে। তবে জি এম কাদের দলের মধ্যে কোনো ভাঙন চান না। তাই ভাঙন রোধে সব প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্যদের পাশে চান। যারা রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তাদের দূরত্ব কমানোর পরামর্শ দেন জাপা চেয়ারম্যান। কিন্তু রওশন পৃথক দল গঠন করলে সবাই জি এম কাদেরের সঙ্গে থাকবেন এমন প্রতিশ্রুতি দেননি। এমনকি জোট প্রশ্নেও সবাই চুপ থাকে। ফলে নির্বাচন ও জোট গঠনের বিষয়ে আরও সময় নেবে জাপা।
সূত্র আরও জানায়, ওইসব বৈঠকে বর্তমান রাজনীতি পর্যালোচনা করে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সরকার যদি নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে তবে তাদের সঙ্গে থাকতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বিএনপির কোনো অংশ নির্বাচনে অংশ নিলে জাতীয় পার্টির অবস্থান কি হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টিকে বিরোধীদলের আসন থেকে সরে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও ভাবছেন তারা।
জানা যায়, গত রোববার ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সঙ্গে বৈঠক করে জি এম কাদের। মার্কিন রাষ্ট্রদূত জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করবে নাকি জোটবদ্ধভাবে তা জানতে চেয়েছেন। জাতীয় পার্টি নিরপেক্ষ নির্বাচন ও তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তবে জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে কী করবে, সেটা এখনো বলার সময় হয়নি। জাতীয় পার্টি যাই করবে, সঠিক সিদ্ধান্তই নেবে বলে জানিয়েছে সিনিয়র নেতারা। জানতে চাইলে রওশন এরশাদের মুখপাত্র কাজী মামুনূর রশীদ নয়া শতাব্দী বলেন, ‘নির্বাচনের বেশি সময় বাকি নাই। জাতীয় পার্টি নির্বাচনমুখী দল। অতীতে সবকটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জাতীয় পার্টি। আগামীতেও রওশন এরশাদের নেতৃত্বে অংশ নেব। আমরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি।’
জানতে চাইলে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং অতিরিক্ত মহাসচিব সাইদুর রহমান টেপা নয়া শতাব্দীকে বলেন, জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। কে জিতবে বা জিতবে না সেটি নির্বাচনের সময় দেখা যাবে। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে, কে সরকার গঠন করবে কে প্রধান বিরোধীদল হবে, সেটিও তখন স্পষ্ট হবে। এই মুহূর্তে এসব নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও অতিরিক্ত মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, জাতীয় পার্টি ১৯৯০ সালের পর বাংলাদেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে তা কেউ ধারণা করতে পারেনি। সেই জাপা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে ট্রাম কার্ড। এখনো আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ দল জাপা। তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কি না তা এখনো অনিশ্চিত। তারপরও যদি বিএনপির ব্যানারে কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়, আর সেই দলই যে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হবে তা মনে করি না। জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনে খুবই সতর্ক ও কৌশলী হয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। জাপা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছে। আমরা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয়ার ক্ষমতা রাখি।
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মজিবুল হক চুন্নু নয়া শতাব্দীকে বলেন, ‘৩০০ আসনেই এককভাবেই প্রার্থী দেবে। যেহেতু সংবিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হবে, তাই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবে।’ জোট নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জোট করার কোনো চিন্তা-ভাবনা আমাদের মাথা নেই। এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচন করার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি।’
নয়া শতাব্দী







