দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে চলছে আলোচনা সমালোচনার ঝড়। বর্তমানে রাজনৈতিক চরম সংকটে দেশে। সরকার চায় নির্বাচন সফল করতে এবং বিএনপি ও তার সমমনা দল চায় নির্বাচন বানচাল করতে। তারই ধারাবাহিকতায় ২৮ অক্টোবর বিরোধী দল বিএনপি এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পাল্টাপাল্টি মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ হয় উত্তপ্ত । শুরু হয় নতুন করে চরম রাজনৈতিক সংকট। কিন্ত এসবের পরোয়া না করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। দেশের জনসাধারন পড়ে নানাবিধ বিপাকে। ইতিমধ্যে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। সবকিছু ঠিক ঠাক থাকলে আগামী ৭ জানুয়ারী ২০২৪ তারিখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে । ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ৩০ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী ৩০ জানুয়ারির আগের ৯০ দিনের মধ্যে ভোট হতে হবে। ফলে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা আছে। ইতমধ্যে বিএনপি ও অন্য দলগুলোর আন্দোলনকে আমলে না নিয়ে নির্বাচনি চুড়ান্ত কার্যক্রম শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের প্রক্রিয়া শেষ করেছে । এছাড়া জাতীয় পাটি সহ কিছু ছোট ছোট দলও মনোনয়ন প্রক্রিয়া শেষ করেছে। কিন্ত বিএনপিসহ সমমনা দলগুলি রয়েছে অবরোধ,হরতালসহ অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যে। তাদের দাবী নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন। তাহলে কি ২০১৪ সালের মতো সহিংসতার দিকে আগাচ্ছে দেশ ? এ প্রশ্ন জনসাধারনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আবারও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বলছে, বাংলাদেশে তারা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চায়। কিন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। এমন মূল্যায়ন করে কূটনীতিকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিকল্প যারা, তাদের ওপর আস্থা না থাকায়, সরকারের ধারাবাহিকতার পক্ষে দিল্লি। তবে সহমত না হলেও এনিয়ে ওয়াশিংটন-দিল্লি দ্বন্দ্বে জড়াবে না বলেই মনে করেন তারা। ভারতের অবস্থানের সাথে অনেকটা একমত চীনও। অবশ্য ভূ-রাজনৈতিক এই টানাপোড়েনে না ঢুকতে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন কূটনীতিকরা। তবে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মামলার রায়ে রীতিমতো সাজার জালে আটকা পড়ছেন। পুলিশের ওপর হামলা, কর্তব্য কাজে বাধা, ককটেল বিস্ফোরণ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার অভিযোগে দলটির কেন্দ্রসহ তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাজা দিয়েছেন আদালত। আদালত সূত্রে জানা যায়, তিন মাসে ২৬ মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে ৪১১ জনের সাজা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি নভেম্বরেই পৃথক ২০ মামলায় সাজা হয়েছে ২৭৪ নেতাকর্মীর। মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ করার জন্য কখনো রাতেও চলে আদালতের কার্যক্রম। বিএনপির আইনজীবীরা জানান, বিচারকাজ এত দ্রুত চলছে যে, নির্বাচনের আগে আরও অন্তত ৫০টি মামলার রায় হতে পারে। এসব মামলায় আসামির তালিকায় দলটির ভাইস চেয়ারম্যান থেকে কর্মী পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। এর পাশাপাশি ঢাকার আদালতে বিচারাধীন রয়েছে আরও প্রায় ৫০০ মামলা। এসব কারনে বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ গ্রহন করার প্রদীপ প্রায় নিভতে বসেছে। এদিকে আগামী নির্বাচনকে একতরফার নির্বাচন উল্লেখ করে তা প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ। বুধবার রাজধানীর প্রেসক্লাব ও বিজয়নগর এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এই ঘোষণা দেন মঞ্চের নেতারা। তারা বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচন আয়োজনের নাটক মঞ্চায়ন করতে সরকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অগ্নিসন্ত্রাস, ককটেল সন্ত্রাসের মতো ঘৃণ্য পথ অবলম্বন করেছে। কিন্তু তাদের নিজেদের লোকেরাই বারবার নাটক জনগণের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিগত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরামহীন সন্ত্রাসী কার্যক্রম করে যাচ্ছে। তাদের দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে অগ্নি সন্ত্রাস করছে। দলীয় গুন্ডাদের বাড়িতে বোমা বানানোর কারিগর দিয়ে বোমা বানিয়ে বিরোধী নেতাদের বাড়িতে হামলা করা হচ্ছে। আদালতকে ব্যবহার করে নজিরবিহীনভাবে রাতের বেলায় কোর্ট চালিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদেরকে ফরমায়েশি রায় দিয়ে সাজা ঘোষণা করেছে। কিন্ত এসব অভিযোগ মানতে নারাজ ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ। তারা বলছে নিয়ম অনুযায়ী বিচার প্রক্রিয়া চলছে। সবমিলিয়ে দেশের বড় দু দল রয়েছে শক্ত বিপরীত অবস্থানে। এ সব কারনে সহিংসতার দিকে আগাচ্ছে দেশ। ২০১৪ সালে যে পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে, এখন নির্বাচনের সেই পরিবেশ বিরাজ করছে। আমার মনে হচ্ছে, একইরকম সহিংসতার দিকে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি; যেটা গণতন্ত্র, দেশ, দেশের মানুষ এবং অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচনি কার্যক্রম বয়কট করছে । বিএনপি এই নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। ফলে নির্বাচন প্রতিরোধে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। অপরদিকে নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেছেন, কে নির্বাচনে আসবে, কে আসবে না- এটা দেখা আমাদের দায়িত্ব না। সংবিধানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেজন্য আমরা তফশিল দিয়েছি। আমাদের কমিশনে ৪৪টি দল নিবন্ধিত রয়েছে, আমরা সবাইকে নির্বাচন করতে আহ্বান করেছি। এ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। সংবিধান মেনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে কত ভোট পড়ল, ভোটার উপস্থিতি কেমন, এটা আমাদের দেখার বিষয় নয়; সংবিধান রক্ষায় সঠিক সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমন পরিস্থীতিতে রাজনীতিতে চলছে নানা সমীকরণ। দল ভাঙাগড়ার পাশাপাশি নতুন জোটেরও আত্মপ্রকাশ হচ্ছে। এ নিয়ে বিরোধী শিবিরে চলছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস। বিশেষ করে ১২ দলীয় জোট থেকে কল্যাণ পার্টি ও মুসলিম লীগ (বিএমএল) বেরিয়ে যাওয়ার পর সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে সমমনা দল ও জোটে অস্থিরতা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সমমনা জোটের দিকে আরও বেশি নজর দিচ্ছে বিএনপি। অস্থিরতা ঠেকাতে বসে নেই দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। লোভ-লালসার ফাঁদে পড়ে নির্বাচনে যেতে পারে জোটের শরিক এমন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগসহ নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছেন তারা। আন্দোলনে থাকা একটি দলের শীর্ষ নেতাও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ইতোমধ্যে কল্যাণ পার্টির একটি অংশ ১২ দলীয় জোটে থাকতে এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। বর্তমানে যুক্তফ্রন্ট’ নামে নতুন জোট গঠন করে গতকাল বুধবার দুপুরে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। বিকেলে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিও (জাপা)। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, আগামী দু-তিন দিনে এভাবে অনেক দলের অবস্থান পাল্টাবে। আরও কিছু দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।