কাশিমপুর কারাগার ভর দুপুরের প্রখর সূর্যালোকে ঝা ঝা করছে! এসময় বন্দিনীরা পারতপক্ষে মাঠে থাকে না ! তারপরও দেখি, আজ মাঠের মধ্যে জটলা! কাকে যেন ঘিরে আছে কয়েদী হাজতীরা !
একজন বত্রিশ তেত্রিশ বছরের নারী গতরাতে নতুন এসেছেন। চেহারায় বোঝা যায় অভিজাত বংশীয় !পোশাকে, জুতোয় মার্জিত রুচির ছাপ -গতকাল ব্যবহার করা পারফিউমের মৃদু সুবাস এখনও আবছাভাবে লেগে আছে! চামড়ায়, নখে আর চুলে বড়লোকী জৌলুস!
অবস্থাপন্ন পরিবারের কেউ জেলে এলে সাধারন কয়েদিরা বড় আমোদ পায় ! অন্তত এই একটি জায়গায় ধনী গরীব কম্বলে সম্বলে সমান হয়ে যায় তো -এজন্যই বুঝি! এছাড়া তো পুঁজিবাদী সমাজ গোরস্থান ছাড়া ধনী দরিদ্রের মিশ খাওয়ার কোন সুযোগ নেই । একারনেই কি জটলা ?
নাহ! সমবেত বন্দিনীদের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি ভদ্রমহিলার দামী সাদা সালোয়ারে রক্তের দাগ, কামিজেও রক্তের ছোপ ! তিনি অসহায়ের মতো প্রাণপণে ওড়না দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করছেন কিন্তু হচ্ছে না ! তা দেখে অন্য বন্দিনীরা ঠা ঠা করে হাসছে যেন ডুগডুগি বাজিয়ে কোন বাঁদর নাচছে! বিগত যৌবনা কয়েদিরা এমনভাবে ঘৃণাভরে তাকাচ্ছে যেন এই রক্ত খোদ শয়তানের নিদর্শন!
বুঝলাম হঠাৎ কারাগারে এসে দুশ্চিন্তায় হয়তো পিরিয়ড হয়ে গিয়েছে, সাথে কোন বাড়তি পোশাক নেই ! পরিবার হয়তো এখনও বাসা থেকে কিছু পাঠানোর সুযোগ পাননি!
বলা বাহুল্য, কেউ তাকে সাহায্য করছেনা ! আমি এগিয়ে গিয়ে উনাকে টেনে উঠিয়ে কয়েদি রুমে নিয়ে এসে স্যানিটারি প্যাড দিলাম ! কারাগারে হাতে গোনা যে দু তিনটি বিলাসিতা করতাম তার মধ্যে এটি একটি! প্রতিবার হাজিরার সময় এই একটি জিনিস বাসা থেকে আনতে বলতাম ! হতবিহ্বল নারীকে এক সেট সালোয়ার কামিজ দিলাম!
কারাগারে পিরিয়ড হওয়া একটা অভিশাপ ! অবস্থাপন্ন বন্দিনীরা পিসি (দোকান ) থেকে মাঝারি মানের স্যানিটারি ন্যপাকিনা কিনে ব্যবহার করে! যাদের সামর্থ্য নেই তারা ত্যানা, ন্যাকড়া খোঁজে! নিজেরই তো দুসেটের বেশি পোশাক নেই , অন্য কেউ যখন ভেজা কাপড় মাঠে শুকাতে দেয়া তখন সেইসব ওড়না গামছা, জামা চুরি করে চৌকার বটি দিয়ে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে ব্যবহার করে ! চোরাই মাল এক্ষেত্রে উধাও হয়ে যায় !
বিগতযৌবনা প্রৌঢ়া কয়েদি হাজতিরা যাদের মাসিক হয় তাদের দূর দূর করে ! যেন, তাদের পবিত্র চার ভাঁজের কম্বলে বসলে শুদ্ধতা বিনষ্ট হবে ! এই দূষিত রক্ত 🩸 থাকলে রহমতের ফেরেশতা আসবেনা -ফলে জামিন, খালাস সব আটকে যাবে !
গোপনে লুকিয়ে অস্বাস্থ্যকর ত্যানা ব্যবহার করে যেসব বন্দিনী দীর্ঘদিন কারাগারে থাকেন তারা জরায়ুর ইনফেকশন, প্রদাহ সহ নানা অসুখে ভোগেন!
আরেকটি তিব্র গ্লানিকর বিষয় না বললেই নয় ! একদিন পিরিয়ড চলাকালীন আদালতে হাজিরা দিয়ে কারাগারে ফিরেছি! গেটে যথারীতি তল্লাশি! সেই তল্লাশি এতটাই ভয়াবহ – আত্মমর্যাদা যেন খান খান হয়ে শত টুকরো হয়ে ধূলায় লুটায় !
“খুলুন”
“অপমানে, কষ্টে নিজের অজান্তেই হুড়মুড় করে চোখে ঢল নামে “অসম্ভব! প্লিজ! আমার পিরিয়ড চলে “
“কিছু করার নেই – আপনি আলোচিত মামলার আসামি- নিষিদ্ধ কিছু পাওয়া গেলে কারা কতৃপক্ষ দায়ী হবেন,
কৈফিয়ত দিতে হবে -অতএব খুলুন!”
তল্লাশি হয়েছে -অনুনয়ে বিধাতা গলে কিন্ত বিধান টলে না!
সেইদিন বুঝি আল্লাহ’র আরশ কেঁপেছিলো! হাহাকারের সাথে অন্তরের গভীর থেকে এসেছিল কালকেউটে সাপের মতো বিষধর অভিশাপ!
সেই দু:সহ দিন মনে করে আজও শিউরে উঠি !
যদি এই লেখা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের নজরে পড়ে তবে অনুরোধ থাকবে নারী বন্দিনীদের বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যপকিন সরবরাহ করার জন্য! কারা কতৃপক্ষ যেন এর ব্যবহার ও নিষ্কাশন নিশ্চিত করে বন্দিনীদের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট লাঘব করেন ।
হাজার হোক,একটা সময় বন্দিনীরাও তো মানুষ ছিলো !









