ঢাকার মতিঝিলের একটা নামকরা কর্পোরেট অফিস। প্রতিদিন এখানে ফাইলের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে শত শত মানুষের আবেগ। এই অফিসেরই অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার অয়ন (৩০)। শান্ত, ভদ্র আর দায়িত্বশীল অয়নকে সবাই ‘গুড বয়’ হিসেবেই চেনে। প্রেম বা আড্ডার চেয়ে নিজের ক্যারিয়ার আর পরিবার নিয়েই তার জগৎ ছিল। কিন্তু অয়নের এই ছকবাঁধা জীবনে হঠাৎ করেই এক গভীর মায়ার সঞ্চার করল রিতু (২৭)।
রিতু এই অফিসে জয়েন করেছে মাস ছয়েক হলো। মেয়েটা খুব চুপচাপ, কারও সাথে তেমন মিশত না, নিজের ডেস্কে বসে শুধু কাজ করে যেত। অফিসের অন্য কলিগদের ফিসফাস থেকে অয়ন জানতে পারে, রিতু একজন ডিভোর্সি নারী। এক বছর আগে এক সাইকোপ্যাথ আর অত্যাচারী স্বামীর নরক থেকে সে নিজের প্রাণটা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। আমাদের সমাজের একটা নোংরা স্বভাব হলো, একজন ডিভোর্সি মেয়েকে দেখলেই মনে করে সে খুব ‘অ্যাভেইলেবল’ অথবা তার চরিত্রে কোনো দোষ আছে। অফিসের অনেকেই রিতুকে নিয়ে আড়ালে নোংরা জোকস করত। কিন্তু অয়নের চোখে রিতু ছিল একটা আহত পাখির মতো, যার ডানায় কেউ নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করেছে।
কাজের সূত্র ধরেই রিতুর সাথে অয়নের টুকটাক কথা শুরু হয়। অয়ন খেয়াল করত, রিতুর চোখের নিচে নির্ঘুম রাতের স্পষ্ট ছাপ। একদিন প্রবল বৃষ্টির সন্ধ্যায় অফিস প্রায় ফাঁকা। অয়ন দেখল রিতু নিজের ডেস্কে মাথা গুঁজে নীরবে কাঁদছে। সেদিন আর নিজেকে আটকাতে পারল না অয়ন। সে রিতুকে কফি অফার করল আর বলল, “সব মেঘ একদিন কেটে যায় রিতু।” সেই এক কাপ কফি আর কয়েকটা ভরসার কথা রিতুর জমানো বরফ গলিয়ে দিল। রিতু তার অতীত জীবনের যে যন্ত্রণার কথা শোনাল, তাতে অয়নের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে গেল। অয়ন বুঝতে পারল, সে রিতুর প্রতি শুধু সহানুভূতি নয়, এক গভীর ভালোবাসা অনুভব করছে।
কয়েক মাস পর অয়ন যখন রিতুকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিল, রিতু ভয়ে কুঁকড়ে গেল। সে ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “অয়ন ভাই, আপনি পাগল হয়েছেন? আমি একটা ডিভোর্সি মেয়ে, সমাজের চোখে আমি অন্যের ব্যবহৃত একটা জিনিস। আপনার মতো একটা অবিবাহিত ছেলের সাথে আমাকে আপনার পরিবার কোনোদিন মেনে নেবে না। আমার আর কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা নেই।” অয়ন সেদিন রিতুর হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল, “আমি সমাজকে বিয়ে করব না রিতু, আমি তোমাকে বিয়ে করব।”
কিন্তু রিতুর ভয়টাই সত্যি হলো। অয়নের পরিবারে যখন এই বিয়ের কথা জানাজানি হলো, তখন যেন রীতিমতো ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। অয়নের মা বুকে থাপ্পড় মেরে কাঁদতে লাগলেন। বাবা সোজা জানিয়ে দিলেন, “দেশে কি কুমারী মেয়ের আকাল পড়েছে যে তুই একটা অন্যের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট ঘরে তুলবি? এই বিয়ে করলে তুই আজ থেকে আমাদের ত্যাজ্যপুত্র। এই বাড়ির দরজা তোর জন্য চিরতরে বন্ধ!”
পরিবারের এই নিষ্ঠুরতায় অয়নের ‘ইনার কনফ্লিক্ট’ বা মানসিক দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছাল। যে মা-বাবা তাকে বড় করেছে, তাদের ছেড়ে যাওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু অয়ন এটাও জানত, রিতুর হাতটা ছেড়ে দিলে মেয়েটা আর কোনোদিন বাঁচতে পারবে না। অয়ন তার বাবাকে শুধু একটা কথাই বলেছিল, “বাবা, একটা মেয়ের ডিভোর্স হওয়া মানেই সে নষ্ট বা ব্যবহৃত পণ্য নয়। সে একজন মানুষ, যার জীবনে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। তোমরা যাকে সম্মান দিতে পারো না, আমি তাকেই আমার স্ত্রী হিসেবে সম্মান দেব।” এক বুক কষ্ট নিয়ে, মাত্র একটা সুটকেস হাতে নিজের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এল অয়ন।
পরদিন কাজী অফিসে খুব সাধারণ আয়োজনে রিতুকে বিয়ে করে অয়ন। তারা দুজন মিলে বাড্ডার এক সরু গলিতে একটা ছোট একরুমের বাসা ভাড়া নেয়।
শুরু হয় তাদের নতুন জীবন, আর সাথে শুরু হয় ঢাকার বুকে টিকে থাকার এক নির্মম স্ট্রাগল। অয়ন আর রিতু দুজনেরই বেতন খুব সাধারণ। অয়ন এতদিন পরিবারের সাথে নিজের ফ্ল্যাটে থাকত, আর এখন মাসের শুরুতে বাসা ভাড়া, কারেন্ট বিল, আর বাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে দুজনেরই কপালের ভাঁজ গাঢ় হয়। মাসের শেষের দিকে এমনও দিন যায়, যখন তারা অফিস থেকে হেঁটে বাসায় ফেরে রিকশাভাড়া বাঁচানোর জন্য। শুক্রবারের বাজারে গিয়ে ইলিশ মাছের দাম শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাঙ্গাশ বা তেলাপিয়া নিয়ে বাড়ি ফেরে অয়ন।
কিন্তু জানেন, এই অভাব আর স্ট্রাগলের মাঝেও তাদের ছোট্ট ঘরটাতে একটা জিনিস কানায় কানায় পূর্ণ—সেটা হলো শান্তি। সন্ধ্যায় যখন অয়ন ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরে, রিতু নিজের হাতে এক কাপ চা বানিয়ে তার পাশে বসে। অয়ন যখন রিতুর চোখের দিকে তাকায়, তখন সে সেখানে আর কোনো ভয় বা ট্রমা দেখতে পায় না; সে দেখে এক গভীর নির্ভরতা। রিতু এখন হাসতে শিখেছে। সে জানে, এই লোকটা তাকে শরীরের জন্য নয়, তার আত্মাকে ভালোবেসে আপন করেছে।
আজ অয়নের পরিবারের সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সমাজের চোখে অয়ন হয়তো একটা ‘বোকা’ ছেলে, যে কি না একটা ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করে নিজের জীবন নষ্ট করেছে। কিন্তু বাড্ডার ওই ছোট্ট রুমের চার দেয়াল জানে, অয়ন আসলে কতটা সাহসী আর প্রকৃত পুরুষ।
গল্পের বার্তা:কুমারী মেয়ে বিয়ে করে বউ সাজিয়ে আনাটা কোনো বড় বিষয় নয়, কিন্তু একটা ডিভোর্সি, ভাঙা আর ট্রমাটাইজড মেয়েকে সম্মান দিয়ে বুকে টেনে নেওয়ার জন্য বুকের পাটা লাগে। সত্যিকারের পুরুষত্ব মানে পেশিশক্তি নয়, সত্যিকারের পুরুষত্ব হলো একটা অসহায় নারীকে নিঃশর্ত আশ্রয় দেওয়া। সমাজ হয়তো ভাঙা জিনিসকে মূল্যহীন ভাবে, কিন্তু ভালোবাসার ছোঁয়া পেলে সেই ভাঙা জিনিসটাই সবচেয়ে সুন্দর আর দামি রত্নে পরিণত হয়।

গল্পটি ভালো লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন! এমন বাস্তব, হৃদয়ছোঁয়া ও অনুপ্রেরণামূলক গল্প নিয়মিত পেতে আমাদের পেজটি ফলো দিয়ে পাশে থাকুন।

আপনার একটি স্টার আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।
Post Views: 793
Related