জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সিআইডি ১৭৩ দফা সময় নিয়েও অভিযোগপত্র দিতে পারেনি

একই হত্যাকাণ্ড কিন্তু দুটি ভিন্ন বিচারিক পথ। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক আদালতে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের দ্রুত বিচার করে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে একই ঘটনায় চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের হওয়া বেসামরিক হত্যা মামলায় ২০ বছর ধরে তদন্ত চললেও অভিযোগপত্র দেওয়া যায়নি; শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে মামলাটির ইতি টানা হয়। ৪৫ বছর পর পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ায় আবারও আলোচনায় এসেছে একই হত্যাকাণ্ডের দুই ভিন্ন বিচারিক পরিণতির বিষয়টি।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর একদিকে সেনাবাহিনী নিজস্ব কোর্ট মার্শালে বিদ্রোহে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার শুরু করে। ওই বিচারে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় ফৌজদারি আইনে হত্যা মামলা রুজু করা হয়। এই মামলার ছয় নম্বর আসামি ছিলেন সদ্য গ্রেপ্তার হওয়া মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন।

সামরিক বিচার দ্রুত শেষ হলেও বেসামরিক মামলার তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ১৯৮১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ১৭৩ দফা সময় নিয়েও অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারেনি। পরে ২০০১ সালের ২৪ অক্টোবর আদালতে জমা দেওয়া হয় একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন, যার মাধ্যমে মামলাটি কার্যত নিষ্পত্তি হয়ে যায় কোনো অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি না করেই।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে পুলিশ জানায়, ১৯৮১ সালের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত একটি আন্তঃসংস্থা সমন্বয় (আইসিসি) সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল— সেনাবাহিনী যদি তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে পুলিশের তদন্ত এগোনোর প্রয়োজন হবে না। বাস্তবে ঘটেছিলও তাই। যেহেতু সেনাবাহিনী নিজস্ব কোর্ট মার্শালে বিচার শুরু করে দিয়েছিল, বেসামরিক তদন্তকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। ২০ বছর পর সাক্ষী ও প্রমাণের অভাব দেখিয়ে সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়, যদিও ফাইলটি কার্যত ১৯৮১ সালেই কার্যকরভাবে থেমে গিয়েছিল।

আইসিসি সভার সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ছিলেন, সে বিষয়ে মামলার নথিতে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম নেই। তবে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া মনে করেন, মামলার নথি উদ্ধার করা গেলে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে। এজন্য সেরেস্তা, কোতোয়ালি থানা এবং চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

তৎকালীন মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন বলেন, সিআইডি তার সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পরবর্তী পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই নথি রেকর্ডরুমে চলে গিয়েছিল।

তদন্ত কর্মকর্তারা কোথায়?

২০ বছরের তদন্তে একাধিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করলেও তাদের পরিচয় ও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো প্রকাশ্যে নেই। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মফিজুল হক ভূঁইয়ার নথি অনুসন্ধান শেষ হলে এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য মিলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র, ফরেনসিক প্রতিবেদন কিংবা ময়নাতদন্তের নথি বর্তমানে কোথায় সংরক্ষিত রয়েছে, সে বিষয়ে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে নেই। হামলায় ১১টি সাবমেশিনগান, তিনটি রকেট লঞ্চার ও তিনটি গ্রেনেড-ফায়ারিং রাইফেল ব্যবহৃত হয়েছিল বলে জানা যায়, তবে সেগুলো পরবর্তীতে কী প্রক্রিয়ায় জব্দ বা সংরক্ষণ করা হয়েছিল সে সংক্রান্ত নথি প্রকাশ্যে নেই। যেহেতু মামলাটি পরবর্তীতে সামরিক কর্তৃপক্ষের আওতায় চলে যায়, তাই আলামত সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকতে পারে—তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি নিশ্চিত তথ্য নেই। প্রকৃত অবস্থা জানতে হলে সেনাবাহিনী বা মামলার পুনরুদ্ধারকৃত নথির ওপর নির্ভর করতে হবে।

নিরাপত্তা ব্যর্থতার প্রশ্ন

সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা এত সহজে কীভাবে ভেঙে পড়ল, ৪৫ বছর পরও তা পরিষ্কার নয়। গবেষক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর একটি বিচার বিভাগীয় ও একটি সামরিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সামরিক তদন্তের ভিত্তিতে বিচার হলেও বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন কখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় কার, তা আনুষ্ঠানিকভাবে অজানাই রয়ে গেছে।

তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারী দল বিনা বাধায় সার্কিট হাউসে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল, যা থেকে ধারণা করা যায় প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের নিরাপত্তা বলয়ে হয় কার্যকর প্রতিরোধ ছিল না, নয়তো হামলাকারীদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন, যিনি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা

সাম্প্রতিক তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠক হয়, যেখানে মোজাফফর হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ওই বৈঠকে প্রায় ২০ জন কর্মকর্তার উপস্থিতির কথা বলেছেন। মোজাফফরের ভাষ্যমতে, সেনা প্রশাসনে পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকে তিনি জিয়াউর রহমান ও সেনা নেতৃত্বের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

হত্যাকাণ্ডের রাতে অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান (মতি)। ঘুমন্ত জিয়ার কক্ষে আঘাত হানার নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ক্যাপ্টেন সাত্তার ও ফজলে হোসেনকে। হামলার পর মোজাফফর হোসেনই ইংরেজিতে সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠান জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের কাছে—‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’। এই বার্তার মাধ্যমেই মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের খবর জানতে পারেন এবং পরবর্তীতে বেতার ভাষণে সেনাপ্রধান এরশাদকে বরখাস্ত ও মীর শওকত আলীকে নতুন সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন।

সংবাদ বিশ্লেষণ

তবে পরিকল্পনার চূড়ান্ত সময়, বৈঠকের সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। তদন্তকারীরা মনে করছেন, চলমান জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

হত্যাকাণ্ডের পর মেজর মঞ্জুরের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে সাময়িকভাবে সান্ধ্য আইন জারি হয় এবং শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় বিদ্রোহীরা। তবে একদিনের মধ্যেই ঢাকা থেকে পাঠানো বাহিনী বিদ্রোহ দমন করে। মঞ্জুর পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, পরে হাটহাজারী থানার কাছে তাকে ঘিরে ফেলা হয় এবং একপর্যায়ে তিনি নিহত হন। লে. কর্নেল মতিউর রহমানও ১ জুন সীমান্তের দিকে পালানোর পথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। বাকি অভিযুক্তদের বিচার হয় কোর্ট মার্শালে, যেখানে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মোজাফফর হোসেনসহ অল্প কয়েকজন সে সময় বিদেশে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

কী হবে বেসামরিক মামলার

মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তারের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে রেকর্ডরুমে থাকা বেসামরিক মামলার নথি উদ্ধার করে নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব কি না।

১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের নেতা ছিলেন একরামুল করিম। বর্তমানে ৭২ বছর বয়সি এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল। এই হত্যার বিচার শেষ করতে হবে। যারা জড়িত, সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া আমার দেশকে বলেন, যদি মনে করা হয় জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় বেসামরিক আদালতে পুনরায় বিচার প্রয়োজন, তাহলে সে বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে মামলার নথির খোঁজ করছি। এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গেও কথা হবে।

সম্পর্কিত পোস্ট

বিশ্বনাথে দশঘর ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী  মধু মিয়ার মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

বিশ্বনাথে দশঘর ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মধু মিয়ার মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

বিশ্বনাথে দশঘর ইউপি চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মধু মিয়ার মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত বিশ্বনাথ প্রতিনিধি আফাজাল মিয়া সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ৮নং দশঘর ইউনিয়ন...

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও অনিয়মের তদন্ত দাবি ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও অনিয়মের তদন্ত দাবি ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ও অনিয়মের তদন্ত দাবি ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের - মঈনউদ্দিন মনি, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি মাদ্রাসায় শিশুদের ভর্তি করানোর...

পঞ্চগড় জেলা পরিষদ প্রশাসকের সঙ্গে নবাগত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার  শুভেচ্ছা বিনিময়

পঞ্চগড় জেলা পরিষদ প্রশাসকের সঙ্গে নবাগত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার শুভেচ্ছা বিনিময়

পঞ্চগড় জেলা পরিষদ প্রশাসকের সঙ্গে নবাগত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার শুভেচ্ছা বিনিময় পঞ্চগড় প্রতিনিধি মো আরিফুল ইসলাম ইরান পঞ্চগড় জেলা পরিষদের...

চাটখিলে সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম রিয়াদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি

চাটখিলে সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম রিয়াদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি

চাটখিলে সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম রিয়াদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি মোঃ বেল্লাল হোসাইন নাঈম, স্টাফ রিপোর্টার...

চৌদ্দগ্রামে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে শায়েখ আহমেদ আলী মোল্লা ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া সমাজে শান্তি আসবে না

চৌদ্দগ্রামে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে শায়েখ আহমেদ আলী মোল্লা ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া সমাজে শান্তি আসবে না

চৌদ্দগ্রামে তাফসিরুল কোরআন মাহফিলে শায়েখ আহমেদ আলী মোল্লা ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন ছাড়া সমাজে শান্তি আসবে না জহিরুল ইসলাম সুমন চৌদ্দগ্রাম...

ভোলাহাটে বাড়ীতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ! হত্যার চেষ্টায় গুরুতর আহত যুবক!

ভোলাহাটে বাড়ীতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ! হত্যার চেষ্টায় গুরুতর আহত যুবক!

ভোলাহাটে বাড়ীতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ! হত্যার চেষ্টায় গুরুতর আহত যুবক! এম. এস. আই শরীফ, ভোলাহাট (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ চাঁপাইনবাবগঞ্জের...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমাদের বিভাগ সমূহ

সাম্প্রতিক পোস্ট

Recent Comments

    Welcome Back!

    Login to your account below

    Retrieve your password

    Please enter your username or email address to reset your password.